শিরোনাম:

বৈদিক ভাষায় ‘সুপারি’ শব্দটি নেই

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
৬ জুন ২০১৮, বুধবার
প্রকাশিত: 10:11
বৈদিক ভাষায় ‘সুপারি’ শব্দটি নেই

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর এক কবিতায় লিখেছেন ‘পান সুপারি। পান সুপারি। এইখানেতে শঙ্কা ভারি।’
 
কারো কারো অজানা থাকতে পারে, বাংলা ভাষায় সুপারি শব্দটি বিদেশী ভাষার দান। সুপারি এক সময় ভারতের সোপর বা সুর্পারক বা শূর্পরিক বন্দর হয়ে বিদেশে যেত। আরবীয় বণিকদের ধারণা ছিল এটা সোপর বা সুর্পারক বন্দরের ধারেকাছেরই ফল। এ কারণে তারা সুপারির নাম দেয় ‘সোপারা’। তাদের দেয়া এ নাম বিবর্তিত হয়ে মধ্যযুগেই সুপারিতে এসে ঠেকেছে। সুপুরি বানানভেদ।
 
অন্য এক তথ্যে দাবি করা হয়েছে, ভারতের বহিঃবাণিজ্যের প্রাচীন প্রমাণ হচ্ছে ‘সুপারি’ শব্দটি। পশ্চিম ভারতের সুর্পারক বন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যে গুবাক বা গুয়া রফতানি হতো, তার নামকরণের অর্থ হয়েছিল ‘সোপারা’ বন্দর থেকে রফতানি করা ফল।
 
সুপারির বৈজ্ঞানিক নাম আরিকা ক্যাটেচু। এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে সুপারি জন্মে। পানের সঙ্গে খাওয়া হয় বলে ভুলবশত ইংরেজিতে এটার নাম হয়ে গেছে ‘বেটেল নাট’। অথচ পান গাছে মোটেও নাট বা বাদাম ধরে না।
 
শুকনো, কর্তিত, পানিতে গাঁজানো আর সতেজ অবস্থায় এটা বাজারে বিক্রি হয়। সুপারি পাকলে এটার খোলসের রং হলুদ বা কমলা হয়ে যায়। তখন এটার ভেতরের শাঁস হয়ে যায় কাঠের মতো শক্ত। এ শুকনো সুপারি জাঁতি নামের একটি যন্ত্র দিয়ে কাটা হয়। এটা বাংলাদেশের কিছু কিছু এলাকায় ‘সরতা’ নামে পরিচিত হলেও শব্দটি বাংলা নয়, হিন্দি। এটা মারাঠিতে আদাকিত্তা, মালয়ালম ও তামিলে পাককুভেত্তি, কানাড়িতে আদেকি কাত্তারি, তেলেগুতে আদাকাত্তেরা, গুজরাটিতে সুরি ও সিংহলিজে গিরায়া নামে পরিচিত। হিন্দি ও উর্দুতে পোঙ্গিফল মানে সুপারি।
 
নেপালিরা আমাদের মতোই সুপারি বলে। আবার এটা অসমে গুয়া, বার্মিজে কুরআ, মালদ্বীপে ফুবাহ, হিন্দিতে সুপারি, ইন্দোনেশিয়ায় পিনাং, জাভায় জেমবি, কম্বোডিয়ায় লুয়ুস, খেমারে কগ, উড়িয়ায় গুয়া, তাইওয়ানে বিনলেঙ, থাইল্যান্ডে মাক, উর্দুতে চালিয়া, ভিয়েতনামে কাউ নামে পরিচিত। আর পশ্চিমা বিশ্বের ডাচে betelnoot, জার্মানে  betelnuss, ইতালিয়ানে noce di betel, নরওয়েজিয়ানে betel mutter, পর্তুগিজে noz de betel, স্পেনিশে areca এবং সুইডিশে betelnöt   নামে পরিচিত।
 
সুপারি হালকা ধাঁচের উত্তেজক। পানের সঙ্গে চিবানোর পর শরীর খানিকটা গরম হয়। সুপারিতে রয়েছে ট্যানিন, গ্যালিক অ্যাসিড, ওয়েল গাম, টারপিনকোল, লিগনিন, খনিজ লবণসহ তিন ধরনের অ্যালকালিও- আরিকোলিন, আরিকেইন ও গুভাসিন।
 
আয়ুর্বেদিক ও চীনা ভেষজ ওষুধে সুপারি ব্যবহৃত হয়। পানি শোধনেও সুপারির ব্যবহার রয়েছে। টুথ পাউডারের একটি উপাদান হচ্ছে সুপারিচূর্ণ।
 
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে দেখা গেছে, চার হাজারেরও বেশি বছর আগে সুপারি ঘোড়ার গাড়ির চাকায় ব্যবহৃত হতো। তবে পৃথিবীর কোন দেশে প্রথম সুপারির প্রচলন হয়েছিল, সে ব্যাপারে প্রামাণ্য কোনো তথ্য আমাদের হাতে নেই।
 
