অন্যায় রুখতে আইনের পাশাপাশি মনো পরিবর্তন জরুরি!

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
১২ নভেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০৮:৩২

অন্যায় রুখতে আইনের পাশাপাশি মনো পরিবর্তন জরুরি!

আমাদের দেশের মধ্যে একশ্রেণির মানুষ আছে, যাদের পেটে ভাত না থাকলেও মামলা মোকদ্দমা চালাতে খুবই আনন্দ পায়। টাকা পয়সা সুদে এনে কিংবা ঘরের গরু-ছাগল বিক্রি করে কিংবা অনেক সময় ঘর-বাড়ি, জমি-জমা বিক্রি করে মামলা মোকদ্দমা নিয়ে খেলা করতে করতে এক সময় নিঃস্ব হয়ে যায়, তা মামলাবাজ মানুষ বুঝতেই পারে না। আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি, যে সময়ে মানুষ নিজের লাভ-লোকসানের জন্যে অন্যের বিরাট ক্ষতি সাধন করতে যেমন পিছপা হয় না, তেমনি করে তাতে যে মামলাবাজ মানুষটিরও ক্ষতি হয়, তা মামলাবাজ মানুষজন বুঝতেই পরে না। এমনভাবে একশ্রেণির মানুষ আজ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে, যে নিয়ন্ত্রণের মাঝে তারা অন্যের ক্ষতি করে নিজের লাভের বিরাট অংশ ঘরে তুলতে চায়। 

কেস স্টাডি ১

এক সংবাদ ভাষ্যে বলা হয়েছে যে, ধর্ষণ মামলার জেরে আমাদের দেশের এক গ্রাম পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয় যে, সংশ্লিষ্ট পুরুষ শুন্য হওয়া গ্রামের এক নারী মাদক কারবারিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার কারণে গ্রামের মানুষ তার প্রতিবাদ করলে, মাদক ব্যবসায়ী নারীটি গ্রামবাসীর প্রতি ক্ষিপ্ত হইয়া ওঠে। দেখা যায় যে ব্যক্তি নারীর মাদক বিক্রির প্রতিবাদ করে তার বিরুদ্ধে ওই নারী নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের মামলা দায়ের করে ফেলেন। শেষকালে দেখা যায় মান-সম্মানের ভয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মাদক বিক্রেতা নারী সাথে টাকা পয়সা দিয়ে আপস করে মামলা মোকদ্দমা থেকে রক্ষা পেতে হয়। ওই নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে মামলাবাজ নারীর কাজই হচ্ছে গ্রামের যে কারো বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়া।

এমন নারীর দাপটে গ্রামের অনেক যুবক ছেলেরা কিংবা নিরীহ ঘরের মানুষরা গ্রাম ছাড়া হয়ে অন্য গ্রামে বসবাস করছে। এই মহিলার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ হচ্ছে মাদক ব্যবসায়ী নারীটি তার স্বামীর বিরুদ্ধেও ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। দেখা যায় নারীটি এতোই বেপরোয়া যে, তার স্বার্থের জন্য তার স্বামীকেও মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়।

আরও পড়ুন: ​সমাজে শুভ পরিবর্তন আসবে কবে? 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কোথায় আছি? আজ দেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে। যা দেখলে মানষের অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। একবার চিন্তা করে দেখুন আপনার আশেপাশে একজন পুরুষ কিংবা নারী মাদক বিক্রেতাসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু আপনি তার প্রতিবাদ করতে পারছেন না। আপনি অনৈতিক কাজের প্রতিবাদ করলে মাদক বিক্রেতা কিংবা অনৈতিক কাজে অভ্যস্ত ব্যক্তিটি আপনার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন। মাদক বিক্রি আর অনৈতিক কাজের প্রতিবাদ করার অপরাধে নষ্ঠ মানুষের দল আপনার বিরুদ্ধে এমন সব বিষয় নিয়ে মামলা দায়ের করে ফেলেন, যার কারণে আপনাকে থানা পুলিশে হয়রানি হতে হচ্ছে কিংবা আপনাকে সামাজিক ভাবে হেয়-প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে। 

অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে যখন আপনাকে হয়রানি হতে হচ্ছে, তখন কি আপনি চাইবেন আপনার আশেপাশের সকল অনৈতিক কাজের প্রতিবাদ করতে। নির্দোষ মানুষ আইনের মারপ্যাঁচে হয়রানি হয় যেখানে, সেখানে আইনের উপর গুরুত্ব দিয়ে কিংবা আইনের পরিবর্তন করে কি সম্ভব পাপ কিংবা অন্যায়ের বিনাশ করা। আমারতো মনে হয় শুধুমাত্র আইনের পরিবর্তন করে পাপ কিংবা অন্যায়ের বিনাশ করা যাবে না। অভিযোগ আছে, একশ্রেণির পুলিশ সদস্যরা যারা টাকা পয়সার জন্য মামলাবাজ নষ্ট মানুষদের ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে থাকে।

দেশের মাঝে ধর্ষণের মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় সরকার ধর্ষণের সাজার ব্যাপারে আইনগত দিক দিয়ে একটা বিরাট পরিবর্তন আনছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের ধারণা ধর্ষণের মতো অপরাধের বিনাশ ঘটাতে হলে ধর্ষণের সাজার দিকটাকে আরো কঠিনতর করতে হবে। তাই সরকার ধর্ষণের মতো অপরাধের সাজা মৃত্যুদণ্ড করেছে। তাতে ধর্ষকরা যদি মৃত্যুভয় থেকে ধর্ষণের মতো অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু সচেতন মানুষের প্রশ্ন হলো আইন করে কি কখনো অপরাধের বিনাশ ঘটানো যাবে? যদি না অপরাধীদের মনোজগতের মাঝে কোন শুভ পরিবর্তন না ঘটে। যুগে যুগে অর্থাৎ প্রত্যেক কালেই মানুষ তার বেঁচে থাকার তাগিদে বিভিন্ন বিষয়ের মাঝে পরিবর্তন আনছে। এই পরিবর্তন তখনই মানুষের কাজে লেগেছে, যখন মানুষ মনোজগতকে শুভ দিকে নির্দেশনার মাধ্যমে পরিবর্তন করেছে। মানুষের শুভ পরিবর্তন যখন মানুষের মনোজগতের শুভ পরিবর্তন নিয়ে আসে, তখনই আমাদের সমাজ সংসার সুন্দর হয়ে ওঠে।
 
