শিরোনাম:

ড. কামাল-বি. চৌধুরীর ‘প্রলয়ের স্বপ্ন’

আনিস আলমগীর
২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 8:07
ড. কামাল-বি. চৌধুরীর ‘প্রলয়ের স্বপ্ন’

গত ক’দিন ধরে সারা দেশে প্রচার করে গুলিস্তানের নাট্যমঞ্চে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে নাগরিক সমাবেশ  ‘প্রলয়ের স্বপ্ন’ নিয়ে যে আয়োজন করেছিলেন, অবশেষে গত ২২ সেপ্টেম্বর ড. কামাল, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নারা সেই সমাবেশ করলেন। এতদিন বিএনপির সঙ্গে যেসব কুশীলবের তলে তলে সম্পর্ক ছিল, শনিবার তাও প্রকাশ্য হলো।

বিএনপির কুশীলবেরাও নাট্যমঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। বয়ানের প্রতিযোগিতা চলেছিলো। বয়ানের স্বর ও সুর এক। শেখ হাসিনাকে নির্বাচনের পূর্বে পদত্যাগ করতে হবে। সংসদ ভাঙতে হবে, সামরিক বাহিনীর হাতে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করে নির্বাচনের দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। আর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বললেন যে খালেদা জিয়ার মুক্তি দিতে হবে। এসব না হলে তারা প্রলয়ের হুমকিও দিলেন।

নাট্যমঞ্চের ভেতরে দেড় হাজার আর বাইরে হাজার দুয়েক লোক উপস্থিত ছিলেন। এই মহাসমাবেশ থেকে তারা যে প্রলয়ের হুঙ্কার ছড়ালেন সেটি সারা দেশে আলোড়ন দূরে থাক, সমাবেশ থেকে ফেরা লোকদের চোখে-মুখে আমি দেখিনি। বিএনপির এক কুশীলব কয়দিন আগে বলেছিলেন শেখ হাসিনাকে সরাতে আর এক মুক্তিযুদ্ধের মতো যুদ্ধ করতে হবে, না হয় শেখ হাসিনার শেষ নেই। নাট্যমঞ্চের আয়োজন দেখেও তা-ই মনে হলো। এই সমাবেশ দিয়ে, এতো সহজে শেখ হাসিনাকে হটানো সহজ নয়। হটাতে হলে বিএনপি এবং ঐক্য প্রক্রিয়াকে যুদ্ধে নামতে হবে।

ড. কামাল হোসেন, ডা. বি. চৌধুরী, রব আর মান্নারা আসলে নিজ নিজ দল থেকে বিতাড়িত ব্যক্তি।

কিন্তু বিএনপির মতিভ্রম হলো কেন বুঝি না! নিজ নিজ দল থেকে বিতাড়িত হওয়া ড. কামাল- বি. চৌধুরীদের কাছে বিএনপি নিজের ইজ্জত সম্মান সব সঁপে দিল কেন! ড. কামাল, বি. চৌধুরী, আ  স ম রব আর মান্নারা তো কেউ নিজ নিজ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসার ক্ষমতা রাখেন না এখন। তাই বলে আমি বলছি না যে ড. কামাল বা বি. চৌধুরী নির্বাচিত হতে না পারলে জাতির কাছে অজ্ঞাত কেউ হয়ে যাবেন। নিজের আঙিনায় তারাও উজ্জ্বল কিন্তু সময় ও কাজ তাদের পক্ষে না।

বার্ট্রান্ড রাসেল দার্শনিক হিসেবে দুনিয়া জোড়া খ্যাতিমান ছিলেন। তিনি সাতবার ব্রিটিশ লেবার পার্টির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আর প্রতিবারই পরাজিত হয়েছিলেন। পরে তিনি তার কেন্দ্রের ঘরে ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন– তোমরা আমাকে ভোট দাও না কেন? ভোটারেরা উত্তরে বলেছিলো, আপনি পণ্ডিত মানুষ রাজনীতিতে আসলেন কেন- আপনার কাজ তো এটা না। আপনার কাজ জাতিকে পরামর্শ দেওয়া।

