একজন হুমায়ুন ফরীদি ও ফিরে দেখা সময়ের পদচিহ্ন

বিনোদন ডেস্ক
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, বুধবার
প্রকাশিত: ০৩:৩৭ আপডেট: ০৫:১৮

একজন হুমায়ুন ফরীদি ও ফিরে দেখা সময়ের পদচিহ্ন

মঞ্চ, টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্র- সব জায়গাতেই ছিল তার সাবলীল বিরচণ। এক কথায় হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন সব্যসাচী অভিনেতা। অভিনয়ে ভাঙা-গড়ার ও নতুনের সৃষ্টির এই কারিগর ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৫৯ বছর বয়সে সবাইকে চোখের জলে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কদিন আগেই ছিল দেশের বরেণ্য কিংবদন্তি এ অভিনেতার নবম মৃত্যুবার্ষিকী। 

স্বাধীনতা সংগ্রামী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন- ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ।/ মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।’ আজ বাঙালি মঞ্চ, টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্রপ্রেমীরাও তাদের প্রিয় অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদিকে নিয়ে কবিগুরুর এ পঙক্তিগুলো শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে পারেন। হয়তো করেনও।

দেখতে দেখতে ৯টি বছর পেরিয়ে গেল। তাকে হারাবার যন্ত্রণা আজও দেশের কোটি মানুষকে ব্যথিত ও তাড়িত করে। জীবনের রঙ্গমঞ্চ থেকে ৫৯ বছর বয়সে গুণী এই মানুষের না ফেরার দেশে চলে যাওয়া কাঁদিয়েছে সবাইকেই। শুধু অভিনয় দিয়েই মানুষকে বিমোহিত করেছিলেন ডাকসাইটে এই অভিনেতা। তাকে বলা হয় অভিনেতাদের অভিনেতা, একজন আদর্শ শিল্পী। তার অভিব্যক্তি, অট্টহাসি, ব্যক্তিত্বের ভক্ত কে না ছিলেন!

হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন একাত্তরের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। তবে সেই সনদের প্রয়োজন কোনোদিনই অনুভব করেননি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য ছিলো না তার। তার কাছে এ যেন ছিলো, দায়িত্ব পালন শেষে নিজের ঘরে ফেরার মতো বিষয়। অথচ স্বাধীনতা-পরবর্তী এই তিনিই বাউন্ডুলে জীবনকে সঙ্গী করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কাঠখড় পুড়িয়ে অর্থনীতির ছাত্র হয়ে উঠেছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে অন্য এক মানুষ জেগে উঠে তার ভেতর। 

পুরো নাম হুমায়ুন কামরুল ইসলাম ফরীদি (হুমায়ুন ফরীদি)। অসাধারণ ব্যক্তিত্ববান এ মানুষটি বাংলাদেশের অভিনয় জগতের সবচেয়ে ভাইটাল পারসন। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত অভিনেতা তিনি। মঞ্চ, টিভি আর চলচ্চিত্রে এরকম ভার্সেটাইল অভিনেতা খুব কমই আছে।

বন্ধু ও পরিচিত মহলে তাকে মুডি বলা হতো। কিন্তু তিনি নিজে কখনও নিজের সম্পর্কে তেমন মনে করতেন না। নিজস্ব স্টাইলেই ছিল তার শক্তির মূলাধার। সচরাচর ইন করে শার্ট পরতেন না। ঠিলেটাল ফুল হাতার শার্ট পরতে পছন্দ করতেন। মানুষকে চমকে দেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন ফরীদি। বিটিভির সাদাকালো যুগের সবচেয়ে অসাধারণ, সবচেয় শক্তিমান এই বর্ণিল অভিনেতা। বিটিভির ৮০'র দশকের দর্শকদের এই গুণী অভিনেতার অভিনয় দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রবলভাবে বেঁচে ছিলেন। তার বেঁচে থাকা ছিলো গোপনে-গহীনে, আশাবাদী মানুষের মতো।

