১৫ বছরে জাহাজ ভাঙায় ২১৫ শ্রমিকের প্রাণহানি

মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম
১ জুলাই ২০২০, বুধবার
প্রকাশিত: ০৬:২৪ আপডেট: ০৮:৪৮

১৫ বছরে জাহাজ ভাঙায় ২১৫ শ্রমিকের প্রাণহানি

জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। যার কারণে এ শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্থ করছে। শ্রমিকদের নিজেদের গফলতি এবং কাজের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবই প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২৩ জুন বিকেলে যমুনা শিপব্রেকিং ইয়ার্ড নামে একটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে কাজ করতে গিয়ে এক শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। চলতি বছরে চারজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গত ১৫ বছরে বিভিন্ন জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় ২১৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

গত ২২ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলায় খাজা স্টিলের শিপইয়ার্ডে একটি পুরানো জাহাজ ভাঙার সময় বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে দুই শিপইয়ার্ড শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন- ঝালকাঠির বাসিন্দা নিরঞ্জন দাশ (৩০) ও সুমন দাস (৩৫)। গত ৪ ফেব্রুয়ারি জিরি সুবেদার জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে কিরণ ত্রিপুরা নামে এক শ্রমিক মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ১০ ফেব্রুয়ারি এসএন কর্পোরেশনের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভারী লোহার টুকরোয় আঘাতের শিকার হয়ে মো. মিজানুর রহমান নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

ইপসার তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, গত আট বছরে ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে (২০২০ সাল) চারজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৯ সালে কাজ করতে গিয়ে মারা গেছে ২০ জন শ্রমিক এবং গুরুতর আহত হয়েছে ৪০ জন। ২০১৮ সালে ১৭ কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১৮ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং ১২ জন আহত হয়েছে।  ২০১৭ সালে ১৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, ২০১৬ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জন শ্রমিকের, ২০১৫ সালে ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, ২০১৪ সালে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, ২০১৩ সালে ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, ২০১২ সালে ২১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, ২০১১ সালে মৃত্যু হয়েছে ৭ জন শ্রমিকের, ২০১০ সালে শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের, ২০০৯ সালে শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের, ২০০৮ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জন শ্রমিকের, ২০০৭ সালে মৃত্যু হয়েছে ৮ জন শ্রমিকের, ২০০৬ সালে মৃত্যু হয়েছে ১০ জন শ্রমিকের এবং ২০০৫ সালে মৃত্যু হয়েছে ৮ জন শ্রমিকের।

গত ২৩ জুন বিকেলে যমুনা শিপব্রেকিং ইয়ার্ড নামে একটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে আবদুল হামিদ (২৪) নামে এক শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের মতে, কাজ করতে গিয়ে ভারি লোহার টুকরোতে তিনি মাথার গুরুতর আঘাত পান। পরে আহত অবস্থায় আবদুল হামিদকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই সময় ইয়ার্ডে যে জাহাজটি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে তার নাম স্টেলার নাইট। জাহাজটি দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পোলারিস শিপিংয়ের মালিকানাধীন।

বছরের পর বছর ধরে ইয়ার্ড দুর্ঘটনার বিশ্লেষণ করার পরে জানা যায়, শ্রমিকরা বেশিরভাগ বিস্ফোরণে বা জাহাজ থেকে বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসার পরে মারা যায়। কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিপজ্জনক পদার্থ শ্বাস ফেলা বা কোনও সুরক্ষা না দিয়ে ডিজেজিং উচ্চতা থেকে পড়া সহ দুর্ঘটনাগুলি জাহাজ ভাঙা শিল্পে কর্মক্ষেত্রের আঘাতের প্রধান কারণ। কর্মক্ষেত্রের হতাহতের অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে স্টিলের মরীচি ও ভারী প্লেট, পাশাপাশি সিলিন্ডার, বয়লার এবং জেনারেটরের বিস্ফোরণ এবং বৈদ্যুতিক শকে শ্রমিকরা পিষ্ট হয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে ইপসার সিনিয়র প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মুহাম্মদ আলী শাহিন ব্রেকিংনিউজকে বলেন, কর্মক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান হতাহত হওয়া দেশ-বিদেশের জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের চিত্রকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণ সুরক্ষার মান বজায় না থাকা।

তিনি বলেন, জাহাজ-ইয়ার্ডগুলি অবশ্যই সবুজ শিপ-ইয়ার্ড হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে এবং এখানকার আইনগুলি কঠোরভাবে প্রয়োগ করার মাধ্যমে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর মতে, জাহাজ ভাঙ্গা বিশ্বে একটি বড় পেশাগত এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পেশাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনকগুলির মধ্যে রয়েছে, অগ্রহণযোগ্যভাবে উচ্চ মাত্রার প্রাণহানী, আহত এবং কাজের সাথে সম্পর্কিত রোগ রয়েছে। জাহাজগুলির কাঠামোগত জটিলতার কারণে জাহাজ ভাঙা একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং পরিবেশ, সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যের অনেকগুলি বিপদ সৃষ্টি করে। 

জাহাজ ভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত ব্রেকিংনিউজকে বলেন, শ্রমিক মারা যাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই। আর মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ওয়ের্জ বোর্ডের মাধ্যমে ১৬ হাজার টাকার নূন্যতম মজুরী ধার্য্য না করা। এছাড়া মালিকপক্ষ এই কাজ কোন একটা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে আবার ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরেকটা সহকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেয়। রাতে কাজ নিষেধ থাকলেও বেশি মজুরি পাওয়ার আশায় কাজ করতে চাই শ্রমিকরা। এই কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের দুর্ঘটনা বেশি হয়।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আল আমিন ব্রেকিংনিউজকে বলেন, অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগের কারণে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডেগুলোতে শ্রমিক মৃত্যু এবং আহত হওয়ার মতো দুর্ঘটনা ঘটছে। মালিকদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সরঞ্জাম না দেওয়ার কারণেও। এছাড়া নিরাপত্তার মেনে চলার ক্ষেত্রে অনেক শ্রমিক বিষয়টি হালকাভাবে নেয়। তারা ৮ ঘণ্টার চেয়ে বেশি কাজ করে। যা অতিরিক্ত মজুরির আশায়। তখন এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে।

ব্রেকিংনিউজ/এমএইচ

bnbd-ads
breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি