শিরোনাম:

নোয়াখালী-৩: কাস্তেটা এবার মজিবের হাতে

নিউজ ডেস্ক
৬ ডিসেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: 5:07 আপডেট: 5:17
নোয়াখালী-৩: কাস্তেটা এবার মজিবের হাতে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসন থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র কাস্তে প্রতীকে প্রথমবার ভোটের মাঠে নেমেছেন জেলা সিপিবির সাবেক সভাপতি মজিবল হক মজিব। 

চলমান বুর্জোয়া ধারার বাইরে গণঐক্যের মধ্য দিয়ে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প বলয় গড়ে তুলতেই সিপিবি তথা বাম গণতান্ত্রিক জোট এবার সারা দেশে ভোটে অংশ নিয়েছে। বামপন্থিদের এ জোটের একক প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই নিজের নির্বাচনী এলাকায় জোরকদমে প্রচার-প্রচারণাও শুরু করেছেন কমরেড মজিব। 

একজন বামপন্থি নেতা ও কাস্তের প্রার্থী হিসেবে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে মজিব তার নির্বাচনী ভাবনাগুলো মুঠোফোনে তুলে ধরেছেন ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর সামনে। 

কথার শুরুতেই মজিব বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একটা বিশেষ লক্ষ্যে সংগঠিত হয়েছে। ৩০ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা-বোনের রক্ত ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা এ দেশ স্বাধীন করে এনেছি। দেশ স্বাধীনের পর গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র এ ৪টি মৌলিক ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা হয়। যা ৪ মূলনীতি হিসেবে আমাদের সংবিধানে সন্নিবেশিত। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এই চার মূলনীতিকে ভিত্তি করে আজও আমরা মুক্তিযুদ্ধের সেই লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘আজ জাতির যে দুর্দশা ও ক্রান্তিকাল শুরু হয়েছে এর জন্য এককভাবে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিই দায়ি নয়। আমি বলবো- দায় পক্ষের শক্তিও আছে। আমাদের সংবিধান রচনার পরও মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যাভিমুখে জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তৎকালীন সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। সেইসময় বাম গণতান্ত্রিক শক্তি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের শক্তি সরকারকে সেই লক্ষ্য পূরণে চাপ সৃষ্টি করেছে। আর সেই আন্দোলন করতে গিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা রাজপথে রক্ত দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন।’ 

“সিপিবির বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও তৎকালীন ডাকসুর ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে ওইসব সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয়। আন্দোলনের মুখে কিছু বিষয় জাতীয়করণ হলেও তা শেষ পর্যন্ত সার্বিক অর্থে ব্যর্থ হয়েছে। শেখ মুজিব সরকার কলকারখানা ব্যক্তি মালিকানায় ফিরিয়ে দিয়ে সেই ব্যর্থতারই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।’ 

কাস্তের এই প্রার্থী বলেন, ‘শ্রমজীবীদের অধিকার আদায়ের লড়াই বুর্জোয়া দল দ্বারা সম্ভব নয়। সেজন্যই আমরা ভিশন মুক্তিযুদ্ধ-৭১ কে সামনে রেখে নিজস্ব অবস্থান থেকে নির্বাচন করছি। তবে একটি বিষয় সত্যি যে, আমরা আমাদের বাম গণতান্ত্রিক জোটকে এখনও নির্বাচনী লড়াইয়ে বুর্জোয়া জোটগুলোর সমপর্যায়ে নিয়ে আসতে পারিনি। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়, দেশের মিডিয়াগুলোও দ্বিদলীয় ধারার বাইরে আসতে পারছে না।’ 

