শিরোনাম:

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস সৃষ্টিতে আমাদের দায়

ইউ.এইচ. খান
৪ জুন ২০১৮, সোমবার
প্রকাশিত: 11:51 আপডেট: 11:59
জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস সৃষ্টিতে আমাদের দায়

সাম্প্রতিককালে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত সমস্যাগুলোর একটির নাম জঙ্গিবাদ। সাধারণত জঙ্গিবাদকে ইসলামের সাথে এক করে বলা হয়। যদিও ইসলামের সাথে জঙ্গিবাদের কোন সরাসরি সম্পর্ক নেই। উগ্রবাদ প্রায় সব ধর্ম বা জাতিতেই ছিল এবং আছে। ইসরাইল গত ৭০ বছর ধরে যে সব কর্মকাণ্ড করেছে তার অনেকটাই জঙ্গিবাদ ধারার। তবে তাদের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল যে নিরাপদ ইসরাইল বা ইহুদি ভূমি প্রতিষ্ঠা।  হিটলার  কিংবা আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেট সবাই জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদে জড়িত ছিলেন।
 
ইতিহাসে অমর ক্রুসেডের পুরোটাই একটি বিশুদ্ধ জঙ্গিবাদ। প্রতিটি দেশের স্বাধীনতা যু্দ্ধও এক অর্থে উগ্রপন্থা বা জঙ্গিবাদ। প্রতিটি জঙ্গিবাদের একটি আদর্শ থাকে এবং একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। যেমন ভারতের হিন্দু জঙ্গিবাদের লক্ষ্য ভারতকে শতভাগ হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
 
আভিধানিকভাবে উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদ একই জিনিস। অন্যদিকে ইসলামিক জিহাদ ও উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের বিস্তর ব্যবধান। আর সবকিছুরই বিপরীত হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ। জিহাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস কখনোই এক জিনিস নয়।
ইসলামিক জিহাদ ও প্রচলিত জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদের মধ্যে একটি বিশাল পার্থক্য আছে। ইসলামিক দৃষ্টিতে রাজনৈতিক প্রয়োজনে সরাসরি যুদ্ধের জিহাদ করতে যে সমস্ত উপাদান দরকার তা বিশ্বের কোথাও এখন বর্তমান নেই। এছাড়া জিহাদ একটি ব্যাপক পরিসরের শব্দ। জিহাদ যেমন দৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ তেমন অদৃশ্য শত্রু মানে নফসের সাথে যুদ্ধ। শুধুমাত্র ইসলামিক শর্ত পূরণ ও খাঁটি ইসলামিক উপাদান থাকলেই কেবল কোন যুদ্ধকে জিহাদ বলা যায়।
 
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ইসলামিক জিহাদ নয়, এগুলো উগ্রবাদ বা যুদ্ধ।  ১৯৭১ সালে পাইকারী হারে পাকিস্তানিরা আমাদের বাঙ্গালিদের হত্যা করছিল জবাবে আমরাও তাদের জঙ্গি হামলা করে মোকাবেলা করেছি। স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। আমরা জঙ্গিবাদ করেছি ন্যায়ের জন্য একটি জুলুমের বিরুদ্ধে। কোন অবস্থাতেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সন্ত্রাসবাদ নয়। বর্তমানের জঙ্গি নামধারীরাও যোদ্ধা কিন্তু সন্ত্রাসের পক্ষে। মানে সন্ত্রাসী। ফিলিস্তিনের মানুষদের আমরা মুজাহিদ বলি, মানে তারা ভাল ইসলামিক জঙ্গি। আসলে কি তাই? কিছু আলেম আল-আকসা মসজিদের কথা বলে আমাদের মনে আগুল জ্বালিয়ে রাখছেন যুগ যুগ ধরে। শত শত তরুণ স্বপ্ন দেখে ফিলিস্তিনিদের সাথে মুজাহিদ হওয়ার। ভুলগুলো এভাবেই হয়।
 
