Ads-Top-1
Ads-Top-2

এবা‌রের বা‌জে‌টেও কি উপে‌ক্ষিত থাক‌বে কৃষক?

সাজ্জাদ আলম খান
৫ জুন ২০১৮, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 11:49:00

'যখন আমি ভ্রমণ শেষে ভারত ছেড়ে আসছিলাম, বন্ধুবান্ধব আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, সে দেশের কোন দর্শনীয় বস্তুটি আমার মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ ফেলেছে। বলি, তাজমহল, বেনারসের ঘাট, মথুরার মন্দির, ত্রাভাঙ্করের পর্বতমালা- এগুলোর কোনোটিই আমাকে অভিভূত করেনি। ভয়াবহভাবে কৃশ, রোদে পোড়া যে মাটি সে চষে, সেই মেটে রঙের এক টুকরো নগ্নতা ঢাকা, ভোরের শীতে কাঁপতে থাকা, দুপুরের সূর্যতাপে ঘর্মাক্ত, ফেটে চৌচির হওয়া ক্ষেতে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাঙ্গল বাওয়া কৃষক, বিরামহীন শ্রমে নিয়োজিত ক্ষুধার্ত কৃষক, ভারতের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম দিগন্তের বিলীন প্রান্তরে কর্মরত কৃষক; এ দেশে হাজার হাজার বছর আগে যখন আর্যরা প্রথম এসেছিল, তখন থেকে বংশ পরম্পরায় এক মুঠো ভাতের কাঙাল মেহনতি কৃষক, যার একমাত্র কামনা তার শরীর ও আত্মাকে কোনোরকমে একত্র রাখা, সেই কৃষকের ছবিই আমাকে সবচেয়ে বেশি অভিভূত করেছে।'

১৯৩৮ সালে কালজয়ী ছোটগল্পকার সমারসেট মম এসেছিলেন অবিভক্ত ভারতে। ফিরে গিয়ে রাইটার্স নোটে লিখেছিলেন ওপরের অংশ। কৃষকের অবস্থা সেখান থেকে খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি। এ দেশে কৃষক সমাজের রয়েছে বহুমাত্রিক বঞ্চনা। হতাশা দূর করে যদি শৃঙ্খল ভাঙার লড়ায়ে শরিক হতো কৃষক, তাহলে সমাজে শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকত না। সরকার বুক উঁচু করে বলতে পারত না- বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ম্ভর। অথচ গ্রাম্য সেই চাষার উত্তরণ ঘটছে না। মেধাবীরা দেশ চালালেও কৃষকের মর্যাদা এখন যথাযথ স্থানে নেই। কৃষক, তার কন্যা 'বস্ত্র বালিকা' আর পুত্র প্রবাসী শ্রমিকের জন্য কি যথেষ্ট বরাদ্দ থাকে বাজেটে? এই জনপদে কৃষক অধিকার আদায়ে নেই কার্যকর সংগঠন। করপোরেট কৃষিবাণিজ্যের সুবিধা আদায়ে একাট্টা হয়ে যেমন লবিং চলে, তেমনভাবে নেই কৃষকের স্বার্থ দেখার কেউ।

কৃষকের কাছে ন্যায্যমূল্যের সুফল ধরা দেয় না। গত বছর এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, সেখানে কৃষক দাম পেয়েছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এতে দেখা যায়, ধান উৎপাদনে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ খাতে কৃষকের হতাশা খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়কে হুমকির মধ্যে ফেলে দেবে। সরকারিভাবে সরাসরি ধান কেনার নিয়ম চালু হলেও অনেক জায়গায় কৃষক তার সুফল পাচ্ছে না। কৃষক বাঁচাতে এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এই কমিশন মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি ক্রয় পদ্ধতিতে সংস্কার আনবে। হাওরের অভিজ্ঞতায় দেখলাম, অকাল বন্যায় কৃষির যে ক্ষতি হয়েছে, তা কৃষকের একার পক্ষে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। দুর্যোগ মোকাবেলায় কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশেষ সরকারি বরাদ্দ সব সময়ই থাকতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের উঠে দাঁড়াতে বীজসহ বিভিন্ন খাতে আর্থিক সহায়তা ও ভর্তুকি প্রয়োজন।

