Ads-Top-1
Ads-Top-2

শান্তিনিকেতনে ‘অশান্তির’(?) আলাপ

শওকত মাহমুদ
৮ জুন ২০১৮, শুক্রবার
প্রকাশিত: 11:05:00 আপডেট: 12:34:00

এ কী করল আনন্দবাজার পত্রিকা! বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে তার একান্ত কথোপকথন নিয়ে প্রকাশিত পত্রিকাটির রিপোর্ট রীতিমতো অপমানজনক। পত্রিকাটি কিভাবে জানল একান্ত কথাবার্তা? শেখ হাসিনা নাকি নরেন্দ্র মোদির কাছে প্রতিদান প্রার্থনা করেছেন। হোক না আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিনা ভোটের। তাতে কী? এভাবে নিচে নামিয়ে দেয়া কি ‘আনন্দবাজার’-এর ঠিক হলো?

এই ঐতিহাসিক পত্রিকাটির দ্বাদশ বর্ষে পদার্পণকালে ১৯৩৩ সালের ১২ মার্চ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক আশীর্বাণী দিয়েছিলেন। তার উপদেশ ছিল এমন- ‘তোমার লেখনী যেন ন্যায়দণ্ড ধরে/ শত্রু মিত্র নির্বিভেদে সকলের পরে/ স্বজাতির সিংহাসন উচ্চ করি গড়ো/ সেই সঙ্গে মনে রেখো সত্য আরো বড়ো। স্বদেশের চাও যদি আরো ঊর্ধ্বে ওঠো/ কোরো না দেশের কাছে মানুষের ছোটো/ দেশকে তুলতে গিয়ে অন্যকে ছোটো’ না করার পরামর্শ আনন্দবাজার মানেনি। না মানার ঢের উদাহরণও আছে।

রবীন্দ্রনাথ হয়তো সন্দেহ করেছিলেন, এই পত্রিকা সীমানার বাইরে যেতে পারে। সে জন্য ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র ঊনবিংশ বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে কবি একটি দীর্ঘ বাণী দিয়েছিলেন- ‘নববর্ষে আনন্দবাজার পত্রিকার অভিনন্দন করি। সেই সঙ্গে এই কামনা করি যে, বাংলাদেশে সর্বজনপাঠ্য সংবাদপত্রের যে প্রধান কর্তব্য তাহা যেন এই পত্রিকার দ্বারা সম্পন্ন হইতে পারে। বাঙ্গালীকে আত্মবিস্মৃত জাতি বলা হইয়াছে। বস্তুত বাঙ্গালী আত্মঘাতী জাতি। তীব্র অহমিকার উত্তেজনায় আমরা পরস্পরকে আঘাত করিতে সর্বদাপ্রস্তুত। এই ব্যক্তি ব্যক্তিগত বিরুদ্ধতার আঘাত সমস্ত দেশের মর্মস্থানকে বিক্ষত করিয়া তাহার প্রাণশক্তিকে নিরন্তর ক্ষয় করিতে থাকে অন্ধ আবেগে, এ কথা আমরা মনে রাখি না। এই কর্মশালা ভেদবুদ্ধির সর্বনাশা বিস্তারে সমস্ত ভারতবর্ষের সভায় বাঙ্গালীর আসন আজ সঙ্কীর্ণ ও অসম্মানিত। পরস্পর সম্মিলনের ক্ষমাপরায়ণ ধৈর্যশীল সমবায় শক্তির দ্বারাই বাঙ্গালী ক্রমপরিবর্ধমান দুর্গতি হইতে আপনাকে রক্ষা করিতে পারিবে- অন্য উপায় নাই। আমাদের সংবাদপত্রগুলি এই উদার মিলনের পথে বাঙ্গালীকে উৎসাহ না দিয়া যদি তাহার বিচ্ছেদ সাধনের প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিতে থাকে, তবে তাহার পরাভব নিঃসংশয়িত। এই অসংযত আত্মবিনাশমত্ততা হইতে বাঙ্গালীকে রক্ষা করিবার ব্রত গ্রহণ করুক, আনন্দবাজার পত্রিকাকে দুর্ভাগ্যগ্রস্ত বাংলাদেশের হইয়া এই আমার নিবেদন জানাইতেছি।’

