শিরোনাম:

রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসন

এমপি ডিউকের পরিবারেই জাপা-আ.লীগের তিন সম্ভাব্য প্রার্থী

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, রংপুর
৪ অক্টোবর ২০১৮, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: 6:40 আপডেট: 6:44
এমপি ডিউকের পরিবারেই জাপা-আ.লীগের তিন সম্ভাব্য প্রার্থী

রংপুর বিভাগীয় শহর থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরে একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে বদরগঞ্জ উপজেলার অবস্থান। ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই উপজেলার প্রাচীন নাম ছিলো কুমরগঞ্জ। একসময় এখানে কুমার কামার ও জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করতো। কুমার গোষ্ঠির কারণে কুমারগঞ্জ নামকরণ হয়েছিলো যা বিট্রিশ আমল পর্যন্ত বলবৎ ছিলো। পরবর্তীতে  বিখ্যাত ইসলাম ধর্ম প্রচারক, আধ্যাত্বিক সুফি সাধক দরবেশ শাহ বদর (রঃ) এই এলাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসেন। পরে তার নাম অনুসারে বদরগঞ্জ উপজেলার নাম করণ হয়েছে। এই উপজেলা দিয়ে করতোয়া, চিকলী ও যমুনেশ্বরী নদী বয়ে গেছে। এটি এক সময় অন্যতম ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র ছিলো। 

অন্যদিকে রংপুর বিভাগীয় শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে তারাগঞ্জ উপজেলার অবস্থান। ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলাটি রংপুরের সবচেয়ে ছোট উপজেলা। তারাবিবি নামে এক পুণ্যবতী মহিলা এখানে বসবাস করতেন। তিনি মারা যাবার পরেই তাকে সেখানে কবর দেয়া হয়। তার কবরকে কেন্দ্র করে তারাগঞ্জ হাট বাজার গড়ে উঠে। পরবর্তীতে তারাবিবির নাম অনুসারে তারাগঞ্জ উপজেলার নামকরণ করা হয়েছে। এই উপজেলাটিও ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। এই উপজেলাটির উপর দিয়ে চিকলী নদী প্রবাহিত হয়েছে।
বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর-২ আসন।  এবার বর্তমান সাংসদ আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরী ডিউকদের পারিবারিক লড়াই দেখা যেতে পারে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে প্রধান তিনজনই এই পরিবারের। মনোনয়ন কিংবা নির্বাচনে তারা কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ বলে এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে। পারিবারিক এই দ্বন্দ্বের সুযোগ কাজে লাগাতে চায় দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি। এই আসনটি এ যাবত কখনো টানা আওয়ামী লীগের আবার কখনো জাতীয় পার্টির ঘরে ছিল। আসনটির বর্তমান এমপি বদরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডিউক এবারও নৌকা প্রতীকের নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন চাইবেন।

নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য দলের মনোনয়ন চাইবেন তার চাচাতো ভাই, সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী আনিছুল হক চৌধুরীর ছেলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আহসানুল হক চৌধুরী টুটুলও।
অন্যদিকে, ডিউকের চাচা জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য, বদরগঞ্জ উপজেলা জাপার সভাপতি বখশীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামান চৌধুরী সাবলুকে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ইতিমধ্যে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

দুই ভাই আর চাচা নিজেদের কর্মী-সমর্থক নিয়ে  নির্বাচনী মাঠে আগাম কাজ করছেন। সব মিলে আওয়ামী লীগ ও জাপার আধা ডজন সম্ভাব্য প্রার্থী এখন মাঠে আছেন। এ নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা রয়েছেন বিপাকে। তারা কার পক্ষে কাজ করবেন সে নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে রংপুর-২ আসনটি দখলে ছিল আওয়ামী লীগের। এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা প্রয়াত আনিছুল হক চৌধুরী পাঁচবার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ের পর যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর আগে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর রংপুরের মানুষের আবেগ আর ভালোবাসা পুঁজি করে জেলে থাকা অবস্থায় ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হন জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পরে তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে এমপি হন অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী। বর্তমানে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ওই সময় থেকে বৃহত্তর রংপুরের আসনগুলো এরশাদের দূর্গে পরিণত হয়। তার পর ২০০১ সালে জাতীয় পার্টির  মোহাম্মদ আলী সরকার ও ২০০৮ সালে শিল্পপতি আনিছুল হক চৌধুরী নির্বাচিত হন। পর পর দুবার জাপার দখলে থাকে রংপুর-২ আসনটি। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে আসনটি আবার দখলে নেয় আওয়ামী লীগ।

