শিরোনাম:

কারমা-অভিশাপের এক অন্যরূপ

তানজিনা আলম
৪ নভেম্বর ২০১৮, রবিবার
প্রকাশিত: 12:30
কারমা-অভিশাপের এক অন্যরূপ

অভিশাপ শব্দটি শোনেননি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়ার জো নেই। ‘অভিশাপ’ বা ‘অমঙ্গল কামনা’ তাই জানা বা বোঝা একটি শব্দ। আর কারমা বলতে সহজ কথায়, কর্মফল।

হিন্দু এবং বৌদ্ধধর্মের আলোচিত একটি শব্দ। যার মোটামুটি একটা বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, আপনি তা-ই পান, যা আগে করেছিলেন। কিংবা যা করছেন, তার ফল ভবিষ্যতে ভোগ করতে যাচ্ছেন। 

কারমা ও অভিশাপের মধ্যে পার্থক্য হলো- অভিশাপ কেবল খারাপ কিছুই হয়, তবে কারমা ভালো ও খারাপ মিলিয়েই চলতে থাকে। ধর্মের প্রেক্ষিতেও কারমার অবস্থান বেশ দৃঢ়-

হিন্দুধর্মের মহাভারতের (১২.২৯১.২২)/অনুশাসন পর্বে, ১৩ তম বইয়ে, বলা হয়েছে- ‘যেমন মানুষ যা রোপণ করে, তা-ই ফসল পায়; একজন মানুষ অন্য জনের ভালো বা খারাপ কাজের ফলের উত্তরাধিকারী হয় না,কর্ম ফল ও ঠিক যার যার নিজের কাজের সমানুপাতিক!

বৌদ্ধধর্মে কারমা এবং কারমাফালা (কর্মফল) প্রধান দুটি বিষয়। বৌদ্ধধর্মে অচিন্তিত সত্য এই বিষয়েই সাবধান করে যে, কারমার ফলাফল চারটি অপরিহার্য বিষয়ের মধ্যে একটি এবং কারমা অচিরেই গৌতম বুদ্ধের পথ থেকে তার অনুসারীদের অন্য পথে, অন্যায় পথে পরিভ্রমণ করায়।

আবার, জৈনধর্মে কারমার ধারণা একটু আলাদা প্রচলিত ধারণার চেয়ে। তবে,মোট কথায় এটা বলা যায় কারমা একটি সার্বজনীন ও স্বপরিচালিত চাক্রিকগঠন শৈলী যা বাইরের কোন সত্তা ছাড়াই নির্ভুল তদারকি করা হয়।

এক কথায়, স্রষ্টার বিচারের আগে মানুষের আত্মা তার নিজের বিচার করে নেয়। তার ভালো ও মন্দ কাজের বিচার নিজেই করতে পছন্দ করে। খুব সহজ একটা উদাহরণ বলি- ধরুন জীবনের কোনো একটা সময় একটা মানুষকে অনেক বেশি ভালোবেসে প্রতারিত হয়েছেন। যে আপনাকে প্রতারিত করলো প্রকৃতি তাকে স্বতস্ফূর্ত ভাবেই কারমায় ফেলে দেয়। ঠিক ওপারের ব্যক্তিটিও এমন ভাবে প্রতারিত হয়,যেভাবে আপনাকে একসময় করেছিল। এতে অবশ্য আপনার কষ্টটা কমবে না। তবে কারমা এটারও হিসেব রাখে এবং কাজ করে যায় ক্লান্তিহীন ভাবে। বিনিময়ে আপনার ভালোবাসার প্রতিদানে পাঠায় অন্য কোনো দেবদূত।

কখনো যদি খুব উচ্ছ্বাস দেখে আপনি আপ্লুত হন, আপনাকে দেখেও তাহলে কখনো কেউ খুব আপ্লুত হয়েছিল। আপনার ভালো থাকার বা ভালোবাসার প্রতিদান কারমা দিবেই ভালো কিছু দিয়ে। তাই আপনার আন্তরিকতা, ভালোবাসা, সত্যবাদিতা কিছুই তাই হেলায় হারাবে না, বৃথা যাবে না।