বিগত সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলনে সামনের কাতারে থেকে লড়াই করা এ প্রার্থীর এবার ভোটে সরাসরি অংশ নেয়ার ভাবনা কেন এবং প্রত্যাশা কী- জানতে চাইলে মজিব বলেন, ‘আমরা যারা কমিউনিস্ট পার্টি বা প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল করি আমাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব কিছু কথা আছে। ঠিক যেমন আমারও আছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকলেও দেশে আজ প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিলুপ্ত। চেতনার পরিবর্তন না হলে কোনও কিছুরই পরিবর্তন হবে না। এই যেমন ধরুন, আমাদের বেগমগঞ্জে একটি স্টেডিয়াম আছে। আমি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বক্তৃতায় দাবি জানিয়েছি, স্টেডিয়ামটিকে শহীদ আখতারুজ্জামানের নামে নামকরণ করার জন্য। কিন্তু হয়নি। আমার নির্বাচনী এলাকায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না, শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীতের মর্মকথার শিক্ষা দেয়া হয় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে আমার এ কথাগুলোই জনগণের সামনে আরও সোচ্চার ও সংগঠিতভাবে তুলে ধরতে আমি নির্বাচনে এসেছি।’
 
এ শ্রমিক নেতা আরও বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম আজ দিকভ্রান্ত। কর্মসংস্থানের অভাব। বেকারত্ব মহামারি আকার ধারণ করেছে। দেশের বহু তরুণ বিপথগামী। আমার নির্বাচনী এলাকায় শ্রমজীবী মানুষ হাপিত্যেশ করছে। তাদের হাতে কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই। জনগণ জীবনের নূন্যতম মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে। রাষ্ট্র এসব ব্যাপারে নীরব। আমরা এই অসংগতি, এই বৈষম্যের কথাগুলো জনগণকে জানাতে চাই। তাদেরকে তাদের মুক্তির পথে আরও সচেতন করতে চাই।’

যেকোনও প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানেই লক্ষ্য বিজয়। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় কাস্তের প্রার্থী হিসেবে এই নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী? 

এমন প্রশ্নে এম এইচ মজিবের সাফ জবাব, ‘আমার কাছে নির্বাচন মানে ভোটে জয়লাভ করা নয়। ইতিহাসে কোনও বিপ্লবীই জনগণকে বাদ দিয়ে ক্ষমতার চিন্তা করেননি। করলেও সফল হয়নি। আমরা জনগণের কাছে তাদের বাঁচার দাবি নিয়ে যেতে চাই। তাদের মুক্তির পথ দেখাতে চাই। লড়াই-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতার দীর্ঘ পথপরিক্রমায়ও আমরা যদি জনগণকে সঠিক পথের দিশা দিতে না পারি তবে বুর্জোয়া শ্রেণি ও সাম্রাজ্যবাদ সবকিছুকে গ্রাস করবে। আমরা জনগণের দাবি ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ভোটের মাঠে নেমেছি।’
 
জাতীয় নির্বাচনে একজন প্রার্থী হিসেবে প্রতিপক্ষ তথা বিরোধী শিবির থেকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ কোনও হুমকিধামকি-চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে কিনা- জানতে চাইলে মজিব বলেন, ‘বুর্জোয়ারা রাজনৈতিকভাবে তো করেই, মানসিকভাবেও হেয়প্রতিপন্ন করে। হাস্যরসিকতা করে। মাস্তান-দুর্বৃত্ত দিয়ে হয়রানি করতে চায়। আমি নিজেও এটি ফিল করছি। গত কিছু দিনে আমি যেখানেই মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছি, ফিরে এসে শুনেছি- সেখানে পরক্ষণেই আমার বিপক্ষে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা করা হয়েছে। আমাকে তারা শত্রু মনে করে। এটা শুধু বিএনপি-জামায়াতই নয়, নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবি করা আওয়ামী লীগও এমনটি করে। আমরা ভোটে অংশ নেয়ার মাধ্যমে এবার এই শ্রেণিশত্রুদেরই জনগণকে চিনিয়ে দিতে চাই। শ্রমজীবী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সামনে এদের মুখোশ উন্মোচিত করতে চাই।’