একটু গবেষণা করে দেখুন পুরো বিষয়টি একটি রাজনৈতিক ও ভূমি অধিকারগত বিষয়। সব ফিলিস্তিনিই কিন্তু মুসলিম নয় প্রচুর খ্রিস্টানও আছে। তাদের মধ্যে আরো আছে ফিলিস্তিন ইহুদি। আল আকসা মসজিদ যেমন মুসলমানদের দ্বিতীয় পবিত্র জায়গা তেমন ইহুদিদের প্রথম পবিত্র জায়গা। আবার খ্রিস্টানদেরও প্রথম পবিত্র জায়গা। একেবারে নিরপেক্ষভাবে একবার ভেবে দেখেছেন কি বিষয়টি? তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি জাতিগত ফিলিস্তিনের জন্য এটা একটি রাজনৈতিক ন্যায়যুদ্ধ। অন্যদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যখন সাধারণ আফগানরা জঙ্গিতে রূপান্তরিত হলো তখন তাদের সমর্থন দিয়েছি আমরা, বলেছি এটা পুরো মুসলিম জাতির জিহাদ। অথচ আফগান জঙ্গিবাদকেই বর্তমান বিশ্বের জঙ্গিবাদের সূতিকাগার বলা হয়। একদিকে যেমন স্বাধীন ভূখণ্ডে জন্য ফিলিস্তিনের লড়াইকে আমরা ন্যায় যুদ্ধ বলি বিপরীতভাবে বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকার পাহাড়ি জঙ্গিদের সন্ত্রাসী বলি। সন্ত্রাসীরা মুসলিম হলেই বলছি জঙ্গি। আসলে মূল ভাষাগত ও সাইকোলজিক্যাল সমস্যা এখানেই।
 
জিহাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। পার্বত্য এলাকার জঙ্গিরা মুসলমান না হলেও তারা সন্ত্রাসী। তারা কোন রকম অসুবিধায় না থেকেও বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাচ্ছে। সাধারণ বাঙ্গালী লোকদের উপর হামলা করছে। মুসলিম জঙ্গি আর আর এই পার্বত্য পাহাড়ি জঙ্গিদের মাঝে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। উভয় দলই সন্ত্রাসী। কিন্তু আমাদের অন্তরে দুই দলের জন্য দুই ধরনের অনুভূতি।

 


জিহাদকে আল কুরআনের মাধ্যমে  মহান আল্লাহ ফরজ করেছেন। কিন্তু জিহাদ আর সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদ পুরো আলাদা জিনিস। আমাদের ভাষাগত ভুল আর সঠিক জ্ঞানের অভাবে জিহাদ, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসকে এক করে ফেলেছি। গুলশানের হলি আর্টিজেন বেকারীতে হামলার পর যখন সন্ত্রাসীদের পরিচয় বের হলো তখন দেশের আলেমরা যেন স্বস্তি পেল। কেননা এরা মাদ্রাসা ছাত্র হলে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যাবস্থাতে ব্যাপক চাপ আসত। হলি আর্টিজেন বেকারীর হামলার পর আলেম সমাজ একটি উদাহরণ পেল যে শুধু মাদ্রাসার ছাত্ররাই জঙ্গি হয় না। এখানেই আরেক ভুল।
 
আসলে আলেমদের গাফিলতিতেই মুসলমানই কেবল জঙ্গি হয় এই ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। হিন্দু জঙ্গি হচ্ছে, কমিউনিস্ট জঙ্গি হচ্ছে, খ্রিস্টানরা জঙ্গি হচ্ছে, কম বেশী সব গোত্রেই জঙ্গি আছে। কিন্তু জঙ্গি শব্দটি ব্র্যান্ড পেয়েছে মুসলমানদের নিয়ে। দেশের আলেম সমাজ সব সময় বলে এসেছেন ইসলামে জঙ্গিবাদের স্থান নেই। কিন্তু কেন নেই, কিভাবে নেই, সেটা কি বিস্তারিত বলেন?
 
