Ads-Top-1
Ads-Top-2

আসামের মুসলিমরাও কি ‘রোহিঙ্গাদের মত’ হবে?

হৃদয় আজিজ
৩১ মে ২০১৮, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: 09:02:00 আপডেট: 02:24:00

বেশ উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় আছেন বিমলা বেগম। ভারতের আসাম রাজ্যের বাসিন্দা তিনি। সম্প্রতি আসামে ৯০ লাখ বিবাহিত নারীকে তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখাতে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে বিমলাও একজন। 

৩৭ বছর বয়সী এই নারী দুই পৃষ্ঠার সরকারি নোটিশ দেখিয়ে বলেন, ‘নোটিশ পাওয়ার পর আমি দুইজন প্রতিবেশির কাছে গিয়ে কি করতে হবে তা জানি। আমি খুবই চিন্তিত কী করবো তা নিয়ে।’ 

সম্প্রতি আসাম প্রাদেশিক সরকার জাতীয় রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) হালনাগাদ শুরু করেছে। এর আগে ১৯৫১ সালে একবার হয়েছিল। আসম সরকার অনেক আগে থেকেই বলে আসছে সেখানকার মুসলিমরা নাকি বাংলাদেশের নাগরিক। আর সেটা প্রমান করতেই এই হালনাগাদের আয়োজন।

গেলো বছরের ৩১ ডিসেম্বর এনআরসির প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪৫ লাখ অন্য ধর্মের বাকি প্রায় ৩০ লাখ মুসিলম নারী।

এখন পর্যন্ত ৭০ লাখ মানুষ নাগরীকত্ব প্রমানে প্রয়োজনীয় দলিল জমা দিয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ত্রিশ লাখ বিবাহিত নারী। এসব দলিল দস্তবেজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঘোষণা করা হবে তারা ভারতের নাগরিক নাকি শরণার্থী।

৩ কোটি ২০ লাশ মানুষের মধ্যে মাত্র ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষকে ভারতের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ।

দেশটির সুপ্রিম কোর্ট এই হালনাগাদের নির্দেশ দিয়েছে। দলিল দস্তবেজগুলো যাচাই বাছাইয়ের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩০ জুন।

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে এই যাচাই বাছাইয়ে অনেক ফাঁক-ফোঁকর রয়েছে। তাছাড়া, প্রয়োজনীয় দলিল যোগাড় করতেও ভোগান্তি ও যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন নারীরা। 

অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্ট ইউনিয়ানের (এএএমএসইউ) সভাপতি রেজাউল করিম সরকার বলছেন, ‘পঞ্চায়েতের সনদ নিতে গিয়ে নারীরা নানাভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘যদিও হালনাগাদের ফরম সবাই পুরন করছে। কিন্তু এই হালনাগাদ বাঙালি মুসলিম ও হিন্দুদের চিন্তায় ফেলেছে।’



তদের অবস্থাও কি রোহিঙ্গাদের মত হবে?
রেজাউল করিমের ভয়, আসামের অধিকাংশ মুসলিমই ভারতের নাগরিক। তারপরও তাদের বিদেশি বলে ডাকা হয়। দেখা যাক আগামী মাসে নাগরিকদের যে তালিকা প্রকাশ করা হবে তাতে কি ফল আসে।

তিনি বলেন, ‘সত্যিই যদি কেউ বিদেশি হয় তাহলে তাকে তার দেশে পাঠানো হোক, তাতে কোনো আপত্তি নেই। তবে যদি উদ্দেশমূলকভাবে বিদেশি বানানো চেষ্টা করা হয়, তাহলে কেউ বসে থাকবে না। কারণ, আসামের অধিকাংশ বাঙালিই ভারতী।’

এই অধিকারকর্মী বলেন, ‘প্রায় তিন লাখ মানুষকে জাতীয় নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করেছে। সে বিষয়টি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে (এফটি) বিচারধীন।

প্রাদেশিক রাজধানী গোহাটি কেন্দ্রীক অধিকারকর্মী আব্দুল বাতেন খন্দকার বলেন, ‘আমার পরিবারকেও বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিষয়টি জাতীয় নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের তদন্তনাধীন।’