ড. কামাল আইনের পরামর্শক আর  বি. চৌধুরী চিকিৎসার পরামর্শক। এখন তো তারা উভয়ে জীবনের শেষ পর্যায়ে আছেন। লাঠির সাহায্য নিয়ে চলতে হচ্ছে তাদের। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পাগল হওয়া তাদের তো সাজে না। অনেকে বলবেন মাহাথির মোহাম্মদের কথা। নিজ দল ছেড়ে ক্ষুদ্র একটি দলের নেতা হয়ে একসময়ের সঙ্গী এবং পরবর্তীতে প্রতিপক্ষ আনোয়ার ইব্রাহিমের দলকে মাহাথির তো একইভাবে ক্ষমতা এনে দিয়েছেন। বা আনোয়ারের দল মাহাথিরের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় এসেছে।

কিন্তু বাংলাদেশে কি ড. কামাল বা বি. চৌধুরী মাহাথিরের ইমেজ ধারণ করেন? মাহাথির দলের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছেন, কামাল-বি চৌধুরীরা তার আশপাশে নেই। বরং শেখ হাসিনাকে এখন বাংলাদেশের মাহাথির ভাবতে শুরু করেছে মানুষ। জাতীয় ঐক্যে প্রক্রিয়ার নেতারা ক্ষমতায় যাওয়ার বা শেখ হাসিনাকে হটানোর ক্ষমতা রাখেন না। ড. কামাল- বি চৌধুরী মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি যে দলিলমূলে নির্ধারিত হয়েছে তার কপি আনার চেষ্টা করছেন, যেন ক্ষমতায় গেলে কেউ সহজে বঙ্গভবন থেকে দ্বিতীয়বার বিতাড়িত করতে না পারেন। কিন্তু সবই বৃথা।

বি. চৌধুরী তো শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে সোজাসাপটা বলেই ফেলেছেন– তোমার দশ বছর হয়ে গেছে আর কতদিন থাকতে চাও? এখন চলে যাও। কিন্তু মুখে বলছেন তারা সংগ্রাম করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ক্ষমতার জন্য নয়। মহান গণতন্ত্রের প্রেমে পড়ে। কামালের মুখেও তেমন কথা।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর থেকে কিছু লোক খাঁটি ও অভ্রান্ত গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে আসছেন কিন্তু কখনও সফল হননি। গত ৭১ বছরব্যাপী তারা সংগ্রাম করছেন। আইয়ুব খান যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। আবার এরশাদ যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন হাসিনা-খালেদা গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। খালেদা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। আর এখন যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় তখন ড. কামাল হোসেন, বি. চৌধুরী আর ফখরুল সাহেবরা মহান গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছেন। এ জাতির দুর্ভাগ্য যে গত ৭১ বছরের মাঝে খাঁটি ও অভ্রান্ত গণতন্ত্র কী তা তারা চোখে দেখেনি।

আমার বয়সে আমি তো দেখিনি। আমার মরহুম পিতা দেখেছিলেন কিনা তার মুখে তাও কখনও শুনেনি। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের জন্য নেতারা পাগল হয়ে যান নির্বাচন এলে। গণতন্ত্রের কথা বলে জোট বাঁধেন। নির্বাচনটা হয়ে গেলে গণতন্ত্রের আওয়াজ পাঁচ বছরের জন্য তিমিরের চলে যায়। চর্চাও বাধাগ্রস্ত হয় তাদের দ্বারা।

আমাদের দেশে গণতন্ত্র মানে নির্বাচনে ভোট দেওয়া। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আজ  প্রায় ৩৬/৩৭ বছর। খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন ৩৪/৩৫ বছর। এরশাদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ৩২/৩৩ বছর। ড. কামাল হোসেন গণফোরামের সভাপতি ২৭/২৮ বছর। ড. বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরী বিকল্পধারার চেয়ারম্যান আছেন ১৬/১৭ বছর। কোনও পরিবর্তন নেই। তারা একক রাজ্যের একেক রাজা। আমাদের দেশে গণতন্ত্র সত্যি সত্যি একেবারে জুটা না হলেও প্রতিবন্ধী। আমেরিকায় দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্যও ভোটের সম্মুখীন হতে হয়। আমাদের দেশের মতো মনোনয়ন বাণিজ্য নেই আমেরিকায়।

