Ads-Top-1
Ads-Top-2

চা শ্রমিকদের দুর্গতি শেষ হবে কবে?

আহমদ সিরাজ
২৫ জুন ২০১৮, সোমবার
প্রকাশিত: 09:26:00 আপডেট: 09:33:00
চা শ্রমিকদের দুর্গতি শেষ হবে কবে?

বাংলাদেশ শিল্প কারখানার জগতে চা শিল্প একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত শিল্প। ব্রিটিশ ভারতে, ঔপনিবেশিক শাসনের অংশ হিসেবে ব্রিটিশরা চা বাগানের পত্তন ঘটালেও চা একটি কৃষিজাত শিল্প হিসেবে গণ্য হয়ে উঠে। দেশ বিভাগের ফলে চা শিল্পেরও ভাগ হয়ে পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশেও চা শিল্পের ভাগ হয়। চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত চা শ্রমিকরাও ভাগ হয়ে পড়েন। জীবন ও জীবিকায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানের শ্রমিক নিজ মাতৃভূমি থেকে জীবিকার সন্ধানে চা বাগানে আসে, আর ফিরে যায় নি। চা বাগান হয়ে উঠে তার বেঁচে থাকার উপায়। বিরাট শিল্প শ্রমিক হিসাবে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছে বারবার, প্রতিবাদী আন্দোলনে সংগ্রামে দ্রোহে তাদের রক্ত ঝরাতে হয়েছে। সেসব ইতিহাসের অন্য অধ্যায়। 

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইতিহাসটি ঠিকমতো পাঠ করে নিলে চা শ্রমিকদের অবস্থান বুঝে নেওয়া যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে চা শ্রমিকদের অংশগ্রহণ প্রায় শতভাগ বললে অত্যুক্তি হবে না– পাক সেনাদের টার্গেটে তারা কিভাবে হয়ে পড়েছিল, তাদের জীবন দান, তাদের মৃত্যুর মিছিল থেকে জানা যায়। পাখি শিকারের মতো বাগানে বাগানে ঝাঁকে ঝাঁকে চা শ্রমিক নারী পুরুষ পাক সেনাদের হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে ৬ লাখের মতো চা জনগোষ্ঠীর অবস্থান হলেও মুক্তিযুদ্ধে তাদের দৃশ্যমান অবস্থা স্পষ্ট, উপক্ষো করার সুযোগ নেই। মুক্তিযোদ্ধের ভেতর দিয়ে চা শিল্পের আমূল পরিবর্তন হওয়া শুধু কথাই নয়। এটাই অনিবার্য হওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল।

ব্রিটিশ পাকিস্তান হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও চা শিল্পের পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটেনি। কোম্পানির শাসনে “টি এস্টেট” ঝুলানো সাইনবোর্ড এখনও দৃশ্যমান। চা বাগানের ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের মূল ব্যবস্থাপনা থেকে অনেকখানি পৃথক থেকেছে। শ্রমিকদের আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাদের নিজস্ব সংগঠন গঠিত হয়। বিট্রিশ পাকিস্তান আমলে এরই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এখন চা শ্রমিক ইউনিয়ন হিসেবে একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠিত আছে। শ্রমিকদের জানমাল, স্বার্থ ইত্যাদি ইউনিয়ন দেখভাল করে। বলা চলে সর্বহারা শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন হলেও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে রাজনীতির বলয় ধারা প্রবাহিত থাকে, তার স্বভাব-প্রভাবও এই সংগঠনকে প্রবাহিত করে। এই জনগোষ্ঠীর মানুষ তাদের নিজস্ব ইউনিয়ের ভোটের বাইরেও রাষ্ট্র পরিচালিত স্থানীয় নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচনেও ভোটার হিসেবে গন্য হওয়ায় ক্ষমতার রশি টানাটানিতে বিবেচ্য থাকে। 

স্বাধীন বাংলাদেশে চা শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। এতে শ্রমিকদের ক্ষোভ দ্রোহ বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে রাজেন্দ্র বোনার্জির হাতে পড়লে এই ইউনিয়ন নির্বাচনের মেয়াদ উত্তীর্ণ অবস্থায় দীর্ঘদিন স্বেচ্ছাচারি কায়দায় পড়ে থাকে। গড়ে উঠে চা শ্রমিক যুবক তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলন। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে রামভজন কৈরীর নেতৃত্বে এই আন্দোলন একটা সর্বাত্মক রূপ নিলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে নানা বাধা-বিপত্তির পরেও রামভজন কৈরীর নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত হয়ে, চা শ্রমিক ইউনিয়ন পরিচালিত হতে থাকে। 

স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আগামী ২৪ জুন ২০১৮ চা শ্রমিক নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও এই নির্বাচনও বিলম্বে অনুষ্ঠানের অভিযোগ উঠে। সব চেয়ে বড় প্রশ্ন একমাত্র সংগঠিত সংগঠন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন যার ভেতর দিয়ে সরকার, মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিকদের সামগ্রিক স্বার্থের বোঝাপড়া হয়, সেই সংগঠনটি বারবার শ্রমিক স্বার্থের বাইরে চলে যায় যদি, তাহলে শ্রমিকদের ভরসা রাখার জায়গা থাকে না। পরিণতিতে যে আস্থাহীনতার জন্ম দিবে–“যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ” প্রবাদ বাক্যের মতো হয়ে উঠে। 