মজিবল হক মজিবের সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনপঞ্জি:
১৯৫৭ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার রাজাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মজিবল হক মজিব। ১৯৭৩ সালে ঢাকার সেগুন বাগিচা হাইস্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে মজিব তখনকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্র ইউনিয়নের জাতীয় সম্মেলন দেখতে গিয়েই প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭০ থেকে ’৭৫ এর আগস্ট পর্যন্ত তার বাস ছিল তখনকার ঢাকার রেল কলোনিতে। এই সময়কালেই একাত্তরের ২৫ মার্চের কালোরাত এবং ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তার কিশোর হৃদয়ে সংগ্রামী অনুভূতি সৃষ্টি করে।

নোয়াখালীতে ফেরার পর ক্লাব, যুবসংঘ, গানের আসর, বিভিন্ন স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছাড়াও তিনি কমরেড মেহেদী, কমরেড সলিম উল্লা চৌধুরীর মতো বাম বিপ্লবী নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। এসএসসি পরীক্ষার এক সপ্তাহ পরই (১৯৭৬ সালে সামরিক শাসনকালে) গ্রামের বাড়ি থেকে গেপ্তার হয়ে প্রায় দুই মাস কারাবরণ করেন তিনি।

কলেজে ভর্তির পরপরই মজিব ছাত্র ইউনিয়নকে সংগঠিত করায় মনোযোগী হন। ছাত্র সমাজের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তার কারণেই চৌমুহনী কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রথমে জিএস ও পরেরবার ভিপি পদে নির্বাচন করেন। ধারাবাহিকভাবে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন কলেজ শাখার নির্বাচিত সভাপতি, উপজেলা সম্পাদক, জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা সভাপতি হন। নোয়াখালী কলেজ হোস্টেলের এক কর্মী সভায় তাকে ‘জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ আহ্বায়কও করা হয়।

ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সভাপতি থাকাকালে চৌমুহনী কলেজকে সরকারিকরণের ক্ষেত্রে ছাত্র নেতাদের মধ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করেন মজিব। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হয়ে কারারুদ্ধ হন তিনি। এসময় তাকে মুক্ত করতে গিয়ে আব্দুল হক, মোমিন, কাজী নূর মোহাম্মদ, বাদল, আলমগীরসহ ১৩ জন ছাত্রনেতা গ্রেফতার হয়ে ১৮ দিন কারাবরণ করেন। তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে  এক মাস ২৩ দিন পর কারামুক্ত হন মজিব।

১৯৮২ সালে কমরেড মজিব কমিউনিস্ট পার্টির জেলা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নিয়ে তিনি পার্টির সিদ্ধান্ত মোতাবেক শ্রমিক সংগঠন টিইউসি-তে কাজ শুরু করেন। ডেল্টা জুট মিল, ছাপাখানা, অ্যালমুনিয়াম, বেকারি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, রাইসমিল, ওয়ার্কসপ, দোকান কর্মচারি, পুঁথিঘর বাইন্ডিং, হরিজন (সুইপার), নরসুন্দর (শীল) ও বিড়ি শ্রমিকদের ১৩টি রেজিস্টার্ড ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হওয়া ট্রেড ইউনিয়নের জেলা সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৮৩ সালে তিনি সিপিবি জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হন। একই বছর তিনি ৫২টি শ্রমিক সংগঠনের সিবিএ নেতাদের নিয়ে গঠিত শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক হন।

১৯৮৬ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ডেল্টা জুট মিলের শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে মিল গেইটে এক বিশাল শ্রমিক সভা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পাঁচ মাস ২৩ দিন পর তার মুক্তি মেলে। ১৯৯০ সালে পার্টির জেলা সম্মেলনে মজিবকে একমাত্র সহ-সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। বছর খানেকের মধ্যে বিলোপবাদের বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি দেখা দিলে তিনি মার্কসবাদী-লেলিনবাদী চিন্তাধারায় সোচ্চার কমরেডদের নিয়ে পুনরায় জেলায় একটি শক্তিশালী পার্টি গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৯৩ সালে নোয়াখালী জেলা সিপিবির সম্মেলনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন; ওই পদে তিনি ২০১৬ পর্যন্ত ছিলেন। 

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2