শিরোনাম:

আদি মহাকাব্য ও দুঃসাহসী গিলগামেশ

আকেল হায়দার
২৩ জুলাই ২০১৮, সোমবার
প্রকাশিত: 6:53 আপডেট: 7:04
আদি মহাকাব্য ও দুঃসাহসী গিলগামেশ
আক্কাদীয় ভাষায় লেখা গিলগামেশের একটি কাহিনীফলক, ছবি: বাবেল স্টোন/উইকিপিডিয়া

মেসোপটেমিয়া সভ্যতার আদি মহাকাব্য গিলগামেশের কথা আমরা সবাই জানি। আজ অবধি গিলগামেশকেই বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সাহিত্য হিসেবে মনে করা হয়। মোট পাঁচটি কবিতার সংকলনে তিন হাজার চরণ সংখ্যায় এটি রচিত। জনশ্রুতি আছে, উরুকের (বর্তমান ইরাকের সামাওয়া শহর) সম্রাট গিলগামেশকে কেন্দ্র করে এর বিষয়বস্তু আবর্তিত। এ কাব্যে গিলগামেশের দুঃসাহসিক স্বর্গাভিযানের বিভিন্ন কাহিনীর বর্ণনা রয়েছে। কীভাবে এল গিলগামেশ আধুনিক সাহিত্য মহলে? কীভাবে আমরা পেলাম এ মহাকাব্যের খোঁজ? অমূল্য এ সৃষ্টি পুনরুদ্ধারে কার অবদান নিহিত ছিল? চলুন জেনে নিই রোমাঞ্চকর সেই ঘটনার কথা।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে নিনেভের (বর্তমান ইরাকের মশুল শহর) নিকটবর্তী এলাকা থেকে উদ্ধারকৃত অস্পষ্ট কাদামাটির ফলকের লিখনচিত্রটি বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান বস্তুগুলোর একটি। কেননা এর মাঝেই অন্তর্নিহিত ছিল গিলগামেশের চরিত্রগুলো; বর্তমানে যাকে আমরা আদি মহাকাব্য হিসেবে জানি। কিন্তু সে সময়ের পণ্ডিতদের কাছেও এর তথ্য ছিল অজানা। গিলগামেশের এ চমকপ্রদ কাহিনী সবার কাছে অজানাই থেকে যেত, যদি জর্জ স্মিথের মতো তুখোড় অনুসন্ধিত্সু আর নাছোড়বান্দা প্রত্নতত্ত্ববিদেরা না থাকতেন।

ভিক্টোরিয়ান যুগে ইংল্যান্ডে সামাজিক রীতিনীতি ছিল বেশ কঠোর। অনেকের মতে, মর্যাদাপূর্ণ ব্রিটিশ জাদুঘরে চাকরি পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু জর্জ স্মিথ সেই দুর্গম বাধাকে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। জর্জ স্মিথের জন্ম ১৮৪০ সালে লন্ডনে। স্মিথ ছিলেন একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রত্নতত্ত্ববিদ। তিনি কেবল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার কিউনিফর্ম লিপিতে বিশেষজ্ঞ ছিলেন না; প্রাচীন ইতিহাসের এমন সব বিষয় আবিষ্কার করে গেছেন, যা আজকের দুনিয়ায় অনেক পণ্ডিত ও সাধারণ মানুষের কাছে এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে।

