শিরোনাম:

টাকার জন্য সন্তান বিক্রি করলেন বাবা!

মাসুদ রানা, ময়মনসিংহ
৯ নভেম্বর ২০১৮, শুক্রবার
প্রকাশিত: 10:28
টাকার জন্য সন্তান বিক্রি করলেন বাবা!

২০ হাজার টাকা ও আধা পাকা একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়ার বিনিময়ে নিজের নবজাতক পুত্র শিশুকে বিক্রি করে দিলেন বাবা। শিশুটির বয়স যখন ৪ দিন তখনি পুত্র সন্তানকে বিক্রি করেদেন হতদরিদ্র পিতা দুলাল মিয়া। অভাবের তাড়নায় বাবা নবজাতক বিক্রি করলেও মা রওশন আরার কান্না কোনোভাবেই থামছে না। ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার জোরবাড়িয়া গ্রামে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার জোরবাড়িয়া গ্রামের মৃত খোরশেদ আলীর শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলে দুলাল মিয়ার (৪৫) প্রথম স্ত্রী নাজমা খাতুন দুই সন্তান রেখে প্রায় ১৫ বছর পূর্বে মৃত্যুবরন করেন। প্রথম স্ত্রী মৃত্যুর ৫ বছর পর পাশ্ববর্তী জোরবাড়িয়া কোনাপাড়া গ্রামের আ. মান্নানের কন্যা রওশনা আরাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেন দুলাল। প্রায় ১০ বছর সংসার জীবনে দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে জন্ম নেয় শান্তা, সিয়াম, সানজিদা, সিফাদ ও সদ্য ভুমিষ্ঠ হওয়া নবজাতকসহ ৫ সন্তান। বাকি  ৪ জনের বয়স দেড় বছর থেকে ৮ বছর।

আরও জানা যায়, গত ২৫ দিন পূর্বে রওশন আরা নবজাতক পুত্র সন্তানটি জন্ম দেন। হতদরিদ্র বাবা সন্তান লালন-পালন করতে পারবে না বলে বন বিভাগে চাকুরি করেন এমন এক ব্যাক্তির কাছে ২০ হাজার টাকা ও নতুন একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার বিনিময়ে স্থানীয় আব্দুর রউফের মাধ্যমে চার দিন বয়সের নবাজাত শিশুকে বিক্রি করে দেয়।

এদিকে মা রওশন আরা বলেন, ‘২০ হাজার টাকা ও একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কথা বলে আমার ৪ দিনের পুত্র সন্তানকে ঢাকার এক চাকুরিজীবীর কাছে দিয়ে দিয়েছেন তার বাবা। স্থানীয় আব্দুর রউফের সাথে যোগাযোগ করে সন্তানের খোঁজ খবর জানতে হয়। আমরা সরাসরি যোগাযোগ করতে পারি না। তার কাছে শুনছি আমার ছেলে নাকি ভালো আছে। হাসপতালে চিকিৎসা চলছে। আমার ছোট পুত্র সন্তানের জন্য বুকটা ফেটে যাচ্ছে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা রওশন আরা।’

অন্যদিকে সরেজমিনে খোজ নিয়ে দেখা গেছে, জোরবাড়িয়া মধ্যপাড়া গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী দুলাল মিয়ার ছোট একটি ভাঙ্গা খুপড়ি ঘর রয়েছে। চাষের কোন জমিজমা নেই। মাঝে মধ্যে ভিক্ষাবৃত্তিও করেন। স্ত্রীসহ ৪ সন্তান নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে কোনো মতে দিনপার করেন। খুপড়ি ঘরটিও অন্য ভাইয়ের দেয়া এক শতাংশ জমির ওপর। অভাব অনটনের সংসারে সন্তানরা কেউ স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়নি।

দুলালের মা সুরজান বেগম (৭০) আক্ষেপ করে বলেন, ঘর করার টাকা দেওয়ার বিনিময়ে আমার নাতিকে নিয়েছে। এখন ঘর করে দিচ্ছে না। টাকা পয়সা তাদের (রউফ) কে দিছে কিনা তা আমারা জানি না।

এ ব্যাপারে নবজাকের বাবা দুলাল মিয়া প্রথমে সন্তান বিক্রির কথা অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘থাকার মতো কোন ঘর নাই। সন্তানদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারি না। তাই নতুন একটি ঘর নির্মাণের করে দেওয়ার বিনিময়ে আব্দুর রউফের মাধ্যমে ৪ দিন বয়সের পুত্র সন্তানকে ঢাকায় একজন চাকুরিজীবীকে দিয়ে দিয়েছি। এখন ঘর করে দিচ্ছে না। যে আমাদের সন্তান নিয়েছে তাকে আমরা চিনি না। গত বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর) আমাদের ছবি, ভোটার আইডি কার্ড নিতে চাইছে ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বলেন, আমরা করিনি।’

আব্দুর রউফ বলেন, ‘দুলালের স্ত্রীর সন্তান হওয়ার আগে থেকে তারা তাদের সন্তানকে কোথাও দত্তক দিয়ে দিতে বলেন। আমার ছেলের মাধ্যমে তাদের সন্তানকে দত্তকের ব্যবস্থা করি। পুত্র সন্তান হওয়ার পর তারা ছেলের বিনিময়ে প্রথমে এক লাখ টাকা পরবর্তী ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের সন্তানকে দত্তক দিয়ে দেই। সন্তান যদি তারা ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে নিয়ে এসে তাদেরকে বুঝিয়ে দিব।’

কার কাছে সন্তান দত্তক দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের চিনি না। তবে উনারা আমার ছেলের পরিচিত।’

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লীরা তরফদার বলেন, ‘নিজের সন্তান বিক্রি করা সমাজের জঘন্যতম কাজ। তাদের যদি ঘরের সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে আমাকে জানালে অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করে দিতাম। সন্তান বিক্রির বিষয়টি খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ব্রেকিংনিউজ/এমআর/জেআই

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2