বাংলাদেশ ও ভারতের সংবিধানে, বোধহয় আর কোনো দেশের সংবিধানে নেই। সংবাদপত্র, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা প্রশ্নে কতগুলো শর্ত আছে। এর মধ্যে একটি হলো বৈদেশিক সম্পর্ক সম্বন্ধীয়। এমন কিছু লেখা বা প্রচার করা যাবে না, যেন বৈদেশিক বা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আঁচড় লাগে। এটা সাংবাদিকেরা সহজে মানেন না, মানলে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বলে কিছু থাকে না। যেমন- মিয়ানমারের সাথে সরকার গোপন পিরিত করলেও সাংবাদিকেরা তো অসভ্য মিয়ানমারকে ছেড়ে কথা কইবে না; কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ দিক দিয়ে টনটনে। পারলে বিদেশ ভ্রমণরত সাংবাদিকদের নজরদারিতে রাখার জন্য নোটিশ জারি করে বসে। এমনকি প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মধ্যেও বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়টি ঢুকিয়ে রেখেছে। শুধু ভারতকে মিডিয়া প্রটেকশন দিতেই হয়তো এমন ব্যবস্থা। সীমান্তে বিএসএফ গুলি করে বাংলাদেশী হত্যা করলে আমরা আগেভাগে বলা শুরু করি- ও তো চোরাচালানি ছিল। ভারতে কোথাও দাঙ্গায় মুসলমান খুন হলে আমরা খবরটিকে আড়াল করে ফেলতে চেষ্টা করি। এখন অবশ্য বাংলাদেশে অনেক সাংবাদিক ভারতপ্রেমে এমনিতেই মশগুল।

যাকগে, ‘আনন্দবাজার’-এর যে রিপোর্ট নিয়ে আজকের লেখা, এটি সংক্ষেপে পড়ে নিলে ভালো। পত্রিকাটির রিপোর্ট বলছে- ‘দিয়েছেন অনেক, প্রতিদানে এবার সহযোগিতা চান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’

শুক্রবার শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে একান্ত বৈঠকে এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধনের পর সেখানেই মোদির সাথে বৈঠকে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তার সরকার উত্তর-পূর্বের জঙ্গিদের দেশছাড়া করছে, ট্রানজিট দিয়েছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বরাবর দিল্লির পাশে থেকেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের বছরে এবারো তাই ভারতের সহযোগিতা চান। ‘আনন্দবাজার’ আরো বলেছে, মোদির সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনি কী বলেছেন, উপদেষ্টাদের সাথে আগেই আলোচনা সেরে এসেছিলেন শেখ হাসিনা। তার দফতরের এক সূত্র জানায়, হাসিনার বার্তা- মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে সরাতে বাংলাদেশকে ফের পাকিস্তান বানানোর চক্রান্ত চলছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালে পশ্চিমে আর পূর্বে দুই দিকেই পাকিস্তান নিয়ে ঘর করতে হবে ভারতকে। তাই ভারতের উচিত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারই যাতে ক্ষমতায় ফেরে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

এই রিপোর্ট মোতাবেক শেখ হাসিনা তিস্তার পানি নিয়ে কথা বলেননি, রোহিঙ্গা সমস্যার কথা চেপে গেছেন। শুধু তার প্রধানমন্ত্রিত্বে থেকে যাওয়ার জন্য ভারতের প্রতিদান কামনা করেছেন। ‘আনন্দবাজার’ সঠিক বলেনি বলেই বিশ্বাস করতে চাই। বাংলাদেশের এক সূত্রের উদ্ধৃতিতে এমন খবর ছেপে দিয়েছে, তা-ও একান্ত বৈঠকের সংলাপ নিয়ে। সাধারণত দুই সরকার প্রধানের কথাবার্তার সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন করে নোট লেখক থাকেন, কিন্তু একান্ত বৈঠকে থাকেন না। সেখানে কী কথা হয়েছে, দু’জন ছাড়া কারো জানার নয়। কিন্তু রিপোর্টটি অবিশ্বাস করার যুক্তিও পাই না। কারণ, বাংলাদেশ সরকার এর প্রতিবাদ করেনি। আর দেখলাম, শেখ হাসিনা তিস্তার ব্যাপারে নীরব, মোদি নির্বাক রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি কোনো প্রতিদান চাননি। শুধু ভারতকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, তিনি ভারতকে কতটুকু দিয়েছেন। কিন্তু কোন আলাপের কারণে শেখ হাসিনাকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হলো? এমনি এমনি তো শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের অবদান বলতে যাননি। অবদান স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর মোদি নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করেছেন- ‘এতনা বাত কিও বোলা’, আর আনন্দবাজার পত্রিকার রিপোর্টের প্রতিবাদও কিন্তু তিনি করেননি।

