Ads-Top-1
Ads-Top-2

সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথম শ্লোক পাখি নিয়েই

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
৮ জুন ২০১৮, শুক্রবার
প্রকাশিত: 11:22:00

মহাকবি বাল্মিকী একদিন স্নান করতে গিয়ে দেখলেন, একজন শিকারি দুটি উড়ন্ত পাখির একটিকে তীরবিদ্ধ করে মেরে ফেলেছে। আর অন্য পাখিটি ঘুরে ঘুরে এমন চিৎকার করতে লাগল যে মনে হলো- সে যেন কাঁদছে। সেই দৃশ্য দেখে কবির মুখ থেকে আচমকা এক শ্লোক বেরিয়ে এলো, যে রকম কাব্যভাষা তিনি আগে কখনো ব্যবহার করেননি। তিনি ব্যাধকে অভিশাপ দিলেন: ‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতমঃ’ ইংরেজি তর্জমায় লাইন দুটির মানে এ রকম দাঁড়ায়: You will find no rest for the long years of Eternity, for you killed a bird in love and unsuspecting.
 
এটিই সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথম শ্লোক। শোক থেকে শ্লোক। নিহত পাখির শোক থেকেই উৎসারিত বাক্য বলেই ‘শ্লোক’। তাই আদি শ্লোকের রচয়িতা বলেই বাল্মিকী আদিকবি।
অন্যদিকে মদন মোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’ পুস্তিকাটির প্রথম পঙ্ক্তিটিই পাখিকে নিয়ে ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল।’
 
বাংলা সাহিত্যেও পাখির প্রতীকী অর্থ কবি ও সাহিত্যিকের ভাবনায় নানা সময়ে নানা মাত্রা পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বলাকা’কে গতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
 
অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় শঙ্খচিল, সোনালী চিল, সিন্ধু সারস, পেঁচা, শালিক, দোয়েল এসেছে নানা অনুষঙ্গে, নানা ব্যঞ্জনায়। এখানেই শেষ নয়, তিনি পাখির নীড়ের মতো চোখের যে উপমা ‘বনলতা সেন’ কবিতায় টেনেছেন, সেই শান্তির নীড় আর তার হৃদয়ের সবটুকু চাওয়ার কামনা এখনো কিংবদন্তি।
 
আবার লালন ফকিরের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’র ব্যঞ্জনাময় প্রসঙ্গটি আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানে ও কবিতায় রয়েছে অসংখ্য পাখির উপস্থিতি। বাগিচায় বুলবুলি কিংবা বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে অথবা ডাকে পিউ কাঁহা পাপিয়া ইত্যাদি তার গানেরই পরিচিত পঙ্ক্তি। আর একটি কাব্যগ্রন্থের নামও ‘চক্রবাক’।
 
পৌরাণিক সাহিত্যে দেব-দেবী কিংবা নায়ক-নায়িকাকে পাখিরূপ ধারণ করতে দেখা যায় অহরহ। হোমারের ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যে ঈগল পাখির কথা আছে। আর আলাওলের শুকপাখি তো কিংবদন্তি হয়ে আছে। পবিত্র কোরআন শরীফে আবাবিল পাখির কথাও রয়েছে। পাপাত্মা আবরাহা কাবা শরীফ আক্রমণ করলে ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি এসে তাকে প্রতিরোধ করে। প্রাচীন মিসরীয় দেবতা আইডিসের মাথা পাখির, শরীর মানুষের।
 
কবি আল মাহমুদ তার ‘তারিকের অভিলাষ’ কবিতায় কতই না আবেগভরে লিখেছেন-
 
‘একবার পাখিদের ভাষাটা যদি
শেখাতেন সোলেমান পয়গম্বর
জানতাম পাতাদের আড়ালে তারা
খড় দিয়ে কেন গড়ে ঘর সুন্দর।’
 
এভাবেই কবিকুল নানা প্রতীকময়তায় নানা অর্থে পাখিকে তুলে এনেছেন তাদের কবিতায়। পাখি তাদের কাছে কখনো প্রেমিকার নানা অনুষঙ্গ, কখনও গতির তুল্য, কখনও জীবন প্রণালীর বিষয়।
 
পাখি প্রকৃতপক্ষে পালক ও পাখাবিশিষ্ট প্রাণী। কিছু পতঙ্গ ও বাদুড়ের পাখা থাকলেও কেবল পাখিদেরই পালক আছে। অধিকাংশ পাখি উড়তে পারে। তবে উড্ডয়নে অক্ষম পাখিগুলোও উড়তে সক্ষম পূর্বপুরুষের বিবর্তনের ফসল।
 
ইতিহাসের পাতায় পরিযায়ী পাখিদের নিয়ে সবচেয়ে পুরনো যে তথ্য পাওয়া যায় তা হচ্ছে তিন হাজার বছর আগের। এসব তথ্যে দেখা যায়, গ্রিসের হেসিয়ড, বিখ্যাত কবি হোমার, ইতিহাসবিদ হেরোদুতাস, দার্শনিক এরিস্টটলসহ আরো অনেকেই পরিযায়ী পাখি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতেন।
 
আবার পাখির কঙ্কাল বিজ্ঞানীদের ভীষণ ভাবায়। কারণ এগুলো প্রকৃতিগতভাবে বিস্ময়কর। এগুলোর লঘুভার, প্রকৌশল বৈশিষ্ট্য আর কাঠামোগত সৌকর্যে বিজ্ঞানীদের কাছে চিন্তার খোরাক থাকে। কারণ এসব বৈশিষ্ট্য পাখির দৈহিক শক্তির সঙ্গে দেহের লঘুভারের অপূর্ব সমন্বয় ঘটায়।
 
পাখির ডানার পালকও প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়। এই পালকই এদের যোগ্য নভোচারী বানায়। গঠন কাঠামোর দিক থেকে পালকগুলো অতিশয় হালকা হলেও খুবই মজবুত। অন্যদিকে পালকের অগ্রভাগ বেশ নমনীয় হলেও দৃঢ়। তাই পাখি এত ভালো উড়তে পারে। এসব পালকে যেসব সূত্রতন্তু থাকে, সবগুলো ফলা থেকে জ্যামিতিক কর্ণের মতো তির্যক প্রকৃতির।
 
পাখির গান আমাদের কাছে টানে। এর চেয়ে বেশি টানে এটার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। পুরুষ পাখির বেলায় এই সৌন্দর্য স্ত্রী পাখিদের কাছে যৌন আকর্ষণের বড় বিজ্ঞাপনও বটে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্য সুন্দরতম পালকের পাখিকে মূল্য দিতে হয় অনেক। কারণ দেখতে যত সুন্দর ও যৌন উদ্দীপকই হোক, ওড়ার বেলায় এরা ক্ষীণ শক্তির হয়। অথচ টিকে থাকার লড়াইয়ে উড়তে পারাটাই মূল কথা।
 
ব্রেকিংনিউজ/জিসা
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2