ইদানিং যেমন বাচ্চাদের ছোট বেলা থেকেই প্রয়োজনীয় মাত্রায় যৌনশিক্ষার কথা বলা হচ্ছে তেমনি প্রতিটি মক্তবে শুরু থেকেই জিহাদের ব্যাপারে সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। জিহাদের জন্য মুসলিম নেতার প্রয়োজন, ইসলামী ভূখণ্ড দরকার, বাংলাদেশে জিহাদের প্রয়োজনীয়তা নেই এমন ছেলেভুলানো কথা দিয়ে জঙ্গিবাদ ঠেকানো যাবে না। জঙ্গিবাদ ঠেকানোর জন্য চাই ইসলামের সঠিক স্কলারদের সুস্পষ্ট গবেষনা ও প্রকাশনা এবং ব্যাপক চর্চা।
 
দেশের আরেক সমস্যা হচ্ছে সরকারিভাবে জামাত শিবিরকে এবং বিভিন্ন মাজহাব ও তরিকার মানুষদের আহলে হাদীসপন্থিদের পাইকারী হারে জঙ্গি বলা। এটা ধ্রুব সত্য যে জঙ্গিবাদের প্রসারে সন্ত্রাসীরা জামাত শিবির ও আহলে হাদীসকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে এবং তাদের প্রশ্রয় পেয়েছে। কিন্তু বর্তমানের এই পাইকারী ট্যাগ ব্যবহার করে জঙ্গি বলার ফলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে সুপ্ত ভবিষ্যৎ জঙ্গি হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।
 
আমরা সকলে মিলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সূচনা করেছি আশির দশকে। আমাদের তখনকার যুব প্রজন্মকে আফগান জঙ্গিবাদে জড়াতে প্ররোচনা দিয়েছি। আফগান থেকে যুদ্ধ করে কেউ ফেরত এলে তখন গাজী বলে মসজিদের সামনের কাতারে বসতে দিতাম, বিশেষ খাতির করতাম। কিন্তু ইতিহাস গবেষণা করে দেখুন আফগান ফেরত মুজাহিদরাই এদেশে জঙ্গিবাদের সূচনা ও বিস্তার ঘটিয়েছে।
 
তখনই যদি শক্ত হাতে বিষয়টি মোকাবেলা করা হতো তবে অন্তত জেএমবি বা হুজি এর মত জঙ্গিদল তৈরিই হতো না, তা হলফ করে বলা যায়। আলেমগণ বিগত দশকগুলোয় জঙ্গিবাদ ও জিহাদ নিয়ে গরম গরম ওয়াজ করেছেন, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, ইরাক ও বসনিয়ার যোদ্ধাদের নিয়ে গালভরা দোয়া পরিচালনা করেছেন। ফলাফল কি হয়েছে?
 
বিশ্বব্যাপি জঙ্গিবাদের প্রথম বড় আক্রমণ যখন আমেরিকার টুইন টাওয়ারে ঘটলো তখন অনেক আলেম খুশি হয়েছে এই ভেবে যে সব ইহুদি নাসারারা ধ্বংস হয়েছে। আমার পরিষ্কার মনে আছে বাংলাদেশের এক গ্রামের মসজিদেই ওসামা বিন লাদেনের জন্য জুমার খুতবায় ইমাম সাহেব আমেরিকা আক্রমণে খুশি হয়ে দোয়া করেছেন।  সেই খুশি আর দোয়াটুকু ফিরে এসেছে হলি আর্টিজেন বেকারীর হামলা হয়ে। দেশের শিয়া বা কাদিয়ানী অথবা আহমেদীয়া মসজিদের হামলায় অনেক সুন্নি বা আহলে হাদিস আলেম ওলামারা খুশি হয়, কিন্তু মিশরের সাধারণ সুন্নি মসজিদে যখন হামলা করে ৪০০ এর উপরে নামাজরত মুসলমানকে হত্যা করা হয় তখন ইহুদি নাসারাদের চক্রান্ত বলে ঘোষণা দেন।
 
