শিরোনাম:

বিলুপ্তির পথে ঢাকার টমটম

আহসান হাবিব সবুজ
৪ ডিসেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 5:36 আপডেট: 8:19
বিলুপ্তির পথে ঢাকার টমটম

রাজধানীর গুলিস্থান থেকে সদরঘাট। এ পথে যারা যাতায়াত করেন তাদের চোখ কেড়ে নিবে ঘোড়ায় টেনে নেয়া বিশেষ এক ধরনের যানবাহন যা টমটম নামে পরিচিত। এসব অঞ্চলে চলাচলকারীদের কানে ভেসে আসবে খট খট শব্দ। এছাড়াও শোনা যাবে চালকের নানা হাঁক-ডাক। এসব দৃশ্য টমটমের।
 
টমটম একটি প্রাচীনতম একটি যানবাহান। এক সময় এ পরিবহনে সওয়ার হতেন রাজারা, জমিদারেরা। তাই টমটমে রয়েছে একটি রাজকীয় ভাব, রাজকীয় আভিজাত্য।
 
অভিজাত এ বাহনটি এখনো অনেকেই বিয়ের বরযাত্রীতে বরের বাহন হিসেবে ব্যবহার করেন। এতে করে বিয়েতে আলাদা একটি আভিজাত্যের পালক যুক্ত হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্ষপূর্তি, কোনো পণ্যের প্রচারেও ব্যবহার হয়ে থাকে টমটম।
 
 তবে সাধারণ যাত্রী পরিবহনেই টমটম বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজধানীর গুলিস্থান, সদরঘাট, ফুলবাড়িয়া প্রভৃতি স্থানে বেশি দেখা মিলে টমটমের। সারাদিন যাত্রী টেনে টমটমের ঘোড়া রাতে বিশ্রাম নেয় ফুলবাড়িয়া ফ্লাইওভারের নিচে। রাতে জ্বলজ্বলে চোখের এ ঘোড়ার দেহে রাজ্যের ক্লান্তি থাকলেও টিকিয়ে রেখেছে ইংরেজ আমলে চালু হওয়া ঐতিহ্য।
 
৪০০ বছরের তিলোত্তমা নগরী ঢাকার বদলে গেছে অনেকে কিছুই। চারদিকে এখন যান্ত্রিকীকরণ। যান্ত্রিক পরিবহনের চাপসহ নানা কারণেই শত বছরের ঐতিহ্য হলেও টমটম এখন বিলুপ্তির পথে।  
 
জানা যায়, ইংরেজ আমলে ঢাকার রাস্তায় দুই শতাধিক টমটম চলাচল করলেও এখন হাতে গোনা কয়েকটি টমটম রয়েছে। যে কয়টি টমটম এখনো টিমটিম করে চলছে টাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। টমটম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তেমন আয় না হওয়ায় পেশা বদল করতে চান তারা।
 
টমটম টেনে চলা ঘোড়াগুলোকে রোদ, বৃষ্টি, ঝড়সহ নানা প্রতিবন্ধতা সহ্য করে দৌড়াতে হয়। যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়াই যেন এসব ঘোড়ার জীবনের প্রাপ্তি। সারাদিনে তেমন  খাওয়া পড়ে না মুখে। সন্ধ্যার আলো গভীর হয়ে রাত নেমে এলেই ঘোড়াগুলো বেঁধে রাখা হয় ফুলবাড়িয়া ফ্লাইওভারের নিচে। সেখানে খেতে দেয়া হয় ছোলার ভুষি আর পানি। মাঝে-মধ্যে ভালো খাবার আয়োজন হলে কপালে জোটে ঘাস।
 
ফ্লাইওভারের নিচে নানা প্রতিকূরতায় ঘোড়াগুলোর রাত্রিযাপন করতে হয়, নেই কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা। রাতের পর রাত তাদের কাটে এখানেই, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। জানা যায়, এসব ঘোড়া সপ্তাহে পাঁচদিন যাত্রীবাহী গাড়ি টানে, আর বাকি দু’দিন পার্কে বিচরণের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়।
 