সরকারি তথ্য অনুযায়ী ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে এখনো ২ লাখ ৪৫ হাজার ৫৭টি মামলা এখনো চলছে। ইতোমধ্যেই ৯০ হাজার ২০৬ জনকে বিদেশি হিসেবে রায় দিয়েছে। 

ব্রহ্মপুত্র ভেলি সিভিল সোসাইটির কার্যনির্বাহী সভাপতি আব্দুল বাতেন বলেন, ‘২০০৩ সালে ভারতের নাগরিক সংশোধন হয় সেখানে বলা হয়েছে, ‘যার মা-বাবা জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক তার জাতীয়তাও ভারতী।’

এই অধিকার কর্মী ভয়, জাতীয় নিবন্ধন তালিকায় এখনো ১০ হাজার মানুষের নাম আসেনি। তারা কী রোহিঙ্গাদের মত মাতৃভূমি ছাড়া হবে? তারা কী তাদের নাগরিকত্ব হারাবে? 

আব্দুল বাতেন বলেন, ‘আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় সামনে এগোচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই ভারতে মানবিক সংকট দেখা দেবে।’

পিছিয়ে পড়া নদী ভাঙন এলাকার মানুষ বিমলা বেগম। কৃষকের মেয়ে তিনি নিজেও কৃষি কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করেন। কখনো স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। স্কুল কিংবা সরকারি কোনো সদন তার নেই। পঞ্চায়েতের সনদই তার ভরসা।

প্রথমে আসাম কর্তৃপক্ষ পঞ্চায়েতের সনদ গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী পঞ্চায়েত সনদ গ্রহণ করা হচ্ছে।



‘বাংলাদেশী’ রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা  
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেন অনেক বাঙালিই আসামে থেকে যায়। এরপর থেকে কয়েক দশক হলে তারা সেখানেই বাস করছে। ধারণা করা হয় সে সময় বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম আসামে যায়। বিষয়টি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আসামের রাজনীতিকরা বড় করে দেখা শুরু করে।

১৯৭০ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত এক দশক বাঙালি মুসলিমদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালায় আসামের হিন্দুরা। এই নির্যাতনকে আসাম আন্দোলন বলে পরিচিতি পায়।

১৯৮৩ সালে আসামের নওগাঁ জেলার নিলি গ্রামে বাঙালি হঠাও আন্দোলনের নামে আন্তত দুই হাজার মুসলিমকে হত্যা করা হয়। 

১৯৮৫ সালে অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (এএএসইউ) সাথে সরকার একটি চুক্তির মাধ্যমে এই হত্যাযজ্ঞ থামায়। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর চেষ্টাই এই নাগরিকত্ব হালনাগাদের আয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গোহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আখিল রঞ্জন দত্ত বলেন, ‘নাগরিক হালনাগাদ কোনো সমাধান আসতে পারবে কি না, সেটা আমাদের সবারই জানা। এটা আরও জটিলতার দিকে ঠেলে দেবে।’

তিনি বলেন, ‘তার চেয়ে বরং সম্প্রতি সময়ে যেসব বিদেশি এসেছে, তাদের খুঁজে বের করে নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া।’

আসামের অর্থমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বাস শর্মা বলেন, ‘আমাদের সরকার মনে করে এই হালনাগাদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারবো যে আসামে কতজন বিদেশি আছে।’

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদেরও দেশটির সরকার তারদেশের নাগরিক মনে করে না। তাদের বাংলাদেশের নাগরিক বলে প্রচার করে। সত্তরের দশক থেকে এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ওপর সরকার ও সেনাহিনীর লোকেরা নানাভাবে নির্যাতন ও নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। দেশটির সেনা ও উগ্র বৌদ্ধদের নিপীড়নের মুখে এখন পর্যন্ত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমার সরকারের মতে আসাম সরকারও একই প্রক্রিয়ায় হাঁটছে। চলমান হালনাগাদের পর তারা নির্দিষ্ট সংখ্যক মুসলিমকে বাংলাদেশি হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনায় আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু যদি ধামাচাপায় পড়ে তাহলে তারাও মিয়ানমারের কায়দায় আসামের মুসলিমদের বাংলাদেশে পাঠানো প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।

ব্রেকিংনিউজ/এইচএ/এমআর

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বাধিক পঠিত
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2