হায়ারোগ্লিফিক্স বিশেষজ্ঞ জর্জ স্মিথ ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী ও স্বশিক্ষিত একজন মানুষ; প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতা ও হায়ারোগ্লিফিক্স সম্পর্কে যার ছিল পর্যাপ্ত জ্ঞান। ১৪ বছর বয়সে তিনি স্কুল ত্যাগ করেন। এরপর একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে ব্যাংকনোটের নকশাকরণ, খোদাইকরণ, ছবি অঙ্কনসহ যাবতীয় জটিল কাজগুলো করা হতো। এ-জাতীয় কাজে গভীর মনোযোগ ও সূক্ষ্ম অবলোকন জরুরি। স্মিথ এ কাজ বেশ উপভোগ করতেন। একাগ্রচিত্তে কাজে নিবিষ্ট থাকতেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সবকিছু রপ্ত করে ফেলেন, যা পরবর্তী সময়ে তার জীবনের স্মরণীয় কাজগুলো সুন্দর ও সফলভাবে করতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। স্মিথের কর্মস্থল ছিল ফ্লিট স্ট্রিট ব্লুমসবারিতে অবস্থিত ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কাছে। ১৯৬০ সালে স্মিথ তার ভেতর উজ্জীবিত অনুসন্ধিত্সু মনের ক্ষুধা নিবারণের জন্য ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরিতে মেসোপটেমিয়া সভ্যতা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। বিশেষ কোনো কাজে সে সময় প্রত্নতত্ত্ববিদ অস্টেন হেনরি লেয়ার্ড ও অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক সেখানে আসেন, যারা এরই মধ্যে নিনেভে ভ্রমণ করেছেন।

গিলগামেশস্মিথ সেখানে বিদ্যমান মৃত্তিকা ফলকে লেখার বিষয়বস্তু ও সেগুলোর পাঠোদ্ধার সম্পর্কে ধারণা অর্জনের জন্য দীর্ঘসময় কাজ করেন। শিলালিপিগুলো ছিল আক্কাদিয়ান ভাষায় প্রাচীন কিউনিফর্ম হরফে লেখা। বিভিন্ন পাথর ও জমাট বাঁধা শক্ত মাটির ওপর খোদাই করা। এসব লেখার পাঠোদ্ধার করার জন্য প্রয়োজন একান্ত সাধনা, নিবিড় মনোযোগ ও পরম ধৈর্যশীলতা। স্মিথ দিনের পর দিন মগ্ন থেকে সেগুলো নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার পুরাকীর্তি বিশেষজ্ঞরাও উপলব্ধি করেন, স্মিথ এ লেখার ব্যাখ্যা বা অনুবাদে দিন দিন পারদর্শী হয়ে উঠছে। তারা বিষয়টি সে সময়ের শীর্ষস্থানীয় কিউনিফর্ম বিশেষজ্ঞ স্যার হেনরি রলিনসনকে অবহিত করেন। রলিনসন তখন লেয়ার্ডের সঙ্গে নিনেভে পরিদর্শনে ছিলেন।

ঔত্সুক হয়ে দ্রুততম সময়ে তিনি স্মিথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং স্মিথের ভাষাজ্ঞান দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। স্মিথ তাদের উপস্থিতিতে সংগৃহীত শিলালিপিগুলো টেবিলের ওপর মুখোমুখি করে দাঁড় করিয়ে সূক্ষ্মভাবে সেগুলোর সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থ ব্যাখ্যা করেন।

১৮৬১ সালে রলিনসন স্মিথকে সেখানে নিয়োগ দেয়ার জন্য মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষকে রাজি করান। প্রাথমিকভাবে স্মিথ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত বিপুলসংখ্যক শিলালিপি সুশৃঙ্খলকরণের জন্য খণ্ডকালীন ভিত্তিতে নিয়োগ পান। সহস্রাধিক শিলালিপির সংগ্রহ ছিল সেটা, যার বেশির ভাগই আনা হয়েছিল নিনেভের লাইব্রেরি থেকে, যা খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে অসুরিয়ান সম্রাট অসুরবানিপালের সময় লিপিবদ্ধ হয়েছিল। মিসর থেকে তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল অসুরবানিপালের সাম্রাজ্য। শিলালিপিগুলো ১৮৫০ সালে লেয়ার্ডের অনুগত হরমুজড রাসাম আবিষ্কার করেছিলেন। তবে আক্কাদিয়ান লেখার বিশেষজ্ঞ ছিল খুব অপ্রতুল। তাই এর বেশির ভাগ নিদর্শনই জাদুঘরের বাম দিকের অংশে অনেকটা অবহেলায় রাখা হয়েছিল। পরবর্তী দশক ধরে স্মিথ প্রাচীন সেই ভাষা রপ্ত করার তাগিদ অনুভব করেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে আক্কাদিয়ান ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

