শিরোনাম:

কাজিয়া ইতিমধ্যে আর ইতোমধ্যের

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
৯ জুন ২০১৮, শনিবার
প্রকাশিত: 12:10 আপডেট: 3:48
কাজিয়া ইতিমধ্যে আর ইতোমধ্যের <br />

ইতি শব্দের মূল অর্থ ‘এই’ বা ‘এই প্রকার।’ সংস্কৃত ইতঃ মানেও এই বা এই প্রকার। কিন্তু চিঠির শেষে ‘ইতি’ লেখার প্রচলন থেকেই ভুলক্রমে ‘ইতি’ শব্দের অর্থ ‘শেষ’ হয়ে গেছে এবং তা গৃহীতও হয়েছে (পড়ল ঘুমের দফায় ইতি- দ্বিজেন্দ্রলাল রায়)। 
 
প্রকৃতপক্ষে চিঠির শেষে ‘ইতি’ লাগানো হতো ‘এই’ অর্থে। এটা দিয়ে বোঝাতো ‘এই পর্যন্ত, আর নয়’।
 
সংস্কৃতেও এটার সাক্ষ্য মেলে। যেমন ‘ইতি উপক্রমণিকা সমাপ্তা’ ‘ইতি ত্রিকাণ্ড শেষ’; ‘ইতি অব্যয়বর্গ: সমাপ্ত’। এই কথা কয়টিতে ‘ইতি’ মানে ‘শেষ’ নয়। বরং ‘সমাপ্তা’, ‘শেষ’ ও ‘সমাপ্ত’ মানে শেষ।
ইতি শব্দের অর্থ যে প্রকৃতপক্ষে ‘শেষ’ নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘ইতিমধ্যে’ আর ‘ইতিপূর্বে’ শব্দ দুটির মাঝে।
 
ইতি অর্থ এই, ইহা (ইতিকর্তব্য)। ইতিউতি মানে এদিক সেদিক (ধীরে ধীরে যায়, ইতিউতি চায়, ধীর- মন্থরগামিনী)।
 
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বিশেষত চট্টগ্রামে হালচাষের সময় গরুকে বামে যাবার ইঙ্গিত দিতে কৃষকরা ‘ইতি ইতি ইতি’ শব্দটি বলে। জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে উপন্যাসটিতেও এ প্রসঙ্গটা এসেছে (হঠাৎ গান থামিয়ে টান দিল মন্তু: ইতি ইতি ইতি চল)।
 
ইতিউতি মানে এদিক সেদিক (উড়ে ইতিউতি উতালা আকুতি উসখুস উকিঝুঁকি, উড়ে উচাটন, উডু উড়ু মন, উদাসে উধ্বমুখি- শ্রীশ্রীবর্ণমালাতত্ত্ব, সুকুমার রায়)।
 
যাইহোক, কেউ কেউ ইতিমধ্যে আর ইতিপূর্বের পরিবর্তে ‘ইতোমধ্যে’ ও ‘ইতঃপূর্বে’ চালুর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। এটা নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। কারণ এসব শব্দকে সংস্কৃতের নিক্তি দিয়ে মেপে ঠিক করতে গেলে ‘নিন্দুক’, হিংসুক, ‘অবহেলা’, ‘সহায়ক’, ‘পদাতিক’ ‘দশমিক’সহ অনেক শব্দই শুদ্ধ করে নিতে হবে। কারণ সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী এসব শব্দ হবে যথাক্রমে ‘নিন্দক, হিংসক, অবহেল, সাহায়ক, পাদাতিক, দাশমিক।
 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনীতিকুমার, ললিতকুমার আর ক্ষিতিশচন্দ্রের মতো প্রাজ্ঞরা ‘ইতিমধ্যে’ আর ‘ইতিপূর্বে’ মেনে নিয়েছেন। ক্ষিতিশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শব্দকথা প্রথম আশ্বাস’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৬ সালে। বইটিতে তাঁর মত একজন সত্যিকারের সংস্কৃত পণ্ডিত লিখেছেন, ‘ইতিপূর্বে, ইতিমধ্যে প্রভৃতি প্রামাদিক বটে, কিন্তু এস্থলে প্রমাদ গুরুতর নহে আর পদগুলি ভাষায় বেশ চলিয়া গিয়াছে। এইগুলিকে বর্জন করিয়া পাণ্ডিত্যগন্ধী উৎকট ইতঃপূর্ব ও ততোহধিক উৎকট ইতোমধ্যকে ভাষার রাজ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিবার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে বলিয়া মনে হয় না। ইতি শব্দ যখন নিপাত, আর মহর্ষি যাস্কই যখন বলিয়াছেন, উচ্চাবচেস্বর্থেষু নিপতন্ত্রীতি নিপাতাঃ তখন উহা স্বচ্ছন্দে ইতঃ শব্দের অর্থ প্রকাশ করিতে পারে। দুরাগ্রহের ফল সাধারণত ভাল হয় না, এ স্থলেও ইতঃপূর্বে ভূমিষ্ট থুড়ি পত্রস্থ হইবার অল্প দিন পরেই ইতোমধ্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া ইতোপূর্বের হইয়া গেল। এখন বল মা তারা দাঁড়াই কোথায়?’ (১১৮ পৃষ্ঠা)।
 
সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মানুযায়ী শব্দটিকে ভুল দাবি করে ইতঃপূর্বে বা ইতোপূর্বে চালুর জন্য এখন আর আপত্তি জানিয়ে লাভ নেই। বরং শব্দটিকে বাংলা ধরে নিলেই ঝামেলা আর থাকে না। কারণ ভাষার গতিকে রোধ করা বেশ কঠিন। শুদ্ধই হোক আর অশুদ্ধই হোক, শব্দটি এখন চলছে এবং চলবে।
 
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত লেখকরা সাবলীলভাবেই ‘ইতিপূর্বে’ লিখে গেছেন (পীর সাহেবের ভাত ভাটিবার কসরত দেখার সুযোগ ইতিপূর্বে এমদাদের হয় নাই- আবুল মনসুর আহমদ; এমন শৌখিন নাম ইতিপূর্বে কখনও শোনা যায় নাই- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
 
জ্যোতিভূষণ চাকী তাঁর বাগর্থকৌতুকীতে লিখেছেন ‘ইতিপূর্বে ইতিমধ্যে দোষ করল কী? আর এই দুটি শব্দই তো ব্যাকরণসম্মত। ইতি’র মধ্যেই ‘ইত’ লুকিয়ে আছে।’
 
রাজশেখর বসুর চলন্তিকা অভিধানে ‘ইতিপূর্বে’ ও ‘ইতিমধ্যে’-কে ‘অশুদ্ধ প্রয়োগ’ হিসেবে চি‎হ্নিত করা হয়েছে। শব্দ দুটির শুদ্ধরূপ হিসেবে দেখানো হয়েছে যথাক্রমে ‘ইতঃপূর্বে’ ও ‘ইতোমধ্যে’।
 
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস ইতিপূর্বে ও ইতিমধ্যের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে ‘ইতোপূর্বে’ ও ‘ইতঃমধ্য’-কে ঠাঁই দিয়েছেন। তবে হরিচরণের বঙ্গীয় শব্দকোষে ‘ইতিপর্বে’ নেই, ‘ইতিমধ্যে’ আছে।
 
ব্রেকিংনিউজ/জিসা
 

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2