শিরোনাম:

সাব্বির জাদিদ-এর ‘প্রেমের জীবনচক্র’

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
২৫ আগস্ট ২০১৮, শনিবার
প্রকাশিত: 9:45
সাব্বির জাদিদ-এর ‘প্রেমের জীবনচক্র’<br />

নয়ন ও লাইজু পর্ব:
সিঁড়ির মুখে দেখা। কলেজের ইউনিফর্ম গায়ে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামছিল মেয়েটা। নয়ন দোকান থেকে ফিরছিল। হাতে লবণের প্যাকেট। গতকাল বাজারে লবণ কিনতে ভুলে গিয়েছিল বাবা। আজ সকালে ছেলেকে লবণ কিনতে দোকানে পাঠিয়েছিলেন মা। কেনার সময় ডেট দেখতে মনে নেই। এখন, প্যাকেটটা উল্টেপাল্টে মেয়াদ শেষের তারিখটা খুঁজছিল সে, বাসায় ঢোকার সময়। হঠাৎই সিঁড়ির সরু রাস্তাটা সুবাসিত হয়ে উঠল। বেলি ফুলের ঘ্রাণ। যেন আস্ত একটা বেলির ঝাড় এই কংক্রিট ঘেরা গলির ভেতর এসে পড়েছে। অবাক নয়ন লবণের প্যাকেট থেকে চোখ তুলল। তখনই চোখাচোখি হলো মেয়েটার। সদ্য প্রসব হওয়া বকনা বাছুরের মতো টানা টানা চোখ। কাজল পরেছে। পানপাতার মতো সামান্য লম্বাটে মুখ। যেমনটা নয়নের পছন্দ। নাকের নিচে বিন্দু বিন্দু ঘাম। যেন ঘাসের ডগায় রুপালি শিশির। কয়েক সেকেন্ডের দেখা। অথচ ওই অল্প সময়ের মধ্যেই নয়নের মনে হলো–যদি ঘামের ফোঁটাগুলো মুছে দেয়া যেত!

বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটে না নয়নের। অপ্সরীর মতো এই মেয়েটা কোথা থেকে টুপ করে ঝরে পড়ল তার সামনে! ইউনিফর্ম দেখে বোঝাই যাচ্ছে, সরকারি কলেজে পড়ে। কিন্তু এই বাসায় কবে থেকে? বাসাটা নয়নদের নিজস্ব। নিচতলায় বাবা-মা আর ছোট একটা ভাইকে নিয়ে নয়নরা থাকে। উপরতলা ভাড়া খাটে। গেল মাসে অনেক দিনের পুরনো ভাড়াটিয়া বাসা ছেড়ে চলে গেছে। টাঙ্গাইলের ওইদিকে না কোথায় যেন আঙ্গেল বদলি হয়েছে। শহরের ধারেই নয়নদের এই বাসা। সুযোগ সুবিধা প্রচুর। পুরনোর বিদায়ের সাথে সাথে তাই নতুন ভাড়াটিয়া বাসা বেঁধেছে। একটা মাসও বিশ্রামের সুযোগ পায়নি ব্যস্ত বাসাটা। বেলি ফুলের সেন্ট মাখা এই মেয়ে তাহলে নতুন ভাড়াটিয়ার কন্যা। নয়নের বুকের ভেতর টুপটুপ করে উত্তেজনার বৃষ্টি পড়তে লাগল। সেই সকালে, খালি পেটে, লবণের প্যাকেট হাতে প্রর্থনায় মগ্ন হলো নয়ন–আল্লাহ, কখনোই যেন নতুন আঙ্কেলের বদলির আদেশ না আসে। তার রিটায়ার্ড, মৃত্যু, দাফন-কাফন এমনকি হাশর-নাশরও যেন এই শহরেই হয়।

কিচেনে মায়ের পাশে ঘুরঘুর করতে লাগল নয়ন। মতলব: নতুন ভাড়াটিয়ার খোঁজ খবর জেনে নেয়া। নয়ন বলল, মা, নতুন ভাড়াটিয়া ভালো হবে তো? এদের অল্প বয়সী বাচ্চাকাচ্চা নেই তো আবার? বাচ্চারা মাথার উপর ধুপধাপ করে লাফাবে না তো?
মা আশ্বস্ত করলেন–লাফানোর মতো কেউ নেই। ওদের দুটো ছেলেমেয়ে। মেয়েটা বড়। কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। ছেলেটা ছোট। নাইনে। এই বয়সের ছেলেমেয়ে বাঁদরের মতো লাফায় না।

মায়ের তথ্যে বড় খুশি হয়ে উঠল নয়ন। সে এবার সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছে। মেয়েটা তার এক বছরের জুনিয়র। ভাগ্যিস সে এক বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিল। দ্রুত খেয়েদেয়ে রেডি হলো নয়ন। প্রিয় বাইসাইকলেটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কলেজে। নব্বইয়ের দশকের মফস্বল শহর। গ্রামের মতো চেহারা সুরত। ফাঁকা ফাঁকা। গাছপালা বেশি। মানুষ কম। হঠাৎ হঠাৎ খাকি পোশাকের ডাকপিয়ন সামনে এসে পড়ে।