অন্য প্রধান দল বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে কাজ করছেন ৫জন সম্ভাব্য প্রার্থী- বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি পরিতোষ চক্রবর্তী, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী সরকার ও হাইকোর্টের আইনজীবী গোলাম রসুল বকুল, রংপুর মহানগর যুবদলের সভাপতি এ্যাড. মাহফুজ উন নবী ডন, বদরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সাইদুল ইসলাম।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের দাবি, রংপুরের বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জে এখন আর এরশাদের সেই জৌলুশ নেই। এটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরাও তাতে চাঙ্গা। তাছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে  ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে।

এ অবস্থায় আবার দলের মনোনয়ন ও নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার আশা পোষণ করছেন বর্তমান সাংসদ আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক। তার দাবি, তিনি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমে দলের মধ্যে যত দ্বন্দ্ব ছিল সব মিটিয়ে দলকে সংগঠিত করেছেন। দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সব নেতাকর্মী তার সঙ্গে আছেন। অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে উন্নয়ন কাজ করেছেন তিনি।

বেশির ভাগ সময় তিনি এলাকায় থাকেন জানিয়ে ডিউক চৌধুরী বলেন, প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় যান জনসংযোগে। সাধারণ মানুষের জন্য তার ঘরের দরজা খোলা সব সময়। তাই তার বিশ্বাস, ‘আগামী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি আমাকে মনোনয়ন দেন তবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করব।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হক চৌধুরী টুটুলও নিজের পক্ষে একই আশা পোষণ করেন। পাঁচবারের বিজয়ী বাবা সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী আনিছুল হক চৌধুরীর উত্তরাধিকার হিসেবে তার পক্ষে একটা বিশেষ সুবিধা কাজ করবে বলেও মনে করেন তিনি। 

তিনি বলেন, ‘তার (বাবা) উত্তসূরি হিসেবে আমিও সারা জীবন মানুষের সেবা করে যেতে চাই। এলাকার মানুষের বিপদে আপদে সব সময় জনগণ আমাকে কাছে পায়, তাই তারা আমাকে আগামী নির্বাচন এমপি হিসেবে দেখতে চায়।’ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইতিমধ্যে প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দল আমাকে মনোনয়ন দিলে নৌকা প্রতীকে নিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করতে পারব।’

আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক বদরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান বিশ্বনাথ সরকার বিটু ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও সাবেক রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য ড. শাহ নওয়াজ আলি। তবে বিটুর বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক রয়েছে। তিনি ব্যানার-ফেষ্টুন দিয়ে শুভ্চ্ছো জানানোর পাশাপাশি নিয়মিত এলাকায় গণসংযোগ করছেন।

আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য দুই প্রার্থী ডিউক চৌধুরী ও টুটুল চৌধুরীর চাচা আসাদুজ্জামান চৌধুরী সাবলু জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী। তার মতে, রংপুর হলো জাপার দূর্গ। এখানে অন্য দলের কোনো স্থান নেই। তিনি বলেন, ‘আমি নেতাকর্মীদের নিয়ে রাতদিন কাজ করে যাচ্ছি। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আমি বিজয়ী হব।’

জাপা থেকে সাবলুর মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়ে গেলেও দলের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচন করবেন বলে নাম শোনা যাচ্ছে জাপার সাবেক এমপি আনিছুল ইসলাম মন্ডলের। আমেরিকা থেকে এসে তিনি ২০০৮ সালে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জাপা থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এছাড়াও জেলা জাপার সদস্য এ্যাড. মোকাম্মেল হক চৌধুরীর নাম। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে  দলীয় ও সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত। বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলায় তার বিশাল কর্মী বাহিনীও রয়েছে।

যদিও রংপুরের কোনো আসনে বিএনপি কখনো জয়লাভ করেনি, কিন্তু এবার দুই সাবেক এমপি রংপুর-২ আসনে দলটির মনোনয়ন পেতে মাঠে নেমেছেন। দুজনই জাপার সাবেক নেতা।

সাবেক এমপি অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী এবার নির্বাচন করবেন বলে কাজ শুরু করে দিয়েছেন বেশ আগে। তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আমি জয়লাভ করব। কারণ মানুষ বর্তমান সরকারকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না।’

একসময়ের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী সরকারও বর্তমানে বিএনপি থেকে নির্বাচন করবেন বলে কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়াও রংপুর মহানগর যুবদল সভাপতি এ্যাড. মাহফুজ উন নবী ডন, হাইকোর্টের আইনজীবী বদরগঞ্জের তরুণ নেতা গোলাম রসুল বকুলের প্রার্থীর হওয়া নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে গুঞ্জন। 

ব্রেকিংনিউজ/এসআর/জেআই

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2