Ads-Top-1
Ads-Top-2

রোহিঙ্গাদের রক্ষায় বিশ্ব ব্যর্থ

অ্যান্তোনিও গুতেরেস
১১ জুলাই ২০১৮, বুধবার
প্রকাশিত: 09:35:00 আপডেট: 08:18:00
রোহিঙ্গাদের রক্ষায় বিশ্ব ব্যর্থ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থি বৌদ্ধদের নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিয়ে বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্য একটি খোলা কলাম লিখেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট কলামটি প্রকাশ করেছে। নিবন্ধে সম্প্রতি বাংলাদেশের কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মুখে যে লোমহর্ষক বর্ণনা শুনেছেন, তা-িই তুলে ধরেছেন তিনি। একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা লাগবে বিশ্ববাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। পাশাপাশি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে তাদের সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন।
 
ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত গুতেরেসের কলামটির বঙ্গানুবাদ ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর পাঠকের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:
 
ছোট ছোট শিশুদের তাদের বাবা-মায়ের সামনে নৃশংসভাবে জবাই করা হয়েছে। কিশোরী ও নারীদের ধর্ষণের সময় পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অত্যাচার এবং তাদের হত্যা করা হয়েছে। গ্রামবাসীরা তাদের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে।
 
গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে গিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড এবং সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের কাছ থেকে যে লোম-হর্ষক বর্ণনা শুনেছি, তার কোনও কিছুই আমাকে প্রস্তুত করতে পারেনি।
 
তাদের বেশিরভাগই মুসলিম জাতিগত গোষ্ঠীর। তাদের একজন নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার জ্যেষ্ঠ পুত্রকে তার সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তার মাকে নৃশংসভাবে খুন হয়েছে এবং তার ঘর আগুনে ছাই করে দেয়া হয়েছে।
 
তিনি জানিয়েছেন, তিনি একটি মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু সৈন্যরা সেখানে তার খোঁজ পেয়ে যায় এবং তাকে নির্যাতন করা হয় ও কোরআন পুড়িয়ে দেয়া হয়।
 
জাতিগত নিধনযজ্ঞের শিকার হওয়া এই নির্যাতিত মানুষগুলো নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করছে। ভিকটিমদের এই যন্ত্রণা ভিজিটরদের হৃদয়কে কেবল নাড়িয়ে দিতে পারে এবং ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে। প্রায় ১ মিলিয়ন (১০ লাখ) রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর বাস্তবতা, তাদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাকে উপলদ্ধি করিয়ে দেয়।
 
রোহিঙ্গারা নির্যাতনের একটি প্যাটার্ন ভোগ করেছে - নিজস্ব দেশ মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্ব থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক মানবাধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে।
 
জনগোষ্ঠীর মধ্যে সন্ত্রাস জোরদার করার জন্য গত বছরজুড়ে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘিত করেছে। তাদের একটি ভয়ঙ্কর পছন্দ বেছে নিতে বাধ্য করা হয়েছে:  ‘মৃত্যুর ভয় নিয়ে এখানে থাক নতুবা বেঁচে থাকার জন্য সবকিছুই ছেড়ে চলে যাও’।
 
নিরাপত্তার জন্য একটি ভয়ঙ্কর যাত্রা শেষে, এই শরণার্থীরা এখন বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার শরণার্থী শিবিরে কঠোর অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে; যা স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান শরণার্থী সংকট তৈরি করেছে।
 
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেখানে সারা বিশ্বের বৃহত্তর ও ধনী দেশগুলো বহিরাগতদের জন্য তাদের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে, সেখানে দেশটির সরকার ও জনগণ রোহিঙ্গাদের জন্য তাদের সীমান্ত ও হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
 
বাংলাদেশের মানুষদের সমবেদনা ও উদারতা মানবতার শ্রেষ্ঠত্বকে প্রদর্শন করে এবং এটি হাজার হাজার জীবন বাঁচিয়েছে।
 
কিন্তু এই সংকটের প্রতিক্রিয়া অবশ্যই বৈশ্বিক হতে হবে।
 
জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মাধ্যমে শরণার্থীদের জন্য একটি বৈশ্বিক সংহতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশের মতো ফ্রন্ট লাইন দেশগুলোকে এককভাবে মানবতার এই সংকটে সাড়া দিতে না হয়।
 