তবে কৃষির জন্য ভর্তুকি কমানো হচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কৃষিতে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা ৭ হাজার কোটি করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর আগের অর্থবছরের মতোই বরাদ্দ রাখা হয়। মূল্যস্টম্ফীতি হিসাব করলে বরাদ্দ প্রকৃতপক্ষে কমেই যায়। কৃষির ভর্তুকি নিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি দেওয়া হয়। কৃষিতে ভর্তুকি সরাসরি কমিয়ে ফেললে হয়তো সমালোচনা হতো। অর্থমন্ত্রী তাই ভর্তুকি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মতোই ৯ হাজার কোটি টাকা রেখেছেন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য মূল বাজেটে ৯ হাজার কোটি টাকা রাখা হলেও, সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। তার মানে, ৩ হাজার কোটি টাকা কম খরচ করা হয়েছে। কৃষির জন্য ভর্তুকিকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষককে ১ টাকা ভর্তুকি দিলে কৃষক ১৫ টাকা ফেরত দিতে পারে। দেশের ব্যাংকিং খাতে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে, অথচ তা আর ফেরত আসছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশ। তাই এর প্রভাব থেকে কৃষিকে বাঁচাতে সুনির্দিষ্ট কৌশল থাকা উচিত জাতীয় বাজেটে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঘন ঘন ঝড়, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, আকস্মিক বন্যা এবং এর ফলে জলাবদ্ধতা, প্রকৃতির অস্বাভাবিক আচরণে স্বাভাবিক চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।

দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৬ ভাগ কৃষিতে নিয়োজিত। গত অর্থবছরের বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। বাজেটে যেমন কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ কমছে; বরাদ্দ কমছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও। আনুপাতিক হারে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ প্রতি বছর নিয়মিত কমছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ২ দশমিক ২ শতাংশ ছিল এই মন্ত্রণালয়টির জন্য। ২০১৭-১৮ তে বাজেটের মাত্র ৩ দশমিক ১২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এ মন্ত্রণালয়ের জন্য। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কৃষির জন্য বরাদ্দ মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ। প্রতিবেশী ভারতের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। দেশটিতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী উন্নয়নের জন্য বাজেট বৃদ্ধি করা হয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ১ ট্রিলিয়ন রুপি, শস্য বীমার জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি রুপি। এই অর্থবছরে দেশটির ৪০ শতাংশ শস্য এলাকা এবং এর পরের বছর ৫০ শতাংশ এলাকাকে শস্য বীমার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ধনী দেশগুলো ২০২৩ সালের মধ্যে কৃষিপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ করবে। আর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য সময়সীমা ২০৩০ সাল পর্যন্ত। হংকং ঘোষণা অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলো কৃষিপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ২০১৩ সালের মধ্যেই সব ভর্তুকি বাতিলের অঙ্গীকার করে। নাইরোবিতে এসে তারা সেই সুযোগকে আরও ১০ বছর বাড়িয়ে ২০২৩ সাল পর্যন্ত করে নেয়। তবে এই নিয়ম প্রক্রিয়াজাত খাবার ও দুগ্ধশিল্পের জন্য প্রযোজ্য হবে না। তার মানে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের এই কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে এখনও অনেক পিছিয়ে। অথচ কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে দিতে হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষির ভর্তুকি কমানোর মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং ধনী দেশগুলোর চাপে বাংলাদেশ কৃষিতে ভর্তুকি প্রত্যাহার করছে। শিল্পোন্নত দেশগুলো কৃষিতে ব্যাপক পরিমাণ ভর্তুকি ও সহায়তা দিয়ে যখন তারা শিল্পোন্নত হয়েছে, তখনই ভর্তুকি কমানোর দাবি তুলছে। এখন তাদের প্রয়োজন শিল্পের বাজার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্র প্রতি মাসে তার প্রত্যেক কৃষককে ৩ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়ে এসেছে। ইউরোপে প্রতিদিন একজন কৃষক ৪৮০ টাকা ভর্তুকি পায়। দুই বছর ধরে বাংলাদেশের একটি কৃষি পরিবার বার্ষিক বরাদ্দ পেয়েছে মাত্র ৭২শ' টাকার মতো। দেশের কৃষকরা সাধারণত সার ও ডিজেলের ক্ষেত্রে নগদ ভর্তুকি সহায়তা পেয়ে থাকে। ২০৩০ সালের পর বন্ধ করতে হবে কৃষিপণ্য রফতানিতে সহায়ক সব সরকারি সহযোগিতা। সার ও ডিজেলে ভর্তুকি বন্ধ করলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে বাজারে কৃষিপণ্যের মূল্য বাড়বে। 

লেখক: ডিআরইউ’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক



ব্রেকিংনিউজ/এসএএফ

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2