আমাদেরকে একটা কথা একবাক্যে স্বীকার করে নিতে হবে যে, দেশের মাঝে ধর্ষণসহ বিভিন্ন রকমের অপরাধ ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। এই বেড়ে যাওয়া অপরাধ সমূহের যন্ত্রণায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে আছে। তাই সরকার যখন ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড করলো, দেখা গেল দেশের মানুষ তাতে খুশি হলো শুধুমাত্র অপরাধের বিনাশের কথা চিন্তা করে। কিন্তু সাধারণ মানুষ হয়তো একথা ভাবেনি যে, যারা মামলাবাজ, যারা মিথ্যা মামলা করে মানুষকে বিপদে ফেলে কিংবা জেল হাজত খাটায় কিংবা মিথ্যা মামলায় মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে সাজা পর্যন্ত করিয়ে ফেলে তাদের হাত থেকে কিভাবে রক্ষা পাবে। 

লেখার প্রথমে বলা হয়েছিল ধর্ষণ মামলার জেরে গ্রাম পুরুষ শুন্য হয়ে গেছে। আজ মাদক বিক্রেতা এক নারীর মিথ্যা মামলার জন্য মানুষ আতঙ্কিত। এ রকম মাদক বিক্রেতা পুরুষ/নারী দেশের সর্বত্রই বসবাস করছে। মাদক বিক্রেতা কিংবা অন্যান্য অপরাধীরা যখন দেখবে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কেউ বাধা দিচ্ছে, তখন তারা রাস্তা থেকে যৌনকর্মী ধরে এনে বাদী সাজিয়ে কিংবা সংশ্লিষ্ট অপরাধীরা যদি নারী হয়, তাহালে সে নিজেই বাদী হয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মতো মামলা দায়ের করছে। আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে কেউ কেউ অভিযোগ করে থাকে, এদেশে মিথ্যা মামলার চার্জশিট হয়ে থাকে। তাতে অনেক মানুষের সাজা পর্যন্ত হয়। এমন অভিযোগও আছে মিথ্যা মামলার চার্জশিট হয়ে থাকে শুধুমাত্র একশ্রেণির অসৎ পুলিশ কর্মকর্তার সততার অভাবের জন্য। 

কেস স্টাডি-২

আমরা পত্র/পত্রিকায় দেখে থাকি, অনেক ব্যাক্তি মিথ্যা খুনের মামলায় হাজত খাটছে। এমনকি নিরীহ মানুষের ফৌজদারী কার্যবিধির বিধানমতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে। শেষে দেখা যায় মৃত ব্যক্তি ফিরে এসে বলছে, না আমি খুন হইনি। আমি বাড়ি থেকে রাগ করে চলে গেছিলাম। তখন কেউ প্রশ্ন করে না, এই মামলায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দেবার জন্য কি করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসার কোন নির্দোষ আসামিকে কোর্টে পাঠায় কিংবা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার চাকরি থাকে কি করে? অনেকে বলেন পুলিশের মারধর থেকে বাচাঁর জন্যই নিরীহ লোকেরা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়ে থাকে। এমন মিথ্যা মামলায় একজন বা তারও অধিক মানুষ জেল হাজত খাটে। তার জবাব তো সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসার কিংবা তার সিনিয়র কর্তৃপক্ষ দেন না।

অনেক সময় এমন অভিযোগও করা হয়ে থাকে, একশ্রেণির অসৎ পুলিশ কর্মকর্তা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে এমন সব কাজ করে থাকেন। যার খেসারত দিতে গিয়ে নিরীহ মানুষের জীবন ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। হয়তো কোন মামলায় কোন আসামিকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার জন্য। অসৎ পুলিশ কর্মকর্তা তখন নাকি দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে চালান দেয়া আসামিকে বলে দেন, উনার শেখানো কথামত ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জবানবন্দী না দিলে অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে এনে অত্যাচার করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তার মনোবৃত্তি যদি এতো নীচু ধরনের হয়ে থাকে, সেখানে আইনের পরিবর্তন করে কি দেশ থেকে অপরাধ নির্মূল করা যাবে। প্রশ্নটা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকলো।
 
তাই ধর্ষণের মতো অপরাধ কিংবা যেকোন অপরাধের বিনাশ ঘটাতে হলে অবশ্যই আমাদের দেশের অপরাধীদের মনোজগতের একটা শুভ পরিবর্তন আনতে হবে। যদি অপরাধীদের মনোজগতে একটা শুভ পরিবর্তন আনয়ন করতে পারি, তবেই সম্ভব হবে ধর্ষণসহ যেকোন অপরাধের বিনাশ ঘটানো। তখন দেখা যাবে কোন অপরাধের সাজা মৃত্যুদণ্ড করতে হচ্ছে না। মানুষ তখন আপন ইচ্ছে থেকেই অপরাধ থেকে লাখ লাখ মাইল দূরে থাকছে।

লেখক: আইনজীবী, কবি ও গল্পকার।

ব্রেকিংনিউজ/এমএইচ

breakingnews.com.bd
প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি