শিরোনাম:

সবার প্রত্যাশা প্রশ্নবিদ্ধহীন নির্বাচন

আহমদ রফিক
২৯ নভেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: 7:22
সবার প্রত্যাশা প্রশ্নবিদ্ধহীন নির্বাচন

এখনো নির্বাচন বাদে কথা নেই, লেখাও নেই। দৈনিক পত্রিকা থেকে সব পত্রিকারই সম্পাদকদের দাবি নির্বাচনভিত্তিক রচনা। কাঁহাতক চলতে পারে একই বিষয় নিয়ে কচকচি। তবে এটাও ঠিক বিষয়টির রয়েছে একাধিক অনুষঙ্গসহ নানা পার্শ্বমুখ। সেসব নিয়ে যে যার মতো তথ্য-যুক্তি তুলে লিখে চলেছেন। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলি—রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে এই যে লেখালেখি এগুলো সম্পর্কে পাঠকের তথা জনপ্রতিক্রিয়া যতটা জানা দরকার ততটা মেলে না। অন্য ভাষ্যে ‘ফিডব্যাক’ যথাযথ মাত্রায় নয়।

তাতে শুধু যে লেখকদের চিন্তাভাবনা গোছানোর ক্ষেত্রে, যুক্তি-তথ্য সাজানোর ক্ষেত্রে অসুবিধা তা-ই নয়, এর পরিণামে লেখার মাধ্যমে জনমত তৈরিতেও দেখা দেয় বাধা, ব্যাহত হয় যুক্তিবাদী জনমত গঠন, অবশ্য শিক্ষিত শ্রেণিতে। তবে ওই যে বহু ব্যবহৃত ‘ফেসবুক’ ও অনুরূপ মাধ্যম তা ওই বাধা কিছুটা অতিক্রম করতে সাহায্য করে।

তাতেও অসুবিধা। কিছুদিন আগে ফেসবুকের লেখালেখিতে রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়েও মাঝেমধ্যে এমন যুক্তিহীন কথাবার্তা, অশালীন, আপত্তিকর ও সুরুচিহীন মন্তব্য যে সেসব প্রতিহত করার যুক্তি দিয়ে সরকার যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেছে তার সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে সাংবাদিক মহলে তুফান দেখা দিয়েছে।

বিষয়টির গুরুত্ব আন্তর্জাতিক মহলকেও স্পর্শ করেছে। তারা এ ক্ষেত্রে প্রতিবাদী। তাদের যুক্তি এতে গণমাধ্যমের তো বটেই, ব্যাহত হবে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বাক্স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। অন্যদিকে স্বদেশি মহলে ক্ষোভ, বিরোধিতার প্রকাশ কম ঘটেনি, বিশেষ করে সাংবাদিক মহল থেকে প্রবল প্রতিবাদ। কিন্তু কোনো সুফল মেলেনি। তাদের ইচ্ছামাফিক চলেছে, প্রস্তাবটি আইনে পরিণত করেছে। প্রতিবাদীদের আশ্বাস দিয়েছে এই বলে যে এ আইনের কোনো অপব্যবহার হবে না, নিরপরাধ ব্যক্তি নিগৃহীত হবে না ইত্যাদি। কিন্তু যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁরা নিজ রাজনৈতিক স্বার্থকেই প্রাধান্য দেন—এটাই রীতি। তাই গণমাধ্যম এবং মতামতের স্বাধীনতায় বিশ্বাসীরা আশ্বস্ত হচ্ছেন না।

দুই.
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নানা উপলক্ষে—যেমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আন্তর্জাতিক মহলে, দেশের সরকারবিরোধী মহলে। এমনকি দলীয় বিচারে নিরপেক্ষ, আপন মতামতের আস্থাবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আসন্ন নির্বাচন নিয়ে চিন্তিত। চিন্তা নির্বাচনের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতা নিয়ে।

এসব বিষয় নিয়েও লেখালেখি কম হচ্ছে না দৈনিকগুলোর উপসম্পাদকীয় কলামে। এদের বেশির ভাগই নির্দলীয়। নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় তা নিয়ে বিস্তর প্রস্তাব, চিন্তাভাবনার প্রকাশ। এমন বিষয়টি প্রধানত নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে, অংশত বা নেপথ্যে সরকারের প্রভাবে। তারাই নির্বাচন পরিচালনার মাঝিমাল্লা।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রেস কনফারেন্সে, তাঁর বিবৃতিতে ক্রমাগত নিরপেক্ষ কার্যক্রমের আশ্বাস দিয়ে চলেছেন, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের যথাবিহিত ব্রিফিং দিয়ে যাচ্ছেন, আবার সরকারের সঙ্গে তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎও চলছে।

সব কিছু নিয়ে একধরনের অনিশ্চিত, আস্থাহীন পরিবেশ বিরাজ করছে নির্বাচনভিত্তিক সংশ্লিষ্ট মহলে। এমন আগাম সম্ভাবনা মাথায় রেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তরফ থেকে প্রস্তাব উঠেছিল সুনির্দিষ্টভাবে, নানা যুক্তিতে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার এবং নির্বাচন সন্ত্রাসমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও বিশৃঙ্খলামুক্ত করতে সেনাবাহিনী নিয়োগ করার।

অন্যদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কথিত বিরোধী দলের অবশ্য বরাবরের দাবি ছিল সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ নতুন সরকারের অধীনে নির্বাচন পরিচালনা করা, সবার আস্থাভাজন প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে নির্বাচন চলাকালে সেনাবাহিনী নিয়োগ ইত্যাদি বহু দফার দাবি। ‘কিন্তু সেসব দাবি পূরণ হয়নি, আশ্বাসেই সব শেষ হয়েছে।

এবারের নির্বাচন অনেক সংশয়, প্রশ্ন ও আস্থা-অনাস্থার টানাপড়েন সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সবার অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। এটা সবার জন্যই স্বস্তির সংবাদ। কিন্তু তবু অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে প্রতিপক্ষ শিবিরে। এর মধ্যে একটি অবাঞ্ছিত ঘটনাও ঘটে গেছে, তবু এর মধ্যেই নির্বাচনের সুবাতাস আপাতত দৃশ্যমান। তা সত্ত্বেও পরিপূর্ণ শান্তি ও স্থিতাবস্থার অভাব নিয়ে অভিযোগও উঠছে।

এবং তা মূলত বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে। তাদের বক্তব্য, সংলাপে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট আশ্বাস সত্ত্বেও নাকি তাদের নেতাকর্মী অনেকের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ব্যাপকভাবে। এ পরিস্থিতিতে তাদের নেতাকর্মী অনেকে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারছেন না। অনেকে গ্রেপ্তারের ভয়ে আত্মগোপনে ইত্যাদি ইত্যাদি। এ অবস্থায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কিভাবে সম্ভব?

এসব প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতেই বোধ হয় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে ভাবিত বিশিষ্টজনদের লেখায় উদ্বেগ ও অস্বস্তি প্রকাশ পাচ্ছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে’? এ প্রশ্নে এক সমাজতন্ত্রী রাজনীতিবিদ মনে করেন, এবারের নির্বাচন অনেকটাই আকাঙ্ক্ষিত চরিত্রের হতে পারে। তাঁর মতে এর কারণ নির্বাচনে আন্তর্জাতিক মহলের উপস্থিতি ও চাপ, বিশেষ করে নির্বাচনের মাঠে সেনাবাহিনী মোতায়েন অনিয়ম, কারচুপি, ভুয়া ভোটারের সিল-ছাপ্পর ইত্যাদি প্রতিরোধে সহায়ক হবে। তাতে করে এবার হয়তো আমরা একটি নিরপেক্ষ চরিত্রের নির্বাচন দেখতে পাব।

অবশ্য ভিন্নমত যে নেই তা নয়। তা হলো নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা নিয়ে। যেহেতু দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, তাই নির্বাচন কমিশন কতটা স্বাধীন কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন। যদি না পারে, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে গ্রহণ-বর্জনের অবকাশ তৈরি হবে। তার মানে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যানের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলন, সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি। স্বভাবতই সমাজে অস্থিরতা, নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদি অবাঞ্ছিত ঘটনার জন্ম নেবে। শুরু হবে মানুষের দুর্দশা-দুর্গতি।

তিন.
তাই এ পর্যন্ত বহমান নির্বাচনী সুবাতাস যাতে অব্যাহত থাকে তার জন্য স্বচ্ছ-নিরপেক্ষ ভোটপ্রক্রিয়ার প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে সর্বাধিক সতর্কতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হয়। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করলে ক্ষতি কী? এর আগে যে দু-একটি স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা তো ধরাবাধা পথেই সম্পন্ন হয়েছে।

এ ছাড়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ করণীয় কাজ হলো অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ। এরই মধ্যে শোনা যাচ্ছে হাতিয়ারে শাণ দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন আপন শক্তিতে ওই ভয়ংকর সন্ত্রাসী শক্তিকে কতটা প্রতিহত করতে পারবে? সে জন্যই দরকার নির্বাচনী মাঠে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের কঠোর সিদ্ধান্তের নিশ্চয়তা। এ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন সূচনাপর্ব থেকে নিশ্চিত ছিল না।

অন্যদিকে সরকারের কর্তব্য হবে চিহ্নিত-অচিহ্নিত সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা। র‌্যাব এ ব্যাপারে সুষ্ঠু সফল ভূমিকা পালন করতে পারবে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আত্মতৃপ্তির সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।

স্বচ্ছ নির্বাচনের পক্ষে আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তা হলো গণমাধ্যমের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা, যেমন কার্যক্রমের, তেমনি প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে। যেহেতু দল বিশেষের সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাই নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষায় সরকারকেও সতর্ক থাকতে হবে। দলের উগ্রপন্থী তরুণদের সামলে রাখতে হবে, যাতে সরকারকে কোনো অপ্রিয় প্রশ্নের সম্মুখীন হতে না হয়। বিব্রত হতে না হয়।

আমরা আগে একাধিকবার উল্লেখ করেছি কথাটা যে বর্তমানে বিরাজমান পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নানা দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, কারো মতে দু-এক পা এগিয়ে আছে। তাই তাদের শঙ্কার কারণ আছে বলে মনে হয় না। তাই নির্বাচন যাতে অবাধ হয় সে চেষ্টায় তাদের আন্তরিক হতে হবে।

তবে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বশর্ত পূর্ব ধারায় নির্বাচন কমিশনের শতভাগ নিরপেক্ষতা, সব দলের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধার পরিবেশ সৃষ্টি করা, কোনো প্রকার অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার প্রশ্রয় না দেওয়া, অবহেলা বা উদাসীনতার প্রকাশ না ঘটানো। কিন্তু সমস্যা হলো নির্বাচনের মূল গায়েন প্রধান নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে এর আগে প্রশ্ন উঠেছে, এখনো উঠছে।

দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যে ২৬ নভেম্বর একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদে একজন নতুন ‘বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন।’ তাঁর আপত্তি কমিশনকে নিয়ে নয়, সিইসিকে নিয়ে। তাঁর সঙ্গে আলাপ করে তাঁরা সন্তুষ্ট হতে পারেননি বলে এই দাবি।

কিন্তু শেষ মুহূর্তে এই দাবি পূরণ কতটা সম্ভব তা নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে। এ সংবাদটি নির্বাচনবিষয়ক অশনিসংকেত নাকি চাপ সৃষ্টি তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। মনে হয় না, সরকার এ দাবি মেনে নেবে। তবে এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে তাঁর কার্যকর ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে ‘অনুরাগ বা বিরাগের’ ঊর্ধ্বে থাকার কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেটাই সবার কাম্য। বাস্তবিকই সবাই চাই একটি প্রশ্নহীন নির্বাচন, পক্ষপাতহীন নির্বাচন। আর বিষয়টি সিইসিকে মাথায় রাখতে হবে তাঁর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রক্ষার প্রয়োজনে। কিন্তু তিনি কি তা করবেন বা করতে পারবেন? [লিখা: সংগৃহিত]

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2