ধারণা করা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম সুপারির প্রচলন ঘটে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন সাহিত্যে সুপারির উল্লেখ রয়েছে। তামিল চিরায়ত সাহিত্য ‘শিলাপাদিকরম’-এ নায়িকা কীভাবে তার প্রেমিককে পান-সুপারি দিয়ে আপ্যায়িত করছেন, তার বর্ণনা রয়েছে।
 
আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে সুপারির নানা গুণের কথা বলা হয়েছে। তবে পঞ্চম শতকে গুপ্ত যুগ থেকে যে ভারতীয় উপমহাদেশে সুপারি চিবানোর রেওয়াজ বেড়ে যায়, তার প্রমাণ রয়েছে।
 
১১ শতকের পা-লিপি ‘মানসোল্লাস’-এ রাজকীয় পরিবারের আটটি আনন্দ বা ভোগের একটি হিসাবে সুপারি চিবানোর কথা উল্লেখ রয়েছে। আর ১৩ শতকে পরিব্রাজক মার্কো পোলো ও ১৪ শতকে ইবনে বতুতা তাদের লেখায় বর্ণনা করেছেন, সুপারি কীভাবে দিল্লি সালতানাতের রাজকীয় খাবারের অপরিহার্য অংশ হয়ে যায়।
 
সুপারি নিয়ে ট্যাং ও ল্যাং নামের দুই চীনা রাজপুত্রের আকর্ষণীয় উপাখ্যানও রয়েছে। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, ভিয়েতনাম পর্যন্ত পান ও সুপারি ভালবাসা ও বিয়ের প্রতীক। ভারতে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সুপারির উপস্থিতি অপরিহার্য। ভিয়েতনামেও একই রীতি অনুসরণ করা হয়।
 
বৈদিক যুগেরও আগে হরপ্পা সভ্যতায় সুপারি চিবানোর রেওয়াজ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। মধ্যযুগের স্প্যানিশ অভিনেত্রী আলেভেরো ডি মেনডেনা তার ভ্রমণ কাহিনীতে সলোমন দ্বীপপুঞ্জের লোকজনের পান ও সুপারি চিবানোর সরেস বর্ণনা দিয়েছেন।
 
তাইওয়ানের রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে নারীরা সুপারি বেচে। আঁটসাঁট পোশাকের কারণে তারা ‘হট চায়না গার্ল’ বা ‘ইরোটিক বিচেস’ নামে পরিচিত। স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘বিনলাং জিশি’ বা সুপারি সুন্দরী। তাইওয়ানিরা পান না খেলেও সুপারি চিবাতে ওস্তাদ। এটাকে তাদের জাতীয় বিনোদনও বলা যায়। ২০ শতাংশ তাইওয়ানি সুপারি চিবোয়। অবশ্য তারা প্রক্রিয়াজাত সুপারি চিবোয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বছরে তিনশ কোটি ডলারের সুপারি বেচাকেনা হয় দেশটিতে।
 
লন্ডনের কুয়িন মেরি ইউনিভার্সিটির মেডিসিন ও দন্ত বিভাগের ডাক্তাররা তাদের এক গবেষণায় দাবি করেছেন, বিশ্বের ১০ শতাংশ লোক সুপারি চিবায়।
 
পৃথিবীতে এক হাজার প্রজাতির সুপারি রয়েছে। তবে সব প্রজাতির সুপারি খাওয়া যায় না। বিশ্বে বিষাক্ত সুপারিও রয়েছে।
 
বৈদিক ভাষায় সুপারি শব্দটির উল্লেখ নেই। তবে লৌকিক সংস্কৃতে গুবাক, পুঙ্গিফলম প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। গবেষকরা বলেন, ‘গুবাক’ শব্দ থেকেই বাংলা, ওড়িয়া ও অসমিয়াতে ‘গুয়া’ শব্দটি এসেছে। উর্দুতে এটা ‘কশৈলী’ নামে পরিচিত। উর্দু ভাষায় কোথাও কোথাও ‘ডালি’ও বলা হয়।
 
বাংলা ভাষার সুপারি শব্দের ব্যবহার অবশ্য হাল আমলের। ২শ বছর আগেকার বাংলাতেও ‘গুয়া’ শব্দ চলত। বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলে ‘গুয়া’ শব্দটি এখনও চালু রয়েছে। ভারতের আসামের বৃহত্তম শহর গৌহাটিরও আসল নাম গুয়াহাটি অর্থাৎ সুপারির হাট। বাংলার লোকগীতিতেও গুয়া শব্দের ব্যবহার রয়েছে:
‘আয় রঙ্গ হাটে যাই।
গুয়া পান কিনে খাই।।’
অথবা
 
‘ফইর‌্যা আইস্যা বন্ধু আমার গুয়া পান খাইও
নাও লইয়া শাওন মাসেরে বন্ধু নাইয়র লইয়া যাইও।’
(মৈমনসিংহ গীতিকা)
 
যাহোক, সুপারি পৃথিবীর বিষুবরেখীয়, কর্কটক্রান্তি ও মর্করক্রান্তি রেখীয়  দেশগুলোতে জন্মায়। তার মধ্যে বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকার কোনো কোনো অংশে সুপারি বেশি জন্মে।
 
ব্রেকিংনিউজ/জিসা
 

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2