দীর্ঘদিন ধরে প্রাচীন সব লেখনী নিয়ে গবেষণার একটা সময় পর অবশেষে রহস্য উন্মোচিত হয়। চাকরির প্রথম দশকে মিউজিয়ামে কাজ করার সময় স্মিথ বনি ইসরাইলের বিভিন্ন ইতিহাস ও ঘটনাগুলোর তারিখ নির্ণয়ে সক্ষম হন, যা কালক্রম অনুসারে বাইবেলকে পুনর্বিন্যাস করতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। স্মিথের ইচ্ছে ছিল আরো অধিক শিলালিপির সন্ধানে মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ করা। অন্যদিকে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ চাইছিল, স্মিথ যেন সেখানে সংরক্ষিত ফলকগুলো নিয়ে আরো বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা করে সেগুলোর অনুবাদ সম্পন্ন করেন। ভেঙে যাওয়া শিলালিপিগুলো সংযোজন করে বাইবেলের বিবিধ গাণিতিক সূত্র উদ্ঘাটনের ব্যাপারে ভীষণ আশাবাদী ছিলেন স্মিথ। সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রায় এক দশক কাজ করার পর উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনে সমর্থ হন তিনি।

গিলগামেশ১৮৭২ সালের নভেম্বরে নিনেভে থেকে সংগৃহীত বিচ্ছিন্ন একটি অংশ তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সাধারণ কারো কাছে এটি অন্যান্য পাথর ফলকের মতো হয়তো নিতান্ত ভগ্ন ফলক ছাড়া আর কিছু মনে হবে না। কিন্তু এর মাঝে গূঢ় অর্থপূর্ণ কিছু সংকেত স্মিথকে বেশ বিস্মিত করেছিল, যা তার মনে একটা বিষয়ে যোগসূত্রের ইঙ্গিত দিয়েছিল। এর বেশির ভাগ লেখনী ছিল ময়লা ও ধুলার আস্তরণে আবৃত। উদগ্রীব হয়ে স্মিথ অপেক্ষা করছিলেন কীভাবে একে দ্রুত পরিষ্কার করে এর রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়।

সংশ্লিষ্ট শিলালিপিটি যখন পরিষ্কার করে তার সামনে রাখা হয়, উপস্থিত সবার কাছে তিনি এ শিলালিপি সম্পর্কে তার ধারণার ব্যাখ্যা দেন, যেখানে ভয়াবহ এক বন্যার ঘটনা উল্লেখ ছিল; যার অংশবিশেষ বাইবেলের (জেনেসিস) আদি পুস্তকে বর্ণিত হজরত নুহ (আ.)-এর সময়ে সংঘটিত বন্যার ঘটনার সঙ্গে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। তৃতীয় কলামে লক্ষ করলে দেখা যায়, জাহাজটি ভাসতে ভাসতে নিজির পাহাড়ে এসে থামে, যে অঞ্চলটি বর্তমান ইরাকের উত্তরাংশে অবস্থিত।

জাহাজ থেকে একটি পায়রা উড়িয়ে দেয়া হয় নিরাপদ বাসস্থান অনুসন্ধানের আশায়। বেশ কিছুক্ষণ ওড়ার পর পায়রাটি বাস উপযোগী কোনো জায়গার খোঁজ না পেয়ে পুনরায় জাহাজে ফিরে আসে। তার মতে, এটি সেই মহাপ্লাবনে ডুবে যাওয়া ফলকবিশেষ, যা ক্যালডিয়ান ভাষায় লেখা হয়েছিল। মুহূর্তে আবেগাপ্লুত হয়ে যান স্মিথ। উল্লাসে কামরার চারপাশে দৌড়াতে থাকেন। চিত্কার-চেঁচামেচি শুরু করেন। সহকর্মীরা কী ঘটেছে জানার জন্য তার কাছে আসতেই তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে শরীরের পোশাক খুলে ফেলেন। স্মিথের কাছ থেকে জানা যায়, মেসোপটেমিয়ার আদি পুস্তকে বর্ণিত অনুরূপ একটি বন্যার বিবরণ। প্লাবনের ঘটনাটি সত্যিকারে সংঘটিত একটি ঘটনা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় পুনরায় বিবেচনাধীনে আসে।

