শিরোনাম:

আবারো জঙ্গি হামলার টার্গেট চট্টগ্রাম

জীবন মুছা, চট্টগ্রাম
৯ অক্টোবর ২০১৮, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 1:53 আপডেট: 3:06
আবারো জঙ্গি হামলার টার্গেট চট্টগ্রাম

আবারো জঙ্গি হামলার টার্গেট চট্টগ্রাম । এর মধ্যে জঙ্গিদের হিট লিষ্টে রয়েছে চট্টগ্রাম আদালত ভবন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করছে হিজবুত তাহরির ও জেএমবিসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনগুলো। ইতোমধ্যে এসব জঙ্গি সংগঠন তাদের শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করেছে।

জঙ্গি সংগঠনগুলো আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে একই প্ল্যাটফর্মে এসে সম্মিলিতভাবে নাশকতামূলক হামলার পরিকল্পনা করছে । তারা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার সময় সভা সমাবেশে বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের ব্যক্তি, বিদেশি নাগরিক ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের আক্রমণের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সিএমপি হেডকোয়ার্টারে পাঠানো চিঠিতে ভারতীয় একটি পত্রিকার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সক্রিয় অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর সহায়তায় অস্ত্র ও আত্মঘাতী ভেস্ট কেনার বিষয়ে জেএমবি সদস্যরা আলোচনা করেছে। নির্বাচনের আগেই ৩০০ নতুন সদস্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চট্টগ্রামে ২ সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে জেএমবি চেষ্টা চালাচ্ছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় নতুন ৫০টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। এ ছাড়াও জেএমবি ও অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত-ঘেঁষে ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। এসব ঘাঁটিতে পাকিস্তানি লস্কর-ই-তাইয়্যেবার সদস্যরাও অবস্থান করছে বলে ভারতীয় পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর হিযবুত তাহরীরের আঞ্চলিক কমান্ডার তানজিব হোসেন (৩০) র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার এবং ৬ অক্টোবর জেলার মিরসরাই সোনা পাহাড় এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের পর আত্মঘাতি গ্রেনেড বিস্ফোরণে দুই জঙ্গি নিহতের ঘটনায় প্রশাসনের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মিরসরাইয়ে নিহত জঙ্গিদের হামলার প্রধান টার্গেট ছিল চট্টগ্রাম আদালত ভবন।

চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময় র‌্যাব পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া ৮৭ জেএমবি সদস্যের মধ্যে জামিনে মুক্ত থাকা ৫৯ জেএমবি সদস্যের উপর নজরদারি  ও খোঁজ খবর নেয়া শুরু করেছে পুলিশ। জামিনে থাকা এসব জেএমবি সদস্যের ব্যাপারে সঠিক কোনো তথ্য নেই পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে।

সন্ত্রাস দমন আইনে এভাবে নগরীতে বিভিন্ন সময় পুলিশ ও র‌্যাব মোট ৮৭ জন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে। এদের মধ্যে জেএমবির ২৫ জন, হরকতুল জিহাদের (হুজি) ৮ জন, হিজবুত তাহরীরের ৩৩ জন এবং হামজা ব্রিগেডের ২১ জন।

জানা গেছে, এসব জঙ্গিদের ৫৯ জনই জামিনে মুক্তি পেয়ে গেছেন। মুক্তিপ্রাপ্ত জঙ্গি সদস্যদের বর্তমান অবস্থানও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে পরিষ্কার নয়।

হিজবুত তাহরীরের সদস্য তানজীব হোসেন ২০১১ সালে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেফতার হওয়ার পর এক বছরেরও বেশি সময় জেল খেটে জামিনে বের হয়। কিন্তু জেলে থাকলেও তার আচরণে পরিবর্তন আসেনি। উল্টো সাত বছরের মাথায় এখন সে হিজবুত তাহরীরের আঞ্চলিক কমান্ডার। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাকে র‌্যাব সদস্যরা গ্রেফতার করেছে।

এদিকে সংসদ নির্বাচনের সময় জঙ্গি গ্রুপ জেএমবি বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি তারা গোপন বৈঠকও করেছে। ভারতীয় একটি পত্রিকায় সম্প্রতি এ ধরনের সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে সরকার। এ অবস্থায় পলাতক-জামিনে মুক্তি পাওয়া ও কারাবন্দি জঙ্গিদের সাথে দেখা করতে আসা লোকজনকে কঠোর নজরদারিতে আনতে চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনারসহ নয়টি সংস্থার কাছে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