যাইহোক, বর্তমানে জাতিসংঘ এবং মানবিক সংস্থাগুলি শরণার্থীদের এবং হোস্ট সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি উন্নত করতে যতটা সম্ভব একত্রে কাজ করছে।
 
কিন্তু দুর্যোগ এড়ানোর জন্য অনেক বেশি সম্পদ প্রয়োজন এবং নীতির একটি পূর্ণাঙ্গ অভিব্যক্তি প্রদান করা- যাতে শরণার্থী সংকটের দায়িত্ব বিশ্বব্যাপী ভাগাভাগি করে যায়।
 
একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার আবেদনে তাদের সহায়তায় প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার চাওয়া হয়েছে কিন্তু এর মাত্র ২৬ শতাংশ অর্থায়ন করা হয়েছে । বিশাল এই ঘাটতির অর্থ হচ্ছে ক্যাম্পে অপুষ্টি বিরাজমান থাকবে। এর অর্থ- সেখানে বিশুদ্ধ পানি এবং স্যানিটেশনের আদর্শ মান বলতে যা বুঝায় তা থেকে দূরে থাকবে । এর মানে হল আমরা উদ্বাস্তু শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করতে পারি না। শুধু তাই নয়, এর অর্থ- বর্ষার ঝুঁকি থেকে তাদের তাত্ক্ষণিক রক্ষার জন্য অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা।
 
শরণার্থীদের আগমনের পর তাদের আশ্রয়ের জন্য দ্রুত শিবির নির্মাণ করা হয়েছিল; যেগুলো এখন কাদামাটির হুমকির মুখে রয়েছে। বিকল্প সাইট খুঁজতে এবং শক্তিশালী আশ্রয়ের জন্য জরুরি ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
 
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য অনেক কাজ করা হয়েছে, তবে সঙ্কটের মাত্রাগুলির কারণে এখনও অনেক ঝুঁকি রয়ে গেছে।
 
আমি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম নিয়ে বাংলাদেশ সফর করেছি এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের হোস্টদের সহায়তায় ৪৮০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের ঘোষণায় তার নেতৃত্বকে স্বাগত জানাই। তবুও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে অনেক বেশি সাহায্য প্রয়োজন।
 
সংহতি প্রকাশই যথেষ্ট নয়; রোহিঙ্গা জনগণের প্রকৃত সাহায্যের প্রয়োজন।
 
মিয়ানমারে তারা সবাই নির্যাতন সহ্য করেছে। তা সত্ত্বেও, তারা আশা ছেড়ে দেয়নি। কক্সবাজারে আমি যেসব উদ্বাস্তুদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা আমাকে তাদের প্রত্যাশার কথা শুনিয়েছে।
 
ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া দোলনায় শুয়ানো বাচ্চাকে দেখিয়ে একজন অসহায় কিন্তু দৃঢ়প্রত্যয়ী নারী আমাকে বলেছিল, ‘মিয়ানমারে আমাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব প্রয়োজন এবং যেজন্য আমাদের বোনরা, আমাদের মেয়েরা, আমাদের মায়েরা যন্ত্রণা ভোগ করছে, আমরা তার জন্য ন্যায়বিচার চাই।’
 
এই সঙ্কট রাতারাতি সমাধান করা যাবে না। একই সময়ে, এই পরিস্থিতি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে দেওয়া যাবে না।
 
পূর্ণ অধিকার এবং নিরাপত্তা এবং মর্যাদা মধ্যে বসবাসের প্রতিশ্রুতি সহ উদ্বাস্তুদের ফেরত নেয়ার জন্য মিয়ানমারকে অবশ্যই উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।মিয়ানমারের দরিদ্র অঞ্চলগুলির মধ্যে অন্যতম এই অঞ্চলটির সব সম্প্রদায়ের জন্য কেবল পুনর্নির্মাণ ও উন্নয়নই নয়, বরং মানবাধিকারের পুনর্মিলন ও শ্রদ্ধার জন্যর একটি বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন।
 
রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মূল কারণগুলি ব্যাপকভাবে সমাধান না করা পর্যন্ত, যন্ত্রণা এবং ঘৃণা অব্যাহতভাবে সংঘাতকে উসকে দেবে। রোহিঙ্গা জনগণ ভুলে যাওয়া শিকার হতে পারে না। সাহায্যের জন্য তাদের স্পষ্ট আবেদনে আমাদেরকে অবশ্যই সাড়া দিতে হবে।
 
(ভাষান্তর: মো. রুহুল আমীন)
 
ব্রেকিংনিউজ/আরএ/এমআর

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2