Ads-Top-1
Ads-Top-2

খোয়ারিজমির ‘শূন্য’ ছাড়া বিজ্ঞান অচল

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
৭ জুন ২০১৮, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: 09:45:00

শূন্য বড়ই অদ্ভূত সংখ্যা! ধনাত্মকও নয়, ঋণাত্মকও নয়। আবার কোনো সংখ্যার সঙ্গে এটা যোগ করলে অথবা বিয়োগ করলেও সংখ্যাটিতে কোনো পরিবর্তন আসে না। কিন্তু কোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে গুণ করতে ফল শূন্য ছাড়া আর কিছুই হয় না। অথচ শূন্য দিয়ে কোনো সংখ্যাকে ভাগ করা যায় না। আবার শূন্যের বর্গমূলও হয় না।
 
অথচ সংখ্যার মর্যাদা পেতে এই নিরীহ গোবেচারা ‘শূন্য’কে কতই না বিশাল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। গণনার সময় সৃষ্টি হওয়া নানা সমস্যা থেকেই শূন্য এক সময় অস্তিত্বশীল হতে থাকে। এজন্যেই বিভিন্ন সময়ে শূন্যনির্দেশক নানা চিহ্ন ব্যবহৃত হতে দেখি আমরা। এখন আমরা জানি, সাধারণভাবে ‘শূন্য’ দুটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়- স্থানীয় মান সংখ্যা ব্যবস্থায় বিভিন্ন অঙ্কের যথাযথ অবস্থান নিশ্চিত করার জন্যে এবং স্বকীয় সংখ্যা হিসাবে। প্রথম ক্ষেত্রটিই মূলত মানুষের শূন্য নিয়ে চিন্তা করার প্রধান কারণ ছিল। অর্থাৎ সংখ্যার মাঝে শূন্যস্থান পূরণ করার চিন্তা থেকেই শূন্য নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়।
 
শূন্য নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে অনেকেই অনেক চিন্তা করেছে। তবে প্রাথমিক দিকেই শূন্যের প্রচলন আর বিকাশে ব্যবিলনীয়দের কিছু নমুনার উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেকেরই ধারণা, স্থানীয় মান সংখ্যা পদ্ধতি প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনের তাগিদে শূন্যস্থানজ্ঞাপক হিসেবে শূন্যের আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, ব্যবিলনীয়রা হাজার বছরের বেশি সময় ধরে তাদের নিজস্ব স্থানিক মূল্যমান সংখ্যা পদ্ধতি ব্যবহার করত, যাতে সরাসরি শূন্যের কোনো ব্যবহার দেখা যায় না।
 
মিশরীয়রা স্থানীয় মান পদ্ধতি নয়, বরং পৃথক পৃথক প্রতীক দিয়ে বিরাট বিরাট সংখ্যা প্রকাশ করত। তবে তারা ন-ফ-র নামে একটি চিহ্ন গণনার সময় ব্যবহার করত, যা সম্ভবত তাদের শূন্যকেই প্রকাশ করে। এরপর সংখ্যার মর্যাদা পাওয়ার আশায় শূন্যের পথচলা শুরু হল গ্রিকদের কাছে। অথচ এদের কোনো স্থানীয় মান পদ্ধতিই ছিল না! তারা শূন্য নিয়ে তেমন চিন্তাই করেনি।
 
বাস্তবতা হচ্ছে, শূন্যের ধারণা নিয়ে যত অগ্রগতি হয়েছে তার বিরাট অবদান ভারতীয় উপমহাদেশের গণিতবিদদেরই। এখানে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সালের দিকে ব্রাহ্মী নামে একটা সংখ্যাব্যবস্থার প্রচলন হয়। ষষ্ঠ শতকে ভারতে প্রথম কার্যকর ১০-ভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থা প্রচলিত হয়, যার মূল অবদান বিখ্যাত পণ্ডিত আর্যভটের (৪৭৬-৫৫০ খ্রিস্টপূর্ব)। তবে তার দশমিক সংখ্যা ব্যবস্থায় শূন্য কেবল শূন্যস্থানজ্ঞাপক হিসাবেই ছিল কিনা, তা নিয়ে মতবিরোধু আছে। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, তার এ প্রচেষ্টার কারণেই পরে উপমহাদেশে শূন্য নিয়ে অনেক চর্চা হয়।
 
