শিরোনাম:

‘সহানুভূতি’তে আস্থাহীন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
৬ জুন ২০১৮, বুধবার
প্রকাশিত: 11:19
‘সহানুভূতি’তে আস্থাহীন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অভিধানকার জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মতে, কথাসাহিত্যিক দ্বারকানাথ গঙ্গাপাধ্যায় ‘অবলাবান্ধব’ পত্রিকায় ইংরেজি sympathy শব্দের লিপ্যান্তর বা বঙ্গানুবাদ হিসেবে ‘সহানুভূতি’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। সহানুভূতি মানে সমবেদনা, অনুকম্পা, দরদ।
 
মূলানুগ অর্থে অন্যের সঙ্গে সমান অনুভূতি বা অন্যের সুখী দুঃখে দুঃখী হওয়ার ভাবই সহানুভূতি (দৈন্যের কাঁদুনি গাহিয়া পরের সহানুভূতি আকর্ষণ করিবার চেষ্টা অসম্ভব- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়)।
 
বাংলা সহানুভূতি শব্দের সমতুল ফারসিতে হমদরদী ও গমখারী। উর্দুতেও গমখারী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজি sympathy শব্দের তর্জমা হিসেবে ‘সহানুভূতি’ পরিভাষাটি মেনে নিতে পারেননি। তিনি ‘অনুকম্পা’ শব্দটির পক্ষে ছিলেন। তিনি তার ‘শব্দচয়ন’ প্রবন্ধে লিখেছেন ‘তৎসত্ত্বে সাহিত্যের হট্টগোলে এমন অনেক শব্দের আমদানি হয়, যা ভাষাকে যেন চিরদিনই পীড়া দিতে থাকে। যেমন ‘সহানুভূতি’। এটা sympathy শব্দের তর্জমা। ‘সিম্প্যাথি’-র গোড়াকার অর্থ ছিল ‘দরদ’। ওটা ভাবের আমলের কথা, বুদ্ধির আমলের নয়। কিন্তু ব্যবহারকালে ইংরেজিতে ‘সিম্প্যাথি’-র মূল অর্থ আপন ধাতুগত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাই কোনো একটা প্রস্তাব সম্বন্ধেও সিম্পাথির কথা শোনা যায়। বাংলাতেও আমরা বলতে আরম্ভ করেছি ‘এই প্রস্তাবে আমার সহানুভূতি আছে’। বলা উচিত ‘সম্মতি আছে’ বা ‘আমি এর সমর্থন করি’। যা-ই হোক, সহানুভূতি কথাটা যে বানানো কথা এবং ওটা এখনো মানান-সই হয়নি তা বেশ বোঝা যায় যখন ও শব্দটাকে বিশেষণ করবার চেষ্টা করি। ‘সিম্প্যাথেটিক’-এর কী তর্জমা হতে পারে, ‘সহানুভৌতিক’, বা ‘সহানুভূতিশীল’ বা ‘সহানুভূতিমান’ ভাষায় যেন খাপ খায় না- সেইজন্যেই আজ পর্যন্ত বাঙালি লেখক এর প্রয়োজনটাকেই এড়িয়ে গেছে। দরদের বেলায় ‘দরদী’ ব্যবহার করি, কিন্তু সহানুভূতির বেলায় লজ্জায় চুপ ক'রে যাই। অথচ সংস্কৃত ভাষায় এমন একটি শব্দ আছে, যেটা একেবারেই তথার্থক। সে হচ্ছে ‘অনুকম্পা’। ধ্বনিবিজ্ঞানে ধ্বনি ও বাদ্যযন্ত্রের তারের মধ্যে সিম্প্যাথি-র কথা শোনা যায়- যে সুরে বিশেষ কোনো তার বাঁধা, সেই সুর শব্দিত হলে সেই তারটি অনুধ্বনিত হয়। এই তো ‘অনুকম্পন’। অন্যের বেদনায় যখন আমার চিত্ত ব্যথিত হয়, তখন সেই তো ঠিক ‘অনুকম্পা’। ‘অনুকম্পায়ী’ কথাটা সংস্কৃতে আছে। ‘অনুকম্পাপ্রবণ’ শব্দটাও মন্দ শোনায় না। ‘অনুকম্পালু’ বোধ করি ভালোই চলে। মুশকিল এই যে, দখলের দলিলটাই ভাষায় স্তরে দলিল হয়ে ওঠে।’ শব্দটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য ‘সহানুভূতির ওপর আমার বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই।’
 
তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষায় অনেক শব্দ তৈরি করেছেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অপহরণ, আপতিক, অভিযোজন, অনীহা, অনুষঙ্গ, পটভূমিকা, আকাশবাণী, অনুষ্ঠান, অভিজ্ঞানপত্র প্রতিলিপি, অপকর্ষ, আপজাত্য, প্রণোদন, দুর্মর, লোকগাথা, প্রাগ্রসর, অনুকার, প্রতিষ্ঠান, নঞর্থক, অনাবাসিক, অবেক্ষা, ঐচ্ছিক, ক্ষয়িষ্ণু, অনুজ্ঞা, রূপকল্প, সংরাগ, জনপ্রিয়, আবাসিক, প্রতিবেদন, একক সংগীত, যথাযথ, আঙ্গিক, প্রদোষ, মহাকাশ। এগুলো পারিভাষিক শব্দ হিসেবেই নির্বিকল্পভাবে ব্যবহৃত হয়।
 
অভিধানে সহানুভূতি শব্দের অর্থে বলা হয়েছে সমবেদনা, দরদ (দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি, একে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি- সুকান্ত ভট্টাচার্য)।
 
ব্রেকিংনিউজ/জিসা
 

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2