স্মিথের এ আবিষ্কার নব্য চেতনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। বিষয়টি কেবল বিজ্ঞদের কাছে নয়, বরং সর্বজনীনভাবে বিশ্বের সবার জন্য তাত্পর্যপূর্ণ। চমকপ্রদ বিষয়টি প্রকাশিত হলে লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ জর্জ স্মিথের নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে কূপ খননের জন্য একটা তহবিল সংগঠনের প্রস্তাব দেয়, যাতে স্মিথ নিখোঁজ থাকা অবশিষ্ট টুকরোগুলোকে খুঁজে এনে তার অনুবাদের কাজ সঠিকভাবে শেষ করতে পারেন। স্মিথের প্রত্নতাত্ত্বিক জীবন কাটছিল খুব দ্রুততার সঙ্গে। নিনেভেতে খননকাজ আরম্ভ করে বন্যায় হারিয়ে যাওয়া অসম্পূর্ণ অংশ উদ্ধারে তুমুল প্রচেষ্টা চালান তিনি। পরের বছর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশগুলো উদ্ধার করে সেগুলোকে সফলভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হন।

স্মিথ সংগৃহীত টুকরোগুলো একে একে জড়ো করতে লাগলেন। ধীরে ধীরে এটি একটি কবিতায় রূপ নেয়। সব ফলক একত্রিত হলে একসময় এটি একটি পুরো পূর্ণাঙ্গ কবিতায় রূপ নেয়; বর্তমানে যাকে আমরা আদি মহাকাব্য ‘গিলগামেশ’ বলে জানি। এ কাজটি ছিল বিশেষজ্ঞদের জন্য সম্পূর্ণ এক নতুন অভিজ্ঞতা। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ শতকে এটি রচিত। বিশ্বের প্রাচীন ও উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। এর কাহিনীপটে লেখা উপদেবতা গিলগামেশের নানা অভিযানের কথা। অমরত্ব লাভের আশায় জাহাজে আরোহণের ঘটনা। যখন ভয়াবহ প্লাবনে জলে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল সমস্ত মানবতা। ১৮৭০ সালে স্মিথ তার অনুবাদের কয়েকটি বই প্রকাশ করেন, যার বেশির ভাগই ছিল ক্যালডিয়ান ভাষায় লেখা।

স্মিথের কর্মজীবন ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত প্রাচীন স্থানগুলো ভ্রমণের প্রবল ইচ্ছা সত্ত্বেও সেখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না তিনি। খননকাজ চলাকালে দাবদাহ সৃষ্ট রোগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৮৭৬ সালের আগস্টে তার তৃতীয় অভিযানের সময় সিরিয়ায় অবস্থানকালে আন্ত্রিক রোগে আক্রান্ত হন তিনি। চিকিৎসার জন্য সহকারীরা তাকে আলেপ্পোতে নিয়ে যান। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চিকিৎসকেরা তাকে যথাযথ চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হন। যে মানুষটির তুমুল পাণ্ডিত্যে প্রাচীন ইতিহাসের অনেক অজানা ঘটনা আমাদের সামনে এসেছিল, আদি সাহিত্যের রহস্যে আমাদের ঋদ্ধ করেছিল, বাইবেলের তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করেছিল, রোগাক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে অকালে পৃথিবী থেকে তিনি চিরবিদায় নেন। (সংগৃহিত)

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2