গত ২২ সেপ্টেম্বর মহানগর নাট্যমঞ্চে যারা গণতন্ত্রের জন্য কান্নাকাটি করলেন সবই লোক দেখানো। জনগণের জন্য এখানে প্রেম নেই। শেখ হাসিনা যখন ১৯৯৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন তখন দীর্ঘস্থায়ী এক বন্যা হয়েছিল এ কথা নিশ্চয়ই পাঠকদের স্মরণে আছে। উত্তরবঙ্গে ৪৩ দিন স্থায়ী বন্যায় বসবাসের ঘর পর্যন্ত পচে গিয়েছিল। তখন এই ড. কামাল এবং বি. চৌধুরী বিদেশিদের সাহায্য না দেওয়ার প্রকাশ্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। অজুহাত হিসেবে বলেছিলেন আওয়ামী লীগ সব সাহায্য আত্মসাৎ করে ফেলবে। ধন্যবাদ যে শেখ হাসিনার সরকার বিদেশি সাহায্যের জন্য আবেদনও জানাননি। অবশ্য স্ব-ইচ্ছায় যে বিদেশিরা সাহায্য পাঠাননি তাও নয়। ড. কামাল এবং ডা. বি. চৌধুরী বিদেশিদের মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরা লোক হিসেবে বড় নির্মম।

ড. কামাল, বি. চৌধুরী, আ স ম রব, মান্নারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সফল লোক। ব্যক্তিগত জীবনে জৌলুসে ভরপুর। কিন্তু একটা কথা নির্মম হলেও বলতে হয়, তারা রাজনীতিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। অসংখ্য ন্যাপ নেতা ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতা পাওয়ার পরও ড. কামাল গণফোরামকে সফল রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে পারেননি। বি. চৌধুরী এবং কর্নেল অলিরা হচ্ছেন বিএনপির ঘরে জন্ম নেওয়া নেতা। তারা বিএনপি ত্যাগ করে নিজে নিজে দল গঠন করেছিলেন আবার একসময়ে উভয়ে একত্রিত হয়ে একদল গঠন করেছিলেন। উভয়ে ক’দিন একত্রে কাজও করেছিলেন। দলটার সম্ভাবনা যে ছিল না তাও নয়। তবু উভয়ে একত্রে থাকতেও পারেননি। পুনরায় স্ব-স্ব দল নিয়ে পৃথক হয়ে ব্যর্থতার গর্ভে নিমজ্জিত হলেন।

এখন ড. কামাল, ডা. বি. চৌধুরী, আ স ম  রব আর মান্নারা একত্রিত হয়েছেন। সমুদ্রে পড়ে গেলে খড়কুড়ো দেখলেও ভেলা মনে করে তাকে অবলম্বন করে বাঁচতে চায়। বিএনপি ব্যর্থ এই রাজনীতিবিদদের ভেলা মনে করেছে। তাদের নেত্রী খালেদা জিয়া জেলে, তার ছেলে তারেক রহমান লন্ডনে পলাতক। আগামী ১০ অক্টোবর ২০১৮ রায় হবে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার। প্রসিকিউশন আসামিদের চূড়ান্ত দণ্ড চেয়েছেন। তারেকসহ বিএনপির বহু লোক আসামি। সুতরাং মামলাটার রায় নিয়ে বিএনপি খুবই উদ্বিগ্ন।

বিএনপি যে অসহায়ত্ব কাটানোর জন্য এই ব্যর্থ রাজনীতিবিদ ড. কামাল আর ডা. বি. চৌধুরীর কাছে নিজেদের সমর্পণ করলেন, তাতে লাভের লাভ কিছু হবে বলে তো মনে হয় না। শেষ পর্যন্ত বিএনপি রাজনীতিতে তার নিজস্ব যে কৌলিন্য ছিল সম্ভবত তাও হারালো। যাক, পোলারাইজেশনে দেশে রাজনীতি দুইভাগে বিভক্ত হলো। নাট্যমঞ্চে শুরু হওয়া নাটকের শেষ দৃশ্য দেখার এখনও বাকি আছে। [লিখা: সংগৃহিত]

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2