ফাঁকা রাস্তায় নয়ন খুব দ্রুত সাইকেল চালায়। ক্লাশ ধরার তাড়া নেই। তবু এই দ্রুততার কারণ বেলি ফুলের সন্ধান নেয়া। কলেজে গিয়েই সে বেলি ফুলকে পেয়ে যায়। কিন্তু কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায় না। বেলি ফুল সারাক্ষণ একগুচ্ছ বান্ধবী-বেষ্টিত হয়ে থাকে। এতে নয়ন বিরক্ত হয় না মোটেও। কারণ, দিনশেষে মেয়েটার গন্তব্য নয়নদেরই বাসা।

ফেরার পথে কথা বলার সুযোগ মেলে। বলবার মতো অনেক কিছু সাজিয়ে রেখেছিল নয়ন। সেসব কথা বলতে পারলে পথ ফুরিয়ে যেত, গল্প ফুরাতো না। কিন্তু মেয়েটার মুখোমুখি হয়ে সব গুলিয়ে যায় নয়নের। এমনকি মেয়েটার নাম জিজ্ঞেস করার কথাও মনে থাকে না। সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে হাঁটতে হাঁটতে নয়ন কেবল বলতে পারে–সকালে আপনাকে দেখলাম, খুব তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলেন। আমি লবণ কিনতে গেছিলাম। ওই বাসাটা আমাদের। অগোছাল কথা।

মেয়েটা একটু অবাক গলায় বলে, ও, তাই নাকি!
নয়ন ভাবনায় পড়ে যায়–ঠিক কোন কথার উত্তরে মেয়েটা ‘ও তাই নাকি’ বলল! ভাবতে ভাবতে বাসার গলি দেখা এসে গেল।
বাসায় ঢোকার আগে মেয়েটা বলে, আপনি কি আমাদের কলেজেই পড়েন?
হ্যাঁ। সেকেন্ড ইয়ার।
আপনার ইউনিফর্ম কই?
নয়ন জিভ কাটে–মনেই তো নেই!
বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিজের উপর খুব রাগ হয় নয়নের। সে যে একটা বোকা এবং ভীতু, কোনোই সন্দেহ থাকে না। ভাত খেয়ে সে নতুন করে মেয়ে পটানোর গল্প সাজাতে বসে।
পরের দিন কলেজে যাওয়ার পথে জানা যায়, মেয়েটার নাম লাইজু। সে এই শহরেই বড় হয়েছে। আগে অন্য বাসায় ছিল। নয়নদের বাসাটা বড় এবং এখান থেকে কলেজ কাছে, পায়ে হেঁটে যাওয়া যায় বলে ওরা এই বাসায় উঠেছে। নয়ন আশ্বস্ত হয়। মেয়েটাকে তাহলে হারিয়ে ফেলার ভয় নেই। নয়ন মসজিদে দুই টাকা দান করার নিয়ত করে।
তৃতীয় দিন নয়ন জানায়, লাইজু যে সেন্ট মেখে কলেজে যায়, তা ভারি মিষ্টি। গন্ধটা নাকে আসলেই বেলি ফুলের কথা মনে পড়ে যায়। জবাবে লাইজু কেবল কাচের চুড়ির মতো খিলখিল করে হাসে।
তৃতীয় সপ্তায় নয়ন একটা সাহসের কাজ করে ফেলে। লাইজু যেহেতু তার জুনিয়র, সে লাইজুকে তুমি সম্বোধনে ডাকে–তোমার চোখটা ভারি সুন্দর। বকনা বাছুরের মতো টানা টানা। এইদিনও লাইজু হাসে। কাচের গ্লাসে শরবত গুলালে যেমন শব্দ হয়, তেমন শব্দের হাসি।

পরিচয়ের তিন মাসের মাথায় নয়ন দুর্ধ্বর্ষ সাহসের কাজটা করে–তোমাকে আমার ভালো লাগে লাইজু। সব সময় তোমার কথা মনে পড়ে। আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তোমাকে না পেলে আমার জীবন বৃথা হয়ে যাবে।
কাঁপা গলায়, খুব আবেগ নিয়ে কথাটা বলে নয়ন। কিন্তু নয়নের আবেগ বিন্দুমাত্র স্পর্শ করে না লাইজুকে। সে নিরাবেগ গলায়, স্পষ্টভাবে বলে, আপনার এই প্রস্তাব আমি গ্রহণ করতে পারছি না নয়ন ভাই। কিছু মনে করবেন না।

লাইজু ও শফিক পর্ব:
বাবা-মা আর ছোট ভাই ঘুমিয়ে গেছে। ঘুমিয়ে গেছে পুরো শহর। ঘড়ি বলছে রাত সাড়ে বারোটা বাজে। কেবল জেগে আছে লাইজু। টেবিলে বসে ডাইরির পাতায় সে খুব যত্ন করে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করছে। দু-চার লাইন লিখছে, লেখা পছন্দ হচ্ছে না, ডাইরির পাতা ছিঁড়ে দুমড়োমুচড়ো করে পায়ের কাছে ফেলছে। ধীরে ধীরে নষ্ট কাগজের স্তূপ তৈরি হচ্ছে। লাইজু বুঝতে পারছে, আবেগে তার বুক যমুনা নদী হয়ে আছে, কিন্তু সেই আবেগ অক্ষরে রূপ দেয়ার মতো পর্যাপ্ত ভাষা তার দখলে নেই। তেরো বারের চেষ্টায় সে মন্দের ভালো একটা প্রেমের চিঠি শেষ করতে পারে। রাত তখন তিনটা সাত। সে দ্রুত নষ্ট কাগজগুলো ছিঁড়ে বাইরে ফেলে দেয় আর চিঠিটায় সুন্দর দুটো ভাঁজ দিয়ে গোপন জায়গায় রাখে। সকালে কলেজ আছে। সে লাইট অফ করে ঘুমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু চোখে ঘুম নেই। চোখের উপর ভাসছে শফিক স্যারের মুখ।

লাইজু ইংরেজিতে কাঁচা। শফিক স্যারের কাছে সে এবং আরো কয়েকটা ছেলেমেয়ে ইংলিশ প্রাইভেট পড়ে। শফিক স্যার সদ্য ইংরেজিতে মাস্টার্স। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য সে কিছুদিন হলো প্রাইভেট পড়াচ্ছে। চারকি হয়ে গেলেই ঢুকে পড়বে। শফিক স্যার ক্রমেই হাত ফসকে যাচ্ছে লাইজুর। তার কেবলই মনে হচ্ছে, শফিক স্যারকে মিতা দখল করে নিচ্ছে।

শফিক স্যার এমন একজন মানুষ, প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়েছিল লাইজু। শফিক স্যারের জন্যই নয়নের জায়গা হয়নি লাইজুর বুকে। তারপর দিন যত গেছে, মুগ্ধতা বেড়েছে। শফিক স্যারের কথা বলার ভঙ্গি, পড়ানোর স্টাইল, জীবনবোধ, চেহারা–সবকিছুই আকৃষ্ট করতে থাকে লাইজুকে। এবং এক সময় সে বুঝতে পারে, শফিকের প্রেমে সে হাবুডুবু খাচ্ছে। আথচ শফিকের কোনো নজরই নেই লাইজুর প্রতি। লাইজুর ব্যাপারে সে পুরোপুরি উদাসীন। এই উদাসীনতা অসহ্য লাগে লাইজুর। আবার আগ বাড়িয়ে সে যে শফিককে মনের কথা বলবে, তাও সম্ভব হয় না। নারী-সুলভ সংকোচ বেড়ি হয়ে তার পা পেঁচিয়ে ধরে। আবার না বলে থাকাও যাচ্ছে না। শফিক স্যার দিন দিন মিতার প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। এখনই যদি স্যারের মন ঘুরিয়ে আনা না যায়, স্যার পুরোপুরি বেদখল হয়ে যাবে। মুখে বলতে পারবে না ঠিক, কিন্তু চিঠি লিখে তো মনের কথা বলা যায়। রাত জেগে লাইজু সেই চিঠিটাই লিখেছে।

পরদিন প্রাইভেটে গিয়ে খুব কায়দা করে স্যারের একটা বইয়ের ফাঁকে চিঠিটা গুঁজে দিল লাইজু। তারপর উৎকণ্ঠার অপেক্ষা। চিঠি গোঁজার পরের দিন প্রাইভেট শেষে শফিক স্যার লাইজুকে বসতে বলল। আশা এবং ভয়ের মাঝে দুলতে দুলতে শফিকের সামনে বসে রইল লাইজু। লাইজু যেমন নিরাবেগ গলায় নয়নকে ফিরিয়ে দিয়েছিল কিছুদিন আগে, সেই একই রকম ভাষায় লাইজুকে ফিরিয়ে দিল শফিক স্যার। লাইজু গোপনে চোখ মুছতে মুছতে বাসায় ফিরে এল।

শফিক ও নাজমা পর্ব:
লাইজুর মতো নাজমাও শফিকের কাছে প্রাইভেট পড়ে। তবে ব্যাচ ভিন্ন। সম্পর্কে শফিক আর নাজমা খালাতো ভাইবোন। শহরের দুই প্রান্তে দুইজনের বাসা। শুনতে দুই প্রান্ত অনেক দূরের মনে হলেও আদতে তা খুবই কাছে। ছোট শহর বলে কথা। দোতলার ছাদে উঠে শহরের এপাশ থেকে ওপাশ দেখা যায়।

নাজমা যখন নাইনে, শফিক তখন থার্ড ইয়ারের ছাত্র। তখন থেকেই শফিকের মাথা খেয়েছে মেয়েটা। নাজমা অবশ্য এসবের কিছুই জানে না। ছোটবেলা থেকেই নাজমা অন্য রকম। আর দশটা মেয়ের সাথে মেলে না ঠিক। চেহারায় লাবন্য কম, সাজুগুজুও করে না, তবু কোথায় যেন একটুখানি মায়া লেগে আছে। বান্ধবীরা যখন বাজারে আসা নতুন জামার গল্পে বিভোর, নাজমা তখন আবাহনী মোহামেডানের ফুটবল ম্যাচের খবরে চোখ রাখে। শফিক খেয়াল করে দেখেছে, তিনজন মেয়ে এক জায়গায় হলে অনুপস্থিত একটা মেয়ের পরচর্চায় মত্ত হয়ে ওঠে। নাজমা এসবে নেই।

আমেরিকার পরে পৃথিবীর নতুন পরাশক্তি কে হবে, এই নিয়ে সে আলাপ তোলে। কখনো কখনো এরশাদের প্রসঙ্গ নাড়াচাড়া করে। এরশাদ আর কোনোদিন ক্ষমতায় আসবে না–খুব দৃঢ়তার সাথে ভবিষ্যৎবাণী করে। মেয়েটার তেজ দেখে শফিক অবাক হয়। তাদের মায়ের বংশে এমন তেজস্বী কোনো নারী গত হয়েছে, শফিক জানতে পারেনি। বংশের স্বাভাবিক নিয়মকানুন উল্টে দিয়ে এই মেয়ে কোথা থেকে এনেছে এই ব্যতিক্রম চারিত্র! শফিকের বিস্ময় আর মুগ্ধতা কাটে না। ক্লাশ নাইন থেকেই সে নাজমাকে চোখে চোখে রেখেছে। বলতে গেলে নিজের ছোটবোনের মতো বিদ্যা দিয়ে বড় করেছে ভবিষ্যতের আশায়। নাজমা এখন কলেজে, শফিকের পড়াও শেষ, এখনই উত্তম সময় প্রেমের প্রস্তাব দেয়ার।

সেদিন সন্ধ্যায় খালার বাসায় বেড়াতে গেল শফিক। নাজমা তখন রান্নাঘরে। মাকে সাহায্য করছে। ভেতরে ঢুকেই শফিক শুনতে পেল, নাজমা বলছে, মা, এই যে একটা পটল তুমি খুব সহজেই কেটে দুই ভাগ করে ফেললে, তুমি কি জানো, একটা পটল উৎপাদন করতে একজন কৃষকের গড়ে কত ফোঁটা ঘাম ঝরাতে হয়?

মায়ের বিরক্তিকর গলা–পাগলের মতো কী সব বলিস না বলিস! বকবক না করে ডালের লবণটা একটু চাখ।
শফিক হাসতে হাসতে রান্নাঘরে ঢুকে বলল, কী নাজমা, রান্নাঘর কি রাজনীতির মঞ্চ বানিয়ে ফেললে! পটল-কৃষক-উৎপাদন-ঘাম–এসব কী?

নাজমা চটপট করে বলল, এসব তুমি বুঝবে না শফিক ভাই। এ তোমার ইংরেজি সাহিত্য না। তারচেয়ে বরং হাতটা একটু পাতো। লবণটা চেখে দাও। গরম কিন্তু, সাবধান!

রাতের খাওয়া শেষে দুজন ছাদে উঠল। বাতাসে মুখ বাড়িয়ে রেলিং ধরে দাঁড়াল নাজমা। দুটি ছেলেমেয়ে ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে, গল্প-উপন্যাসে এমন ঘটনা ঘটলে আকাশে চাঁদ উঠে পড়ে। কিন্তু এখন আকাশে চাঁদ নেই। মেঘে মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। শফিক আস্তে করে নাজমার হাত ধরল। নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, নাজমা, হিসেবে তোমাকে আমার তুইতোকারি করার কথা। তুমি আমার ছোট এবং খালাতো বোন। কিন্তু তুমি তুমি করি, তার একটাই কারণ, তোমাকে আমি ভালোবাসি। অনেক আগ থেকে। ছোট থেকে তুই তুই করলে বিয়ের পর আর তুমি বলা হবে না, সেই ভয়ে কখনো তুই তোকারি করিনি।
নাজমা খুব আলতো করে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, শফিক ভাই, আজকের আকাশে এত মেঘ কেন জানো?
কেন?
তোমার মন খারাপের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করার জন্য। তুমি ভালো ছেলে, অথচ আজ কষ্ট পাবে, সেই বেদনায় আকাশে কালো মেঘ।
তোমার কথার আগামাথা কিছুই তো বুঝছি না নাজমা!
নাজমার আর একটা কথাও বলল না। একা একা ছাদ থেকে নেমে গেল।

নাজমা ও আরিফ পর্ব:
নাজমার ইদানীং লাইব্রেরি গমন বেড়ে গেছে। ঘরের পাশের বেশ সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। দেশ বিদেশের নানান বইয়ে সাজানো আলমারি। নাজমার সৌভাগ্য, বাসার পাশেই সে এমন একটা বইসম্ভার পেয়ে গেছিল। সংরক্ষিত বইয়ের বেশিরভাগই তার পড়া। কিছু বই দুইবার তিনবারও পড়েছে।

সেই ছোট থেকে লাইব্রেরিয়ানকে দেখছে নাজমা। আরিফ উজ জামান নাম। যেন একই জায়গায় আটকে আছে বয়েস। কেবল নাকের নিচের চওড়া গোঁফে সামান্য পাক ধরেছে। সকাল আটটায় সে লাইব্রেরির তালা খোলে। ঝাড়ামোছা করে সবকিছু। তারপর চেয়ারে বসে। সামনে মেলে রাখে কোনো একটা বই। দুপুরের খাওয়াটা চেয়ারের উপরই সম্পন্ন হয়। কেউ বই খুঁজে না পেলে চেয়ার ছেড়ে ওঠে। প্রথমবারেই সঠিক তাকে হাত উঠে যায়। নির্দিষ্ট বইটা পাঠকের হাতে তুলে দিয়ে আবার ফিরে আসে চেয়ারে। বইয়ে মুখ ডুবায়। কথা বলে কম। নিশ্চুপ ধরনের লোক। যেন একা এক দীপে বেড়ে উঠেছিল। ভালো করে কথা কইতে জানে না। রাত আটটা বাজলে লাইট নিভিয়ে নীরবে ফিরে যায় নীড়ে। মানুষটার এই আশ্চর্য নীরবতা অবাক করে নাজমাকে। পৃথিবীর মতো কোলাহলময় একটা গ্রহে বাস করেও একটা মানুষ কীভাবে এতটা নির্জন হয়!

নাজমা একদিন লোকটার পিছু নিল। তার বাসা কোথায়, কে কে আছে ইত্যাদি জানার কৌতূহল। এমন নিশ্চুপ মানুষের স্ত্রী নিশ্চয় কোলাহলমুখর। লোকটার বউকে দেখার সাধ। নব্বইয়ের দশকের মফস্বল শহর। সন্ধ্যার পরেই কেমন নিঝুম হয়ে যায় সবকিছু। রাত আটটা বেশ রাত। নাজমার গা ছমছম করে। তবু লোকটার পিছু ছাড়ে না। বেশি দূর যেতে হয় না। রেল লাইনের ধারে আকাশ ছাত্রাবাসের ভেতর ঢুকে যায় লোকটা। নাজমা অবাক হয়। ছাত্রাবাস কেন? লোকটার তবে পরিবার নেই? অবিবাহিত?
পরের সপ্তার এক সকালে লাইব্রেরির দরজায় তালা ঝুলতে দেখে নাজমা। খোলার সময় দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তবু খোঁজ নেই লাইব্রেরিয়ানের। একটু দাঁড়াতেই একটা ছেলে এল।

জানাল, সে আগেও একবার এসে ফিরে গেছে। এমন তো হয় না!
নাজমা আকাশ ছাত্রাবাসে গেল। টিনের চালার কয়েকটা ঘর। এক মহিলা, সম্ভবত রান্নার খালা, আঁচলের তলে কিছু একটা ঢেকে বের হচ্ছিল। নাজমা তার কাছে লাইব্রেরিয়ানের খোঁজ জানতে চাইল। খালা জানাল–আরিফ সাহেব ঘরেই আছে। ঘুমাচ্ছে।
লাইব্রেরিতে না গিয়ে ঘুমাচ্ছে, অসুখ করল না তো! নাজমা আরিফের ঘরে উঁকি দিল। ছোট্ট ঘর। সিঙ্গেল চোকি। মাথার কাছে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। পায়ার কাছে গামলায় ঢাকা খাবার। এক পাশে বইয়ের আলমারি। দেয়ালের সাথে টাঙানো রশি। লুঙ্গি গামছা ঝুলছে।

দরজায় শব্দ হতেই আরিফ কঁকিয়ে উঠল–কপিলা! জ্বরগ্রস্ত গলার স্বর। কপিলা ডাকটা ঢেউয়ের মতো কেমন ভেঙে ভেঙে গেল।
এই লোকটা কেবলই অবাক করে চলেছে নাজমাকে। মানিক বাবুর বিখ্যাত কপিলা কোথা থেকে আসবে এখানে। নাকি তার বউয়ের নাম কপিলা! নাজমা একটু দ্বিধার সাথে ভেতরে ঢুকে লাইব্রেরিয়ানের কপালে হাত রেখে আঁতকে উঠল। ধান ফেললে খই ফুটে যাওয়ার মতো গরম কপাল। বাইরে এসে দেখল, কেউ নেই। ছাত্রাবাসের ছাত্ররা হয়ত কলেজে বেরিয়ে গেছে। নাজমা অস্থির হয়ে উঠল। এভাবে একা পড়ে থাকলে লোকটা নির্ঘাত মারা যাবে। সে দূরের ফার্মেসি থেকে একজন ডাক্তার ডেকে আনল। ডাক্তার ইনজেকশ করল। তিনবেলার ওষুধ দিল। ডাক্তারকে বিদায় করে একা নাজমা মহা ফ্যাসাদে পড়ল। ছাত্রাবাসের ছেলেরা কখন আসবে জানা নেই। সে ঘরের বাইরে পায়চারি করতে লাগল। এরই মধ্যে একটা ছেলে আসলে তাকে ওষুধ বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরল নাজমা।

পরের দিন আধা সুস্থ শরীর নিয়ে লাইব্রেরিতে গেল আরিফ। কুশল জিজ্ঞেস করে নাজমা কপিলার কথা জানতে চাইল। আরিফ নির্বিকার গলায় বলল, কুবেরের শালি। পদ্মা নদীর মাঝি।
তা জ্বরের ঘোরে কপিলাকে ডাকছিলেন কেন?
আরিফ চুপ।
বলুন।
আগের রাতে ওর সাথে বৃষ্টিস্নান করেই তো জ্বরটা আসল। তাই ওকে ডাকছিলাম।
মানে!
মানে আপনি বুঝবেন না। সে জন্যই প্রথমবারে বলতে চাইনি।
বলুন প্লিজ।
আসলে আমি যখন যে বই পড়ি, সেই বইয়ের পছন্দের চরিত্র আমার কাছে চলে আসে। একসাথে থাকি, ঘুমাই, ভাত খাই, স্নান করি। আর এই জন্যই আমার কোনো স্ত্রী নেই। বইয়ের নারী চরিত্ররাই আমার সাথে থাকে একেক দিন।
লোকটার এই অদ্ভুত কথা নাজমার বোধে শিহরণ তুলল। তার মনে হলো, প্রতি একশ বছরে এমন মানুষ একটাই জন্মায় পৃথিবীতে। যে কিনা বইয়ের চরিত্রের সাথে সাংসার পাতে আর জ্বরে বেহুশ হয়ে মরতে বসে। হঠাৎ লোকটার জন্য অদ্ভুত এক মায়া জেগে ওঠে নাজমার বুকে। তার চোখ ভিজে যায়। এমন একজন মানুষের পাশে থাকতে ইচ্ছে করে। সে আরিফের একটা হাত স্পর্শ করে বলে, ওই চরিত্রদের পাশে আমাকে একটু ঠাঁয় দেবেন?
লোকটা এবার চোয়াল শক্ত করে নাজমার দিকে তাকায়। বলে, না। আপনাকে তো আমি পড়িনি। যাকে পড়িনি, তার সাথে সংসার পাতি কীভাবে!

আরিফ ও বিউটি পর্ব:
দুপুরবেলা। এই সময় বলতে গেলে লোকই থাকে না লাইব্রেরিতে। খুব বিষণ্ন লাগে পরিবেশ। বিষণ্নতা উস্কে দিতে কোথায় যেন একটা ঘুঘু ডেকে ওঠে। পরিবেশটাকে আরো ক্লান্ত করে ওই ডাক। বিষণ্নতা দূর করতে আরিফ টিফিন ক্যারিয়ার খুলে খাবার খেতে বসে টেবিলে। হঠাৎ ভেতর থেকে একটা চুমুর শব্দ ভেসে আসে। চক্কাস। আরিফ প্রথমবারে চমকে উঠলেও গ্রাহ্য করে না। পরক্ষণে চুড়ি টুং টাং আওয়াজ আসে অস্বাভাবিকভাবে। যেন কেউ চুড়িসুদ্ধ একটা হাত মৈথুন করে চলেছে। আরিফের টেবিলটা মেইন গেটের মুখে। লাইব্রেরির মূল অংশটা এখান থেকে দেখা যায় না। দ্বিতীয়বার চুমুর শব্দ পেলে ভেতরের অংশে উঁকি মারে আরিফ। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে বই পড়তে এসে প্রেম করছে। আর কেউ নেই। মনে মনে একটু হেসে আরিফ ফিরে আসে টেবিলে। আধা ঘণ্টা পরে ওরা যখন বের হয়, ওদের চোখেমুখে খেলা করে আনন্দ। মেয়েটাকে চিনতে পারে আরিফ। বিউটি। ক’দিন হলো লাইব্রেরিতে যাতায়াত করছে। পরের দিন একই সময়ে আবার বেজে ওঠে চুমু।

তবে আজ বিউটির সাথে ভিন্ন ছেলে। তৃতীয় দিনও বেজে ওঠে চুমু। এবং বিউটির সাথে নতুন ছেলে। প্রতিদিন নতুন নতুন ছেলে সাথে করে আনে বিউটি। ঠিক এই দুপুর সময়টায়। যখন ঘুঘু ডেকে ওঠে। এবং নির্জন হয়ে পড়ে লাইব্রেরি। আজীবনের নির্লিপ্ত আরিফ বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকে। মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখে, চুমু এবং মৈথুনেই থেমে থাকে ওদের লেনাদেনা। আরিফ বুঝতে পারে, বিউটি তার লাইব্রেরিকে পয়সা উপার্জনের ঘর হিসেবে ব্যবহার করছে। এইসব ঘটনার ভেতরে আরিফ শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত পড়া শুরু করে। এবং যেটা হয় আরিফের, উপন্যাসের রাজলক্ষ্মী চরিত্রটা তার কাঁধে ভর করে। এবং অবাক করা বিষয় হলো, বিউটিকে তার রাজলক্ষ্মী বলে মনে হয়।

বইয়ের পাতার রাজলক্ষ্মীর যেন পুনর্জন্ম হয়েছে বিউটি চরিত্রে। আরিফের সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে যায় বিউটি। কল্পনায় সে বিউটির সাথে সংসার পাতে। একসাথে ঘুমায়, ভাত খায়, স্নান করে। একদিন সঙ্গমও করে। আর লাইব্রেরিতে এসে রক্তমাংসের বিউটিকে দেখে তার ঘোর আরো বেড়ে যায়। একদিন সে বিউটিকে রাজলক্ষ্মী সম্বোধনে ডাকলে বিউটি অবাক হয়। আরিফ ঘোরগ্রস্তের মতো বলে, তুমি আমার কাছে থাকবে?
বিউটি দোকানদারের মতো বলে, থাকলে কয় টাকা দেবেন আঙ্কেল?
আমার যে টাকা নেই।
টাকা নেই তো শোয়ার শখ কেন?
তোমাকে আমি ভালোবাসি যে!
বুড়ো বয়সে ভীমরতি!
মেয়েটা প্রত্যাখান করে লাইব্রেরিয়ানকে। এবং ত্যাগ করে লাইব্রেরিকেও।

বিউটি ও নয়ন পর্ব:
বিউটির ঘটনা কলেজে ছড়িয়ে পড়েছে। ছোট শহর। সবাই চেনাজানা। কলেজে তো ছড়িয়েছেই, মহল্লায় মহল্লায়ও এটা নিয়ে রসালো গল্প বের হয়েছে। যুবক ছেলেদের বাবা-মা বিউটির ঘটনা নিয়ে চিন্তিত। ছেলেকে তারা চোখে চোখে রাখছে।
হঠাৎ এক নেশার ঘোরে পড়ে গিয়েছিল বিউটি। জগতে তো কত রকমই নেশা আছে। সিগারেটের নেশা। সিনেমার নেশা। বিউটির নেশা সাজুগুজু। কিন্তু প্রসাধনী কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা বিউটিকে দেয়া হয় না। তাই সে নিজেই উপার্জনে নেমেছিল। কিন্তু চারদিকে ছিঃ ছিঃ পড়ে গেলে বিউটির ঘোর ভাঙে। সে তার উপার্জন থেকে বেরিয়ে আসে বটে, কিন্তু গল্প ছড়ানো থেমে থাকে না। বাসায় মা-বাবা কথা বলে না। ছোট ভাই পর্যন্ত অশ্লীল খোঁচা মারে। বন্ধবীরা দূরে সরে গেছে। ক্লাশের ছেলে বন্ধুরা লোলুপ চোখে তাকায়। সবার কাছে পুরনো আসন ফিরে পেতে চেষ্টা করে বিউটি। কিন্তু পুনরুদ্ধার সম্ভব হয় না। কেউ ওর সাথে কথাই বলতে চায় না।

একদিন কলেজ মাঠে আড্ডা দিচ্ছিল নয়নরা। প্রসঙ্গ: বিউটি। দূর থেকে তাদের ছেঁড়া ছেঁড়া কথা কানে আসে বিউটির। রতন বলে, ফার্স্ট ইয়ারের একটা মেয়ে হয়ে বিউটি যা করল তা এক ইতিহাস। হাসান বলে, বিউটিকে কলেজ থেকে বের করে দেয়া উচিত। পুরো কলেজের বদনাম। হাবিব মজা করে–বলিস কী! বের করে দিবি! ওকে যদি আমাদের কারো দরকার হয়, তখন কার কাছে যাব! এমন সস্তা জিনিস তো সহজে পাওয়া যাবে না। নয়ন প্রতিবাদ করে, বিউটির অধ্যায়টা আমাদের বাদ দেয়া উচিত। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ও ওসব ছেড়ে দিয়েছে। এবং নিজের কাজের জন্য ও অনুতপ্ত। ও ভালো হয়ে যেতে চায়।
রিপন তাচ্ছিল্য করে–আরে রাখ ওর ভালো হওয়া। এইসব মাগিরা জীবনেও ভালো হয় না। এখন কিছুদিন ভেক ধরে থাকবে। আবার যা তাই।

মানতে পারলাম না। এটা বিউটির একটা এক্সিডেন্ট। নয়নের গলায় একই রকম প্রতিবাদের ঝাঁজ।
বিপ্লব খোঁচা দেয়–কী রে! ওর জন্য দরদ যে একেবারে উথলে উঠছে! কাহিনি কী রে নয়ন? তোর থেকে বুঝি টাকা পয়সা নেয় না?
নয়নের রাগ হয়ে যায়। সে ধুর বাল বলে আড্ডা ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
পরদিন খুব দ্বিধা নিয়ে নয়নের সামনে যায় বিউটি। অনেক দিন হলো সে কারো সাথে কথা বলতে পারে না। কিন্তু গতকাল নয়ন যেভাবে তার পক্ষ নিয়ে বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করল, একটা ধন্যবাদ অবশ্যই পাওনা নয়নের। বিউটি নয়নের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কথা বলার সাহস হয় না। নয়ন বলে, কিছু বলবা?
আপনাকে ধন্যবাদ নয়ন ভাই।
ধন্যবাদ কেন?
কাল আপনি আমার পক্ষে ঝগড়া করলেন বন্ধুদের সাথে, তাই ধন্যবাদ। আমি একটা বিপদের ভেতর আছি। পাশে কেউ নেই। আপনাকেই প্রথম পেলাম।
আরেহ কী বলো না বলো। এসব কিছুই না। টেনশন করবা না। দুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
বিপদের সময় এইভাবে কয়জনই সাহস দিতে পারে! নয়নের প্রতি বিউটির মুগ্ধতা বেড়ে যায়। আরেক দিন নয়নের সামনে এসে কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়ায় বিউটি। নয়ন বলে, কিছু বলবা, বিউটি?
বলব। কিন্তু কীভাবে বলব বুঝতে পারছি না।
বলে ফেল। কোনো সংকোচ নেই।
আপনি কি আমাকে খুব খারাপ মনে করেন?
খারাপ মনে করব কেন!
আসলে…
কী আসলে?
আমার ব্যাপারে যা কিছু বলা হচ্ছে, আমি আসলে অত খারাপ না।
মানে কী?
জানেন, ছোটবেলা থেকেই আমার খুব সাজগোজ পছন্দ। কিন্তু আমার হাতে তো টাকা থাকত না।
হুম, সাজলে তো তোমাকে সুন্দর লাগে।

নয়ন ভাই, আমি বেশি খারাপ কাজ করতাম না। শুধু টাচ করতে দিতাম। সাজগোজের জিনিস কেনার জন্য অল্প টাকা নিতাম। আপনি আমাকে বেশি খারাপ মেয়ে মনে করবেন না, প্লিজ। আপনি যদি আমাকে খারাপ মনে করেন, আমার অনেক কষ্ট হবে। বলেই হনহন করে চলে যায় বিউটি। নয়ন কোনো কথা বলার সুযোগই পায় না। এই ঘটনার দেড়মাস পর আবার নয়নের মুখোমুখি হয় বিউটি। কোনো ভূমিকা ছাড়াই বিউটি বলে, আমি খুব একা হয়ে গেছি। কেউ আমার সাথে ভালো ব্যবহার করে না। একা থাকার জন্যই হয়ত আপনাকে আমার বেশি বেশি মনে পড়ে। আপনার জন্য আমার বুকের ভেতর কেমন কেমন করে। পুড়ে যায়। আপনাকে মনে হয় আমি ভালোবেসে ফেলেছি। বিউটি পায়ের বুড়ো আঙুলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার দাঁড়াবার ভঙ্গিটা এমন–সে নয়নের সিদ্ধান্তটা জানতে চায়। এবং নিরাশ হতে চায় না।

নয়ন একটুখানি অবাক হয়ে তাকায় বিউটির দিকে। তারপর আকাশের দিকে মুখ করে বলে, কষ্ট পেও না বিউটি। আসলে আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। সে পুরোটা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
বিউটি ভেজা গলায় বলে, কে সে?
তুমি তাকে চেনো। তোমাদের ক্লাশের লাইজু। আমাদের বাসায় ভাড়া থাকে।
পাঁচ হৃদয় ঘুরে নয়নের ভালোবাসা আবার নয়নের কাছেই ফিরে এল, সে টের পেল না।

লিখা: সংগৃহিত

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2