শিরোনাম:

স্থায়ী সংজ্ঞা নেই সাংবাদিকতার

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
২৮ মে ২০১৮, সোমবার
প্রকাশিত: 3:47
স্থায়ী সংজ্ঞা নেই সাংবাদিকতার

 যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ব্যাপক অনুসন্ধানের পর উপলব্ধি করেছেন, মিডিয়ার রীতিসিদ্ধ সীমানায় প্রযুক্তি আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চলমান প্রভাব বজায় থাকলে ‘সাংবাদিকতা’ ধারণাটির একটি স্থির সংজ্ঞা অবশ্যই লাগবে। কিন্তু সাংবাদিকতার স্থায়ী বা সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নেই।
 
ইংরেজি ‘জার্নাল’ ও ‘ইজম’ শব্দের মিলনে ‘জার্নালিজম’ শব্দটি তৈরি। জার্নাল হচ্ছে কোনো কিছু প্রকাশ করা আর ইজম মানে অভ্যাস করা, অনুশীলন বা চর্চা করা। বলা যেতে পারে, কোনো কিছু প্রকাশ করার জন্য যে চর্চা বা অনুশীলন করা হয়, তা-ই সাংবাদিকতা বা জার্নালিজম। সাদামাটা ও সংকীর্ণ ভাষায়, যিনি সংবাদপত্রের জন্য সংবাদ সংগ্রহ করেন ও লিখেন, তিনিই সাংবাদিক। তবে আধুনিক সাংবাদিকতার বিশাল আঙ্গিনায় সাংবাদিককে কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বেঁধে দেয়া যায় না।
 
নতুন করে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে গণমাধ্যম কতটা মাধ্যম আর কতটাই বা সামাজিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া? প্রতিদিন যে তথ্য প্রকাশিত হয়, সেগুলো কি কেবলই বার্তা, এই বার্তার দায় কার? তথ্য ব্যবসায়ের দায়িত্বই কতটুকু অথবা সাংবাদিকতার দায়িত্বের সীমা কোথায়? সাংবাদিকতায় অবজেক্টিভিটি থাকার শর্ত থাকলেও তথ্য ব্যবসায় এটা অপরিহার্য নয় কেন?   
 
বিশেষজ্ঞরা সাদামাটা ভাষায় বলে থাকেন, ‘যে খবর মানুষ বেশি পড়বে বলে মনে হয়, তা প্রকাশ করাই তথ্য-ব্যবসা।’ কিন্তু খবর প্রকাশের পর এর কি ধরনের প্রভাব সমাজের ওপর পড়বে, সেটি ভেবে সংবাদ প্রকাশ করা হল সাংবাদিকতা। তাই প্রশ্ন উঠেছে সামাজিক দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্য ছাড়া তথ্য-ব্যবসাকে কী সাংবাদিকতা আখ্যা দেয়া যায়?
 
আবার ব্লগিং হচ্ছে এক ধরনের নাগরিক সাংবাদিকতা, সে হিসেবে ব্লগ একটা শক্তিশালী বিকল্প মিডিয়া। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে ব্লগ কখনই শুধু নাগরিক সাংবাদিকতার জন্য তৈরি হয়নি বা শুধু নাগরিক সাংবাদিকতার জন্য ব্যবহার করা হয় না। ব্লগে নাগরিক সাংবাদিকতা করতে আসা ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদেরও ‘ব্লগার’ বলা হয়। তাদেরকে সিটিজেন জার্নালিস্ট বা নাগরিক সাংবাদিক বলা হচ্ছে না। কেন বলা হয় না, সেটার পেছনের কাহিনী অনেক লম্বা। সংক্ষেপে এটাই বলতে হয়, তারা ব্লগে লিখছেন বলেই তারা ‘ব্লগার’।
 
একই কারণে সংবাদ কী বা সংবাদ কাকে বলে, তা নির্ধারণ করাও বেশ কঠিন। বান্তবতা হচ্ছে সংবাদের সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা যেমন পাওয়া যায় না, তেমনি এর ব্যাপ্তিও বিশাল। তবে সংবাদকে সংজ্ঞায়িত করার চেয়ে চিনে নেয়াটা নাকি অনেক সহজ।
 
বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংবাদকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। যেমন, হ্যারিস ও জিনসন বলেন, ‘সংবাদ হচ্ছে একটি ঘটনা, বিষয় বা মতামতের বিবরণ যা জনগণ আগ্রহ নিয়ে পড়ে।’ আবার  নিউ ইয়র্ক সান পত্রিকার সম্পাদক চার্লস এ. ডানার মতে, ‘মানুষকে যা বিস্মিত ও অবাক করে তাই সংবাদ।’ তিনি তার এ সংজ্ঞাটির আরও উৎকর্ষ করে বলেন, ‘ইতিপূর্বে মনোযোগ আকৃষ্ট হয়নি অথচ সমাজে বৃহত্তর অংশকে কৌতূহলী করে তোলে, এমন যে কোনো বিষয়ই ‘সংবাদ’।
 
প্রশ্ন হলো সব ঘটনাই কি মানুষকে সমানভাবে বিস্মিত ও অবাক করে? সাধারণ ঘটনাও অনেক সময় সংবাদ হয়ে উঠে। সেদিক থেকে বিচার করলে সংজ্ঞাটি পূর্ণাঙ্গ নয়।
 
মার্কিন সিনেটের সাম্প্রতিক বিতর্কে সাংবাদিকদেরও কাছে একটি জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেছে, মার্কিন মুলুকে ফেডারেল প্রতিরক্ষা আইনই বিচারকালে একজন সাংবাদিককে তাঁর ‘সোর্স’ প্রকাশ করার চাপ থেকে রক্ষা করছে। পাশাপাশি এডওয়ার্ড স্নোডেন আর ব্রাডলি মানিং যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গোপন তথ্য পাচার করেছেন, সে ঘটনাও এ গ্রহবাসী জেনেছেন। এ দুটো ভিন্ন প্রেক্ষাপট আধুনিক সমাজব্যবস্থার সামনে একটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রশ্নটি হচ্ছে, বর্তমান যুগে একজন সাংবাদিকের আইনি সংজ্ঞা কি হওয়া উচিত?
 
মিসৌরি ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের ডক্টরাল ক্যান্ডিডেট এডসন ট্যানডক জুনিয়র সাংবাদিকতার একটি ব্যাপক সংজ্ঞা নির্ণয় করেছেন। আধুনিক সমাজে একজন সাংবাদিকের ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখছেন, সেটি গবেষণা করেই তিনি এ সংজ্ঞা নির্ণয় করেন। এতে তিনি বলেন, ‘একজন সাংবাদিক হচ্ছেন সেই চাকরিজীবী, যিনি প্রতিনিয়ত জনস্বার্থে সংবাদ ও তথ্য জোগাড়, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রচার বা প্রকাশ করার কাজে জড়িত থাকেন।’
 
ট্যানডক বলেন, ‘নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে অধিক হারে মানুষ গণযোগাযোগে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। কিন্তু মোটা দাগে বলতে গেলে, অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগই একজন ব্যক্তিকে সাংবাদিক বানিয়ে দেয় না। বরং তথ্যপ্রবাহের বাড়তি চাপের এই যুগে একজন মানুষের জন্য এটা জানা খুবই জরুরি যে, কোন তথ্যটি বিশ্বাসযোগ্য আর কোন তথ্যটি নির্ভরযোগ্য নয়। যেসব সোর্স বা সূত্র বিশ্বাসযোগ্য, সেসব রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।’
 

সম্প্রতি ‘দি নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব লেজিসলেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসি’ নামে একটি সাময়িকীর অনলাইন সংস্করণে এক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এটির শিরোনাম ‘পিপল হু আর নট রিয়েলি রিপোর্টার্স অ্যাট অল, হু হ্যাভ নো প্রফেশনাল কোয়ালিফিকেশনস: ডিফাইনিং অ্যা জার্নালিস্ট অ্যান্ড ডিসাইডিং হু মে ক্লেইম দি প্রিভিলিজেস’।
 