বাংলাদেশ ও ভারতের দুই সরকারপ্রধানের একান্ত বৈঠক নিয়ে এর আগেও ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে ছোট করার অপপ্রয়াস দেখেছি। সালটি মনে নেই, তবে জেনারেল এরশাদের আমলে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। উড়িরচর অথবা বন্যাজনিত একটা বড় দুর্যোগ বাংলাদেশে হয়ে গেছে। ভারত ছয়টি সামরিক হেলিকপ্টার দিয়ে আমাদের সহায়তা করেছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখা গেল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নির্দেশে এরশাদের জানার আগেই ওই ছয় কপ্টারকে ভারতে চলে যেতে বলা হলো। এ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপড়েন সৃষ্টি হলো। এ অবস্থায় এরশাদের দিল্লি সফর। আনুষ্ঠানিক ও একান্ত বৈঠক হলো। হঠাৎ করেই ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে দেয়া হলো, হেলিকপ্টার ফেরতের ঘটনায় এরশাদ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। খবর বিশ্বস্ত সূত্রের।

এই খবরে তো ঢাকায় সেনানিবাসে উত্তেজনা। এমনিতেই এরশাদের বদনাম ভারতের লোক হিসেবে। দিল্লি থেকে ফেরার পর তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডের বাসায় প্রেস ব্রিফিংয়ের জন্য সাংবাদিকদের ডাকা হলো। তথ্য বা সেচমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদও আছেন। মন্ত্রীদ্বয় সাংবাদিকদের বললেন, ‘ওটা ভারতীয় মিডিয়ার বানানো খবর। এরশাদ ক্ষমা চাননি।’ সাংবাদিকদের মধ্যে সংসদের রিপোর্টার হিসেবে আমিও ছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, একান্ত বৈঠকে এরশাদ ক্ষমা না চাইলে কি এমনি এমনি খবর বের হলো? উনি যদি একান্ত ক্ষমা চেয়েই থাকেন, আপনারা কি দেখেছেন? খবরটা চাউর হতেই আপনারা এর প্রতিবাদ করছেন। দুই মন্ত্রীর বক্তব্য- ভাই, এত কিছু জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। ক্যান্টনমেন্ট গরম। আপনারা শুধু এ খবরটি ছেপে দিন যে, ভারতীয়দের ওই খবর ঠিক না। তদানীন্তন প্রধান তথ্য কর্মকর্তা আবদুস সোবহানের কী কাতর অনুরোধ।

এক রসিকজনের পর্যবেক্ষণ হলো, শেখ হাসিনা তো বিএনপির বলা কথাই মোদিকে বলেছেন। বিএনপি হামেশাই অভিযোগ করছে, শেখ হাসিনা ভারতকে বহু কিছু দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ভারত সে তুলনায় বাংলাদেশকে কিছু দেয়নি। এর জবাব দিতে পারেনি আওয়ামী লীগ- বিএনপির ওই অভিযোগকে স্বীকৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা নিজের মতো করে নরেন্দ্র মোদিকে বলেছেন। প্রতিদানে হয়তো বাংলাদেশ নয়, তাকে ব্যক্তিগত প্রতিদান দিতে বলেছেন।

একটু পিছিয়ে যদি দেখি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কিছু দিন আগে দলীয় এক প্রতিনিধিদল নিয়ে দিল্লি ঘুরে এসেছিলেন। দেশে ফিরেই বললেন, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ভারত অতীতেও নাক গলায়নি, ভবিষ্যতেও গলাবে না। ওই বক্তব্যে ঝড় উঠল- আপনি বলার কে? ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না। অথচ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার বইয়ে (দি কোয়ালিশন ইয়ার্স) বিস্তারিত বলেছেন, কিভাবে সাবেক সেনাপ্রধান কুখ্যাত মইন উদ্দিনের সাথে আলোচনা করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জেতাতে তিনি কী কাণ্ড করিয়েছেন। ২০১৪ সালে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসে বিতর্কিত ভোটে অংশ নিতে দেনদরবার করেছিলেন বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোকে।

তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ তার বইয়ে (দি আদার সাইড অব দ্য মাউন্টেইন) এ কথা উল্লেখ করেছেন। অতএব, ভারতের সরকার নির্বাচনে নাক গলায়নি, এটা সত্য নয়। এবার ভারত সফরের আগে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেই বসলেন, ভারত চাইলে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ কেমন কথা। একটা স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন নিয়ে কেন কথা হবে। ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, আমাদের ভোট নিয়ে ভারত কিছু করতে চায় না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন, তার মর্মার্থ হলো, ভারত চাইলে আমাদের স্বার্থে নাক গলাতে পারে। আনন্দবাজার-এর খবর যদি সঠিক হয়, শেখ হাসিনা নিজে ও তার মন্ত্রীরা ভারতকে বাংলাদেশের নির্বাচনে টেনে আনতে চাইছেন। ভারত ছাড়া আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করছেন? আবার অশান্তির আয়োজন? জনগণের ওপর আস্থা নেই। ভারত কী করবে এবার?

বাংলাদেশে চলমান একদলীয় শাসনে আরেক প্রস্ত বিস্তারে কংগ্রেসের মতো বিজেপি সরকারও কি হামাগুড়ি দেবে?

লেখক: জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2