র‌্যাবের পরিচালক (মিডিয়া) মুফতি মাহমুদ খান বলেন, দেশের জঙ্গিবাদেও উত্থান ঠেকাতে র‌্যাব সব সময় প্রস্তুত রয়েছে। জঙ্গিদের সাথে কোনো ধরনের আপোষ করবেনা র‌্যাব। তিনি বলেন, মিরশরাই জঙ্গি আস্তানায় যারা ছিল তাদের মূল টার্গেট ছিল চট্টগ্রাম আদালত ভবন। এ ছাড়া নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং রেলপথ ও তাদের হামলার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। জঙ্গিরা হামলার টার্গেটস্থলে সহজে পৌছার জন্য সম্প্রতি সময়ে বিভিন্ন সড়ক মহাসড়কের পাশেই আস্তানা গড়ছে।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত-উপ কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজমের প্রধান পলাশ কান্তি নাথ বলেন, এ মুহূর্তে নারী জঙ্গি আরজিনাসহ কারাগারে ২৮ জন জঙ্গি আটক আছে। দেড় মাস আগে দুইজন জামিনে বের হয়েছে। এরই মধ্যে সারাদেশে জঙ্গি হামলার শঙ্কা প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ৯টি সংস্থার কাছে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত ২ অক্টোবর পাঠানো চিঠিটি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কাছে গত রবিবার এসে পৌঁছে। এতে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে পরে নতুন করে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে এ ব্যাপারে করণীয় হিসেবে ৯টি সুপারিশ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, জঙ্গি সংগঠনগুলো আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে একই প্ল্যাটফর্মে এসে সম্মিলিতভাবে নাশকতামূলক হামলার পরিকল্পনা করছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তফশিল ঘোষণার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনী বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত থাকার সুযোগে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা চালাবে। আগামী সংসদ নির্বাচনের সময় নিষিদ্ধ জেএমবি প্রাধান্য বিস্তার এবং সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত ও পলাতক জঙ্গিরা তাদের কর্মকাণ্ড জোরদার করার উদ্দেশ্যে নিস্ক্রিয় সদস্যদের সক্রিয় করাসহ অস্ত্র, বিস্ফোরক ও অর্থ সংগ্রহের কাজ চালাচ্ছে বলে জানা যায়।

চিঠিতে দেওয়া ১১টি সুপারিশের মধ্যে রয়েছে : জামিনে মুক্ত আসামিদের নিয়মিত হাজিরার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, জামিনে মুক্ত জঙ্গি ও তাদের পরিবার পরিজনদের ওপর নজরদারি বাড়ানো, মাঠ পর্যায়ে সন্দেহভাজন জঙ্গি কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারি রাখা, সীমান্তবর্তী জেলাসমূহে সীমান্ত টহলে বিজিবির তৎপরতা আরো বাড়ানো, জঙ্গি হামলার শঙ্কায় থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদার করা ইত্যাদি। এ ছাড়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, জঙ্গি মতাদর্শের বিপরীতে প্রচারণা চালানো এবং অনলাইনে জঙ্গিবাদ প্রচারের বিরুদ্ধেও উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। জেলখানায় আটক জঙ্গিদের আত্মীয় ও অন্যদের মাধ্যমে যাতে তথ্য আদান-প্রদান করতে না পারে সেজন্য জেল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

জানা যায়, কারাগারে আটক জেএমবির সাইদুর রহমান ও জসিম উদ্দিন রহমানির অনুসারীরা নির্বাচনী কার্যক্রম চলাকালে দেশের ৫০টি স্থানে নাশকতার পরিকল্পনা করে। নির্বাচনের আগেই তিনশ নতুন সদস্য সংগ্রহেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি জানার পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এমন চিঠি দেওয়া হলো। জেএমবির এই অংশের অনুসারী যারা জেলের বাইরে আছে, তারা র‌্যাব-পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়েছে। ফলে তা প্রশাসনের জন্য শঙ্কার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

অতীতে দেখা গেছে, জেএমবি নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মইজ্যারটেক এলাকায় নিজেদের সদস্যদের স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল। সেখানে জেএমবির সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে লাগোয়া এলাকাগুলোতেও ইতিপূর্বে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ধ্বংস করেছে।

ব্রেকিংনিউজ/জেএম/এনএসএন

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2