আর্যভটের পর ব্রহ্মগুপ্ত (৫৯৮-৬৭০ খ্রিস্টপূর্ব) শূন্য নিয়ে কাজ করেন। তিনি তার ‘ব্রহ্মস্ফূটাসিদ্ধান্ত’ বইতে বিভিন্ন গাণিতিক ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, বিবৃতি তুলে ধরেন। তিনিই শূন্যকে প্রথমবারের মত সংখ্যার মর্যাদা দেন। তবে তিনি এই সম্পর্কে কোনো সার্বজনীন-গ্রহণযোগ্য যুক্তি দেননি। আর তার ধারণাগুলোকেও বিস্তৃত করে প্রকাশ করেননি।
 
কিন্তু তিনি তার বইতে ‘০’ সম্পর্কিত যোগ, বিয়োগ, গুণ এর ফলাফল সফলভাবে তুলে ধরেন। এজন্যে তাকে ‘শূন্যের আবিষ্কারক’-এর মর্যাদাও দেয়া হয়। এরপর গণিতবিদ ভাস্করও শূন্য নিয়ে মূল্যবান কাজ করেছেন।
 
এরপর মধ্যযুগে শূন্য ভারতীয়দের হাত ধরেই মুসলিমদের কাছে যায়। বাগদাদের খলিফা আল-মনসুরের রাজসভায় ভারতীয় জ্যোতির্বিদ কঙ্কার আগমন ঘটেছিল। তিনি খলিফাকে উপহার হিসেবে ব্রহ্মগুপ্তের বই দেন, যা বাইতুল হিকমাতে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। ৯ম শতকের শুরুর দিকে বাগদাদের খলিফা আল-মামুন তার রাজসভায় আমন্ত্রিত করেন সংখ্যাপ্রেমী এক জ্ঞানী যুবককে, যার নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা (মুসা আল খোয়ারিজমি)।
 
ভারতীয় এ সংখ্যাপদ্ধতিতে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়ে আল খোয়ারিজমি নতুন করে কাজ শুরু করেন। তিনি শূন্যস্থানের প্রতীক ‘০’-কে অন্তর্ভুক্ত করে ১০-ভিত্তিক সংখ্যালিপিকে পরিপূর্ণতা দেন। শূন্যস্থানকে আরবরা সিফর বলত, আর এই সিফর থেকেই ইংরেজি ‘জিরো’ শব্দের উৎপত্তি হয়।
 
পরে খোয়ারিজমি আরও ১৫ বছরের সাধনা আর চিন্তার পর বুঝতে পারেন, ‘সিফর শুধু শূন্যতাজ্ঞাপক একটি চিহ্নই নয়, বরং এটি স্বকীয় সংখ্যা, যা অসীমের পথে ধাবমান ধনাত্মক আর ঋণাত্মক সংখ্যাকে পৃথক করে ভারসাম্য রক্ষা করছে।’
 
লিউনার্দো ফিবোনাচ্চি যখন এ সংখ্যালিপি ইউরোপে নিয়ে যান, তখন কেউই এটাকে গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। কিন্তু এক সময় সবার ভুল ভাঙে। গণিতবিদেরা শূন্য ছাড়া পথ চলতে গিয়ে যখন নানা প্রতিবন্ধকতা আর সমস্যায় পড়লেন, ঠিকই তখন শূন্যকে তারা গ্রহণ করে নিলেন। শূন্যের মাহাত্ম্য আর কারোই অগোচরে রইল না। সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ১৬০০ সালের দিক থেকেই সারা বিশ্বে সাধারণভাবে প্রচলিত হয়ে পড়ল এই সুন্দর সংখ্যা ‘০’ ।
 
ব্রেকিংনিউজ/জিসা
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2