কিংবা ধরুন, আপনার বিরক্তিকর কোনো বক্তৃতা শুনেও সবাই সিট ছেড়ে উঠে যাচ্ছে না, বুঝবেন কখনো কারো বিরক্তিকর ভাষণ ও অনিচ্ছাসত্ত্বেও শুনেছিলেন।

কাউকে বিপদে ফেলে দিয়েও তাই নিশ্চিত থাকার উপায় নেই, একই সময় হয়ত তৈরি হচ্ছে আপনাকে বিপদে ফেলার নীল নকশা, প্রতিফলন হয় হয়তো তখনই বা পরে।

কারো বালিশ ভেজা কান্নার দোষী কারণ আপনি হলে আপনি বা আপনার প্রিয় কেউ কারো আঘাতে একই ভাবেই কাঁদবে, আপনি প্রত্যক্ষ ভাবে সেই যন্ত্রণার ভাগিদার না হলেও প্রায় অনুরূপ ভাগিদার হবেন আপনার প্রিয় মানুষটিকে বিমর্ষ দেখে।

‘কারমা’ এমন একটি বিষয় যা দুনিয়াতে তার ভালো বা খারাপের প্রতিদান দেয়। যেমনটা এলবার্ট হাবার্ডের ভাষায় বলতে হয়, ‘মানুষকে তাদের পাপের জন্য শাস্তি দেয়া হয় না, নিজেরাই শাস্তি নির্ধারণ করে।’

কারমা বা কর্মফল সবার জন্যই সুনিশ্চিত এবং কখনোই পিছু ছাড়ে না। এ প্রসঙ্গে ওয়েইন ডায়ারের একটি উক্তি বলা যায়, ‘মানুষ কিভাবে আপনার সাথে আচরণ করছে এটা তাদের কারমা, কিন্তু আপনি কিভাবে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন এটা আপনার কারমা!’ সহজ করে বললে, কারমা হলো আত্মার অভিশাপ।

আত্মার খারাপ লাগা, কষ্ট, দুঃখ, ব্যথা, বিরহ প্রত্যেকটি বিষয়ই মূল্যবান। স্রষ্টার বিচারের আগেই প্রকৃতি তার বিচার করবেই এটা সুনিশ্চিত। হয়ত অন্য কারো দ্বারা কিংবা নিজের বিবেক দ্বারা। কোনো ক্ষেত্রেই যন্ত্রণা কম নয়।

আবার কোনো ভালো কাজও হিসেবের বাহিরে না। কারো ন্যূনতম সাহায্য করলে, কারো হাসির কারণ হলে তাও প্রকৃতি ফিরিয়ে দেয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাবেন, পাবলিক বাসে। বৃদ্ধ কিংবা নারীদের সিট ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বুঝবেন। এরা সিট ছেড়ে দেয় ধরে নেয় বৃদ্ধ লোকটি আপনার বাবা বা চাচার বয়সী, নারীটি বোন বা মা। এদের এখানে সাহায্য করলে কোথাও একই ভাবে আপনার বয়স্ক পিতাকেও কেউ সিট ছেড়ে দিচ্ছে ভেবেই। মনের অজান্তেই আমরা এই ভালো কাজগুলো করি, আমাদের সাথেও এই ভালোগুলো ঘটার আশায়। কিংবা, কেউ মাথায় হাত দিয়ে কখনো-কখনো বলেই দেন, স্রষ্টা তোমার ভালো করুক (মানে, তোমারও এমন মঙ্গল বা সাহায্য করুক কেউ!) পরোক্ষভাবে এখানেও কারমা।

অর্থাৎ, যাই করা হোক না কেন, তাৎক্ষণিক বিচার যা-ই হোক, কিন্তু প্রকৃতির বিচারে ফলাফল নির্ভুল! তাই প্রতিশোধে সময় নষ্ট না করে অপেক্ষা করুন। যারা কারণে-অকারণে কষ্ট দিয়েছে, তাদের সময়ের জন্য। ইতিহাস সাক্ষী ‘কারমা’ বিবেচক কর্মফল।

লেখক: 
শিক্ষার্থী
জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ব্রেকিংনিউজ/ এসএ 

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2