বর্তমান নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৩টি পক্ষ গড়ে উঠেছে–এগুলো হচ্ছে রামভজন-মাখন লাল এর নেতেৃত্বে “সংগ্রামী”, ২য় টি গীতা কানু, স্বপন গোয়ালা, স্বপন সাওতাল এর নেতৃত্বে “মহাসংগ্রামী” ও ৩য় টি বিজয় বুনার্জির নেতৃত্বে “শ্রমিক ঐক্য”। নির্বাচনে এই তিনপক্ষের মধ্যে নির্বাচনী লড়াই অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে এরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইতিবাচক। 

কিন্তু কথা হচ্ছে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের ভেতর দিয়ে ইউনিয়নের নেতৃত্ব গ্রহণকারী রামভজন কৈরীর সংগ্রামী পক্ষের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ নামা উত্থাপন হয়েছে এবং এগুলো নিয়ে সরকারের মন্ত্রণালয়ে উত্থাপন করে অভিযোগ দাখিল করে বিচার দাবী করেছে এবং ধারাবাহিকতার অংশ হিসাবে “দুদকের” শরণাপন্ন হয়ে কোটি কোটি টাকা লোটপাটের অভিযোগ করেছে। তা কেবল বিস্ময়কর নয়, অদ্ভুতও বটে। তাদের কতিপয় অভিযোগ যেমন: 

শ্রীমঙ্গল ছাত্রাবাস নির্মাণের নামে দুর্গাপূজা ও লাল পূজার বোনাস হতে ২০ টাকা হিসাবে ৪০ টাকায় ৯৫ হাজার শ্রমিকের কাছ থেকে ৩৮ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। ২০১৪ সালে নির্বাচনের খরচ এর নাম করে ৯৫ হাজার শ্রমিকের কাছ থেকে ৪০টাকা হিসাবে ৩৮ লক্ষ টাকা আদায়ে আত্মসাতের অভিযোগ। ২০১৪ সালে লেবার হাউস সংস্কারের নামে ৯৫ হাজার শ্রমিকের কাছ থেকে ৫৭ লক্ষ টাকা আদায় করে আত্মসাতের অভিযোগ। কোন এজিএমের সিদ্ধান্ত ছাড়াই ইউনিয়নের চাঁদা ৫টাকা বাড়ানো হলেও গত ৩ বছরে আদায়কৃত ভ্যালী চাঁদা ৫ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা শ্রমিকের উন্নয়নে ব্যয় না করে অস্বাভাবিক ব্যয় দেখিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। 

২০১৪ সালে সম্বর্ধনার নাম করে ৯৫ হাজার শ্রমিকের কাছ থেকে ১০ টাকা হারে চাঁদা নিয়ে খরচ না করে ৯ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ । ২০১৫ সালে চা শ্রমিক নেতার নামে গাড়ি কেনার নামে ৯৫ হাজার শ্রমিকের কাছ থেকে ১ দিনের মজুরি ৮৫ টাকা হারে ৮০ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা থেকে সম্পাদকের জন্য একটি গাড়ি কিনে বাকী টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। 

এ ছাড়াও নানা অভিযোগ রয়েছে- অভিযোগের সত্য, মিথ্যা ও তদন্ত ও প্রমাণসাপেক্ষ হলেও আমাদের কথা হচ্ছে একটা সংগ্রামী সংগঠন ইউনিয়নের ক্ষমতা গ্রহণের পর যেসব অভিযোগ দ্বারা অভিযুক্ত হয়েছে এবং তা লিফলেট আকারে হাজার হাজার শ্রমিকের কাছে পৌঁছে গেছে, তেমনি সরকারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। নির্বাচনকে সামনে যারা এই অভিযোগ নামা উত্থাপন করেছে তারাও প্রতিদ্বন্দ্বী। এ হিসাবে তারা দায়িত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। বাতাসে ছুড়ে দেওয়া অভিযোগ হলে কান না পেতে চোখে না দেখলেও চলে, কিন্তু তা নির্বাচনের অংশ হয়ে উঠাতে শ্রমিকের স্বার্থকে বিবেচ্য করে তুলেছে। 

আমাদের বক্তব্য হচ্ছে দীর্ঘকাল ধরে চা শ্রমিক অবহেলা বঞ্চনার শিকার হয়েছে। সরকার বা মালিকপক্ষের কাছ থেকে তারা যে সুযোগ সুবিধাটুকু আদায় করে তাও যদি বিভিন্ন চাঁদা আদায়ের নামে তাদের স্বার্থে না লেগে নেতাদের পকেটে চলে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠে, তাহলে এমন ইউনিয়নের দরকার কি– গভীরে গিয়ে এসব বিষয় মূল্যায়ন করা দরকার। 

তা হলে চা শ্রমিক ইউনিয়ন সংগঠন চাঁদাসর্বস্ব সংগঠন হিসাবে চা শ্রমিকের মাঝে যে হতাশা ক্ষোভের জন্ম দিবে তার পরিণতি এই সংগঠনের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলতে পারে। বিষয়টি এখনই ভেবে দেখার দরকার। (লিখা: সংগৃহিত)

লেখক: রাজনীতিক ও কলামিস্ট


ব্রেকিংনিউজ/এমআর

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2