এসব ঘোড়ার মধ্যে অনেক ঘোড়াই অসুস্থ এবং ঘাড়ে আঘাত পাওয়া। এর কারণ জানতে চাইলে কোন উত্তর দেয়নি ঘোড়ার মালিকরা। আরিফ নামের এক ঘোড়ার গাড়ির মালিক বলেন, ‘আগে এখানে প্রায় ১০০ এর উপর ঘোড়া ছিল কিন্তু এখন আর আগের মত যাত্রী হয়না তাই ঘোড়ার সংখ্যাও কমে গেছে। আর মালিকদের আয় অনেক কমে গেছে তাই অনেক অসুস্থ ঘোড়াকে ঠিক মতো চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে আবার অসুস্থ ঘোড়াকে দিয়েই মানুষ আনা নেয়া করছেন।’
 
ঘোড়ার গাড়ি মালিক রহমত উল্লাহ শেখ তিনি ব্রেকিংনিউজকে জানান, তার ৫টি ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। তিনি ভাড়া হিসাবে গাড়ি চালান আবার কেউ রিজার্ভ করলে তাও দেন। এটি তার বংশগত পেশা। তার দাদা প্রথম এ বাহন চালানো শুরু করেন, পরে তার বাবা চালিয়েছেন। এখন তিনি চালান। অর্থাৎ তিন প্রজন্ম ধরে টমটম চালাচ্ছেন রমহত উল্লাহ।
 
তিনি আরও বলেন, ‘শুনেছি ইংরেজ আমলে অনেক গাড়ি ছিলো, কিন্তু আমার বাবা যখন চালাতেন তখন দেখেছি ৮০ থেকে ১০০টি গাড়ি ছিলো আর এখন মাত্র ৪০টি গাড়ি চলে। দিনে দিনে গাড়ির সংখ্যা কমে যাচ্ছে।’
 
কেন কমে যাচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঢাকার রাস্তায় এ বাহন চালানো খুবি কষ্টকর। অন্যদিকে, তেমন ইনকাম নাই। কোনো মাসে একটা দুইটা রিজার্ভ হয়, কোন মাসে হয়না। আর দিনে মাত্র ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মতো আসে, এ দিয়ে ঘোড়ার খাবারই জোটে না। ঘোড়ার দেখাশোনার জন্য ২ জন লোক রেখেছি তাদের বেতন দিতে হয়, সব মিলিয়ে পোষায় না। তাই এ বাহনটি বিলুপ্তির পথে।’
 
আগে ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন, বর্তমানে রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন নুরু মিয়া। তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘আগে ঘোড়ার গাড়ি চালাইতাম, সংসার চলতো না, এখন রাজমিস্ত্রীর কাজ করি ভালোই আছি।’ তিনি বলেন, ‘সারাদিন গাড়ি চালায়ে ৫ শত টাকার বেশি আসতো না, তার মধ্যে গাড়ির ভাড়া দিতে হতো, ঘোড়ার খাবারও দিতে হতো, সব মিলিয়ে দিন শেষে দেখা যেত পকেটে টাকা নাই। তাই ঘোড়ার গাড়ি চালানো বাদ দিয়ে রাজমিস্ত্রীর কাজ শুরু করি।’
 
ঘোড়ার গাড়ি চালক রঞ্জু বলেন, ‘শখের বসে এ গাড়ি চালানো শুরু করি এখন অন্য কাজ করতে ভালো লাগে না। যদিও ইনকাম কম তার পরেও করছি। তিনি বলেন , ‘ঐতিহ্যবাহী এ গাড়ি বাংলাদেশ ধরে রাখার জন্য সরকারের পদক্ষেব নেওয়া উচিত, তা নাহলে দেশ থেকে এ গাড়ি বিলপ্ত হয়ে যাবে। ছোট সময় দেখেছি ঘোড়ার গাড়ি অনেকগুলো ছিলো, কিন্তু বর্তমানে কমে গেছে। শুধু ঢাকার গুলিস্থানেই বেশী লক্ষ্য করা যায়। অন্য কোথাও এ গাড়ি তেমন নাই  বললে চলে।’

ব্রেকিংনিউজ/এএইচএস/জেআই

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2