সেলিম আল দীনের ‘সংবাদ কার্টুন’-এ একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করে ফরীদি মঞ্চে উঠে আসেন। অবশ্য এর আগে ১৯৬৪ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে কিশোরগঞ্জে মহল্লার নাটক ‘এক কন্যার জনক’-এ অভিনয় করেন। মঞ্চে তার সু-অভিনীত নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শকুন্তলা’, ‘ফনিমনসা’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘মুন্তাসির ফ্যান্টাসি’, ‘কেরামত মঙ্গল’ প্রভৃতি। ১৯৯০ সালে স্ব-নির্দেশিত ‘ভূত’ দিয়ে শেষ হয় ফরীদির ঢাকা থিয়েটারের জীবন।

টিভি নাটকের মধ্যে রয়েছে, নিখোঁজ সংবাদ, হঠাৎ একদিন, পাথর সময়, সংশপ্তক, সমুদ্রে গাংচিল, কাছের মানুষ, মোহনা, নীল নকশাল সন্ধানে, দুরবীন দিয়ে দেখুন, ভাঙ্গনের শব্দ শুনি, কোথাও কেউ নেই, সাত আসমানের সিঁড়ি, সেতু কাহিনী, ভবের হাট, শৃঙ্খল, জহুরা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, প্রতিধ্বনি, গুপ্তধন, সেই চোখ, অক্টোপাস, বকুলপুর কত দূর, মানিক চোর, আমাদের নুরুল হুদা প্রভৃতি। 

হুমায়ুন ফরীদি বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে যেমন অভিনয় করেছেন, তেমনি বিকল্পধারার চলচ্চিত্রেও রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। নব্বইয়ের গোড়া থেকেই হুমায়ুন ফরীদির বড় পর্দার জীবন শুরু হয়। বাণিজ্যিক আর বিকল্প ধারা মিলিয়ে প্রায় ২৫০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। এরমধ্যে প্রথম ছবি তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’। এরপর তার অভিনীত সিনেমার মধ্যে ‘সন্ত্রাস’, ‘বীরপুরুষ’, ‘দিনমজুর’, ‘লড়াকু’, ‘দহন,’ ‘বিশ্বপ্রেমিক’, ‘কন্যাদান’ (১৯৯৫), ‘আঞ্জুমান’ (১৯৯৫), ‘দুর্জয়’ (১৯৯৬), ‘বিচার হবে’ (১৯৯৬),‘মায়ের অধিকার’ (১৯৯৬) ‘আনন্দ অশ্র“’ (১৯৯৭), ‘শুধু তুমি’ (১৯৯৭), ‘পালাবি কোথায়’, ‘একাত্তুরের যীশু’, ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’, ‘মিথ্যার মৃত্যু’. ‘বিদ্রোহ চারিদিকে, ‘ব্যাচেলর’ (২০০৪), ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৪), ‘রূপকথার গল্প’ (২০০৬), ‘আহা!’ (২০০৭), ‘প্রিয়তমেষু’ (২০০৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

ব্যক্তিগত জীবনে হুমায়ুন ফরিদী দুবার বিয়ে করেন। ১৯৮০ সালে মিনুর সঙ্গে বিয়ে হয়। চার বছর পর বিচ্ছেদ। প্রথম সংসারে দেবযানী নামে তার এক মেয়ে রয়েছে। ওই বছরই বিখ্যাত অভিনেত্রী সুবর্ণা মোস্তফাকে তিনি বিয়ে করেন। তাদের বিচ্ছেদ ঘটে ২০০৮ সালে। দ্বিতীয় সংসারে তাদের কোনও সন্তান ছিল না। 

মৃত্যুর ৬ বছর পর ২০১৮ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন কালজয়ী এ অভিনয়গুরুকে।

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

breakingnews.com.bd
প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি