শিরোনাম:

একজন শহিদুল আলম : জীবন, কর্ম ও ভাব-ভাবনা

মিথুন রায়
৯ আগস্ট ২০১৮, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: 5:04 আপডেট: 7:21
একজন শহিদুল আলম : জীবন, কর্ম ও ভাব-ভাবনা

১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ এই তিন-চার বছর আলোকচিত্রের ওপর প্রায় ৮০০ বই পড়ে ফেলেছিলেন। ক্যামেরা পাগল সেই ছোট্ট ছেলেটি একদিন যে বিশ্বকে তাক লাগবে কে জানতো? বলছিলাম ঢাকার সন্তান বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের কথা। তার জন্ম ১৯৫৫ সালে। ঢাকার বুকেই বেড়ে ওঠা। শৈশব-কৈশোরও কাটে ঢাকাতেই। বাবার নাম কাজী আবুল মনসুর এবং মায়ের নাম কাজী আনোয়ারা মনসুর। শহিদুল আলম রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা শেষ করলেও দর্শনশাস্ত্রে পিএইচডি করেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

বর্তমানে বাংলাদেশ তথা বিশ্বের একজন অন্যতম ও শ্রদ্ধেয় আলোকচিত্রী হিসেবে তার সুনাম সর্বজনবিদিত। এই শহিদুল আলমের হাতেই গড়ে উঠেছেন হালের শত শত ফটোগ্রাফার। একজন পেশাদার চিত্রগ্রাহক হলেও তার লেখক, কিউরেটর ও অ্যাক্টিভিস্ট পরিচয়ও অনেকেরই জানা। নিজের চারদশকব্যাপী সফল ক্যারিয়ারে শহিদুলের ছবি নিউইয়র্ক টাইমস, টাইম ম্যাগাজিন ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকসহ আন্তর্জাতিক প্রায় প্রতিটি খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যমে ছাপা হয়েছে।

সম্প্রতি ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে সারা দেশ যখন উত্তাল তখন হঠাৎই গোয়েন্দা পুলিশ গুণী এই আলোকচিত্রীকে মধ্যরাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে গত শনি ও রোববার ঝিগাতলা এলাকায় সংঘর্ষের বিষয়ে কথা বলতে বেশ কয়েকবার ফেসবুক লাইভে আসেন আলোকচিত্রী শহিদুল। এর পর রাতেই তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। গোয়েন্দা পুলিশের দাবি- শহিদুল আলম আল-জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন। যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। এমনকি তিনি বেশ কিছু ছবিও উদ্দেশ্যমূলকভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে প্রকাশ করেছেন। 

তবে শহিদুল আলমের গ্রেফতারের পর বিষয়টি নিয়ে দেশি ও বিদেশি গণমাধ্যম বেশ সরব হয়ে উঠেছে। বিশেষত পশ্চিমা মিডিয়াগুলো শহিদুল আলমের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাকে হয়রানির নিন্দা জানাচ্ছে। 

১৯৮৯ সালে দৃক ফটো গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করেন শহিদুল আলম। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন দক্ষিণ এশিয়ার ফটোগ্রাফি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠশালা। ২০১৮ সালে পাঠশালা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়েছে। তিনি ছবি মেলারও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নেদার‌ল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ডপ্রেস ফটো প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম এশীয় হিসাবে তিনি এ সম্মান অর্জন করেন। 

কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ শহিদুল আলম ২০১৪ সালে ফটোগ্রাফিতে শিল্পকলা পদক পুরস্কার, ২০১৭ সালে চীনের ডালি ইন্টারন্যাশনাল চিত্রপ্রদর্শনীতে আজীবন সম্মাননা লাভ ও ২০১৮ সালে হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাওয়ার্ড পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও ১৯৮৩ সালে তিনি হার্ভে হ্যারিস ট্রফি জেতেন। ১৯৯৩ সালে তথ্যচিত্রের জন্য জিতে নেন মাদার জোন্স পদক। ‘৯৮-এ তিনি আন্দ্রে ফ্রাঙ্ক ফাউন্ডেশন ও হাওয়ার্ড চ্যাপনিক অ্যাওয়ার্ডস লাভ করেন। 

শহিদুল আলমের প্রতিষ্ঠিত ‘পাঠশালা’ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রখ্যাত ফটোগ্রাফি স্কুল। এই স্কুলে পড়তে বিদেশ থেকেও শিক্ষার্থী আসেন। আসেন অতিথি শিক্ষকরাও। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক ইন্সটিটিউট ও সাউথ এশিয়ান ইন্সটিটিউট অব ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠা করেছেন। দৃক ও পাঠশালা- দুটি প্রতিষ্ঠানই পৈতৃক সম্পত্তিতে গড়ে তুলেছেন তিনি। 

তবে শহিদুল আলমের সবচেয়ে বড় কাজ বলা হয় ছবি মেলা’কে। ২০০০ সালে এই আন্তর্জাতিক চিত্রপ্রদর্শনীতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ছবি জমা পড়ে। আসেন বিশ্বের নামিদামি আলোকচিত্রীগণ। চিত্রপ্রদর্শনীর প্রথম থিম ছিল ‘যেই যুদ্ধ আমরা ভুলে গেছি।’ এই প্রদর্শনীটিই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ছবি সম্বলিত সফল চিত্রপ্রদর্শনীগুলোর অন্যতম।
শহিদুল-আলমলন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্গানিক কেমেস্ট্রি নিয়ে পিএইচডি করলেও বিশ্বের নানা প্রান্তে অতিথি শিক্ষক হিসেবেও সুনাম রয়েছে তার। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের সান্ডারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইউসিএলএ) ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে সময় কাটিয়েছেন তিনি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও অতিথি লেকচারারের ভূমিকা পালন করেছেন এই গুণী মানুষটি। 

২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো লেখক শহিদুল আলম সবার সামনে আসেন। কাশ্মীরের ভূমিকম্প নিয়ে ‘নেচার’স ফিউরি’ ও দক্ষিণ এশিয়ায় এইচআইভি/এইডস নিয়ে ‘পোর্ট্রেইট অব কমিটমেন্ট’ শীর্ষক দুটি বই লিখে দারুণ নন্দিত হন এই ছবির কারিগর। এছাড়াও তার লেখা ‘মাই জার্নি অ্যাজ অ্যা উইটনেস’ বইটিকে লাইফ ম্যাগাজিনের সাবেক পিকচার এডিটর জন মরিস কোনও চিত্রগ্রাহকের লেখা সর্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই বলে মন্তব্য করেছিলেন।

গত ৫ আগস্ট রাত ১০ রায় রাজধানীর ধানমন্ডির নিজ বাসা থেকে শহিদুল আলমকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর গোয়েন্দা পুলিশ স্বীকার করে যে, জিজ্ঞাবাদের জন্য তাকে আটক করা হয়েছে। কিন্তু পরে তথ্য-প্রযুক্তি আইনে দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

এদিকে শহিদুল আলমকে হয়রানিমূলক গ্রেফতার করা হয়েছে দাবি করে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সাংবাদিকদের বৈশ্বিক সংগঠন কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), পেন ইন্টারন্যাশনাল, দক্ষিণ এশিয়া মিডিয়া ডিফেন্ডার্স নেটওয়ার্ক (সামডেন) সহ গার্ডিয়ান ও ওয়াশিংটন পোস্টের মতো গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে নিন্দা জানানো হয়েছে। ৬৩ বছর বয়সী শহিদুল আলমকে সম্মানের সহিত দ্রুত অব্যাহতি দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব সংবাদমাধ্যমগুলো। 

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নিজের জীবনের নানা সময়ের গল্প, ভাবনা, জীবনবোধ ও দর্শনের কথা বললেন গুনী এই আলোকচিত্রী। 

মানুষে মানুষের সম্পর্কই তার কাছে বড়, শ্রেণিবৈষম্য তাঁর জীবনের অভিধানে নেই। তিনি শিক্ষক, তবে মনে করেন ‘সবার আমি ছাত্র’। বলেন, ‘আলোকচিত্রের তো অনেক পুরস্কার আছে। কিন্তু কী কারণে আমি আলোকচিত্রী, সেটি আমরা অনেকে ভুলে যাই। লড়াই করার জন্য যখন যা দরকার তা-ই বেছে নেব। প্রয়োজনে কলম দিয়ে কবিতা লিখব, গান গাইব।’

বর্তমান সময়ের আলোকচিত্রীদের নিয়ে ভাবনার কথা জানতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘স্পর্শকাতর বিষয়ে কাজ করছেন না আলোকচিত্রীরা। হয়তো ভাবছেন, নিরাপদ না, সময়টা ভালো না। সময় তো আগেও ভালো ছিল না। কেউ না কেউ লড়াই করে ভালো সময় নিয়ে আসবে, তখন আমি কাজ করব। সেটা কোনো কাজের কথা হলো না। বড় পরিবর্তনের জন্য অন্যের দিকে না তাকিয়ে নিজেকে করতে হবে। পাঠশালা সেই ভূমিকা পালন করতে পারে। তাঁদের অনেক কিছু করার আছে এখানে।’

নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে শহিদুল আলম বলেন, ‘আমি নিজেকে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে দেখি। শুধু বিদেশিরা বিশ্ব নাগরিক হিসেবে পরিচিতি পাবে, সেটি আমি মানতে নারাজ। আমার যেকোনো প্রদর্শনীর প্রথম আয়োজনটা করি বাংলাদেশে। পরে দেশের বাইরে। একসময় আমার বিদেশি বন্ধুরা এসে পড়িয়ে যেতেন পাঠশালায়। এখন আমাদের কাছে পড়তে আসে বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েরা। বাংলাদেশে দৃক, পাঠশালা ও ছবিমেলা করেছি। আন্তর্জাতিকভাবে সেরা হতে হবে এদের। আমার যেমন স্বপ্ন, পাঠশালার নতুন ভবনে হবে পৃথিবীসেরা আলোকচিত্রের প্রশিক্ষণ। আমি না থাকলেও আমার ছাত্ররা নিশ্চয়ই পারবে।’

স্বপ্নবাজ এই প্রাজ্ঞ মানুষটির আকাশে আজ দুঃসময়ের কালো মেঘ। মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য- এই সত্যকে ধারণ করে কালো মেঘ ভেঙে সোনালী সূর্যের সকাল উঁকি দেবেই- এ প্রত্যয়েই শহিদুল আলমরা এগিয়ে যান। পাখির খোলস ভেঙে ‍ঋতের সন্ধানে নামের রাজপথে। হাতে তুলে নেন ক্যামেরা। কখনওবা তীর্যক কলম। (তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট)

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2