বর্তমান সময়ের এই ধর্মীয় জঙ্গিবাদ একটি সুস্পষ্ট সন্ত্রাস। মাফিয়া, রেড ড্রাগন, সোমালী জলদস্যু কিংবা পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের সাথে এই সব জঙ্গিদের মৌলিক কোন পার্থক্য নেই বরং জঙ্গিরা আরো একধাপ হিংস্রতা ও বর্বরতায় এগিয়ে। সন্ত্রাস হচ্ছে মলের মত, যেখানেই রাখুন দুর্গন্ধ ছড়াবে, যার সাথেই সংস্পর্শে আসবে সেটি নোংরা হবে। তেমনি জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসকে যেই স্থান দিক, তা ধর্ম হোক বা সমাজ বা রাষ্ট্র হোক পুরোটাই দুর্গন্ধ হয়ে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে যাবে।
 
সন্ত্রাসীরা তাদের কাজ সম্পাদনের জন্য একেকটি মাধ্যম অবলম্বন করে। ইসলাম হচ্ছে সন্ত্রাসের জন্য একটি সহজলভ্য মাধ্যম। ইসলামের নাম লাগালে সহজেই সন্ত্রাস করা যায়। সাধারণ মানুষকে দলে টানা যায়। আলেমদের অজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যায়। আমাদের মনে রাখতে হবে জঙ্গিরা হামলা যাদের উপরেই করুক এমনকি আপনার শত্রুও যদি হয় তবুও কোন অবস্থাতেই সমর্থন করা যাবে না। সন্ত্রাসবাদ ঘৃণ্য বিষয়। কোন অবস্থাতেই একে ঠাঁই দেয়া যাবে না। ধর্মের দোহাই দিয়ে আমাদের মন যাতে পরিবর্তন না করতে পারে, কিংবা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে না পারে সেই দিকে সতর্ক থাকতে হবে।
 
লেখা শেষে একটি সরল উদাহরণ দেই। যখন কোন জঙ্গিগ্রুপ শিয়া বা কাদিয়ানী মসজিদে হামলা করে তখন সুন্নি আলেমরা বলেন আল্লাহর গজব নাজিল হয়েছে এবং মনে মনে খুশি হন। কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছেন যে লোকটি আজ হামলার শিকার হয়ে মারা গেল তার ছেলে হয়তো বিশ বছর পর আপনার বাসার পাশে সুন্নি মসজিদে হামলা করবে। সেদিন হয়তো আপনার ছেলে মারা যাবে। হ্যাঁ বিষয়টি কঠিন মনে হলেও বাস্তবিকভাবেই সন্ত্রাসবাদ একটি চেইন ইফেক্ট। এরকম ঘটনার বড় প্রমাণ হচ্ছে ইরাক ও সিরিয়া। আমেরিকা বা রাশিয়া কিন্তু ওই সমস্ত দেশে সমস্যা শুরু করেনি। সমস্যা শুরু হয়েছিল শত বছর ধরে চলা জাতিগত বিরোধ থেকে। আমরা দ্রুতি যদি সঠিক উপলব্ধি না করতে পারি এবং সবার মাঝে সঠিক উপলব্ধি প্রতিষ্ঠা না করতে পারি তবে সমস্যা বাড়তেই থাকবে। মানে রাখতে হবে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। এমন একটি কল সন্ত্রাসীরা কেন ব্যবহার করবে না?
 
লেখক: মিশরের তথ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত গবেষক ও সাংবাদিক

uhkhanbd@gmail.com

ব্রেকিংনিউজ/খান/জিসা
 

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2