শিরোনাম:

‘আমি যাইমু গো যাইমু আল্লাহর সনে’

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
৬ ডিসেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: 1:15 আপডেট: 1:19
‘আমি যাইমু গো যাইমু আল্লাহর সনে’

মরমি কবি ও বাউল সাধক হাসন রাজার ৯৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন তিনি। ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর হাছন রাজা সুনামগঞ্জ শহরের সুরমা তীরে লক্ষ্মণশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি ছিলেন রাজপরিবারের সন্তান। তারা ছিলেন এক হিন্দু রাজবংশের উত্তরাধিকারী। সিলেটের রামপাশা ও সুনামগঞ্জের লক্ষ্মণশ্রী মিলে বিস্তৃত ছিল তার রাজত্ব। কিন্তু অন্য রাজাদের থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। 

তার ভেতরে ছিল মরমি চেতনা। রাজকীয় আড়ম্বরে চলাফেরা তার খুব অপছন্দ ছিল। তিনি প্রাচীন ঋষিদের মতো শব্দ নিয়ে খেলা করতেন। সে কারণে তাঁকে রাজর্ষি বলা যায়। তবে ঋষিদের শব্দব্রহ্ম ছিল মূলত ঈশ্বর ও অতীন্দ্রিয় জগৎ
নিয়ে। হাসন রাজারও সে রকম ভাবনা ছিল। পাশাপাশি তার ভাবনা ছিল মানুষ, জীবন ও জগৎ নিয়ে। 

আর সেখানেই রয়েছে তার দার্শনিক পটভূমি। রাজর্ষি হাসনকে সেখানে দার্শনিক হাসন রাজা হিসেবেও বিচার করা যায়। তার গান বা কবিতায় ছত্রে ছত্রে রয়েছে এই দর্শন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই দর্শনকে উপলব্ধি করেছেন। 

আন্তর্জাতিক পরিসরে বক্তৃতা করতে গিয়ে তিনি হাসন রাজার এই দর্শনের কথা তুলে ধরেছেন। গ্রাম্য কবির এই দার্শনিক চিন্তাকে তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। 

হাসন রাজার জীবনযাত্রা মোটেও বাউলদের মতো ছিল না। তিনি গৃহী ছিলেন, সংসারী ছিলেন। বৈষয়িক জ্ঞানও যে তার খুব কম ছিল, সেটা বলা যাবে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন বাউল। সহজ-সরল অনাড়ম্বর চলাফেরায় তিনি বাউলদের নৈকট্য অনুভব করতেন। সামন্তবাদী পারিবারিক কাঠামোয় বাউলদের জীবনপদ্ধতি অনুসরণ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। 

হাসন রাজার দৌহিত্র দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বলেছেন, বাউল-ভাবনা থাকলেও হাসন রাজা বাউল ছিলেন না। কিন্তু বাউলদর্শন যে তাঁকে প্রভাবিত করেছিল, সেটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তিনি অস্বীকার করেছিলেন। মোল্লা-মুনশির বিপক্ষে তিনি অনেক গান রচনা করেছেন। তিনি কোনো মাধ্যম ধরতে চাননি। সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সুফিবাদী চিন্তা লালন করেছেন। 

বলেছেন, ‘আমি যাইমু গো যাইমু আল্লাহর সনে।’ বলেছেন আল্লাহর রূপ ও আল্লাহর রঙের কথা। এ কথাগুলো শরিয়তের সঙ্গে খাপ খায় না। মারফতি তত্ত্বের সঙ্গে মেলে। তবে এসব তত্ত্বই ভাববাদী দর্শন। এর মধ্যে ফুটে উঠেছে অসার সংসার, ক্ষণস্থায়ী জীবন ও জগতের নিষ্ফল আনন্দ। তিনি জীবনের প্রয়োজনে একাধিক বিয়ে করেছেন। 

সেসব নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে ছাড়েননি। বলেছেন, ‘আর করবায়নি হাসন রাজা দেশও দেশও বিয়া।’ একাধিক গানে তার ছড়িয়ে আছে মৃত্যুচেতনা। তিনি মৃত্যুকে বন্দনা করেছেন। জানতেন, মৃত্যু তার কাছ থেকে প্রিয় জমিদারি লক্ষ্মণশ্রী রামপাশা সব কেড়ে নেবে। তবে তার এই কবিতা ও গানকে বস্তুবাদী দর্শন দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়। 

এর মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের নিরর্থকতা যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি সেই নিরর্থকতাকে তাৎপর্য পূর্ণ করে তুলতে চেয়েছেন তার জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে। হাসন রাজা যেমন গানের রাজা, তেমনি লোকেরও রাজা। 

লোক বলতে এখানে লোকসাহিত্য বোঝানো হচ্ছে। তার জীবনদর্শন আলোচনা করলে একই সঙ্গে একজন রাজা এবং একজন ঋষিকে খুঁজে পাওয়া যায়।

হাসন রাজা মুখে গান রচনা করতেন। তার গানে তার চিন্তা-ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। যদিও তার রচিত গানের সঠিক হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। তবে ‘হাছন উদাস’ গ্রন্থে তার ২০৬টি গান সংকলিত হয়েছে।

তার উল্লেখযোগ্য কিছু গান হলো- লোকে বলে, বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার, মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপরে, সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা, কানাই তুমি খেইল খেলাও কেনে, একদিন তোর হইবে রে মরণ রে হাসন রাজা, আমি যাইমু গো যাইমু আল্লাহর সনে।

ব্রেকিংনিউজ/এনকে

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2