৩১ পৃষ্ঠার এ নিবন্ধটি যৌথভাবে লিখেন এডসন ট্যানডক জুনিয়র এবং মিডিয়া আইনজীবী ও ডেটন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক জোনাথন পিটারস। এতে তারা বিভিন্ন পাণ্ডিত্যপূর্ণ টেক্সট, আইনি দলিল আর সাংবাদিকদের বিভিন্ন পেশাদার সংগঠনের সদস্য পদ অর্জন করার মানদ- যাচাই-বাছাই করে সাংবাদিকের সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা চালান।
 
তাঁরা দেখতে পান, সংবাদপত্র শিল্পের সংজ্ঞায় সাংবাদিকতা মূলত চাকরি অথবা সংবাদসংক্রান্ত কাজ করার বিনিময়ে কিছু আর্থিক সুবিধা পাওয়া। আবার আইনি ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ সংজ্ঞাগুলোর আলোকে তাঁরা দেখতে পান, সাংবাদিকতার মূল ফোকাস সামাজিক ভূমিকাকেন্দ্রিক। যেমন সাংবাদিকরা সরকারের কার্যাবলী বা ভোক্তার স্বার্থের ওপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন।
 
ট্যানডক লিখেছেন, ‘আমরা মনে করি, সাংবাদিকতার যেসব সংজ্ঞা এই নিবন্ধে সন্নিবেশিত হয়েছে, তাতে এ পেশাটির অনেক ধরনও ঠাঁই পেয়েছে। তবে সংবাদপত্রশিল্পে চাকরির ধারণাকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তাতে গণযোগাযোগ খাতের নতুন বেশ কিছু রূপের সঙ্গে জড়িতরা ‘সাংবাদিক’ সংজ্ঞার আওতায় পড়েন না। এ কাতারে রয়েছেন অবৈতনিক ব্লগার ও সিটিজেন জার্নালিস্ট। তারা জনস্বার্থ সংক্রান্ত খবর সংগ্রহ করে তা দিয়ে সংবাদ বানিয়ে প্রকাশ করেন। তবে তারা সংবাদকেন্দ্রিক তৎপরতাকে তাদের আয়ের প্রধান উৎস বানিয়ে নেন না।’
 
ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও সাহিত্যিক এডমন্ড বার্ক সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বললেও হালের কর্পোরেট মিডিয়া টাইকুনদের কাছে তার দেয়া সাংবাদিকতায় নৈতিকতার সংজ্ঞা এখন বাতিল ‘পণ্য’।
 
গোলকায়নের নিক্তিতে মাপতে গেলে বর্তমান সামাজিক কাঠামোতে কর্পোরেট মালিকানায় সংবাদপত্র বা মিডিয়া হচ্ছে কর্পোরেট ব্যবসার বহুমুখী মাধ্যমগুলোর একটি। একদিকে এটা মালিকের ব্যবসা বৃদ্ধি ও ব্যবসার নিরাপত্তার হাতিয়ার; অন্যদিকে প্রতিযোগী বা শত্রুকে বিনাশ করার মোক্ষম ‘মারণাস্ত্র’।
 
তাই কর্পোরেট মালিকানাধীন মিডিয়ার সাংবাদিকরা এখন আর আদৌ ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ নন। বলা হচ্ছে ‘তারা কর্পোরেট মালিকদের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ এবং অনেক ক্ষেত্রে কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার আন্ডারকাভার ‘ডেথ স্কোয়াড’।
 
সমাজ বিবর্তনের ধারায় দিনে দিনে এভাবেই মিডিয়া জগতের নৈতিকতাকে প্রতিস্থাপন করেছে ব্যবসা আর ব্যবসার প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠেছে কেচ্ছা। তাই আজকের এ সমাজ কাঠামোর অধীনে সাংবাদিকতা নৈতিকতা নির্ভর নয়, কেচ্ছানির্ভর। আর কেচ্ছা খুঁজতেই সাভারে রানা প্লাজার দেয়াল ভাঙ্গা ছিদ্র দিয়ে উদ্ধারকর্মী ঢোকার আগেই ক্যামেরা নিয়ে অসংখ্যবার ঢুকে বসেছিলেন চোঙাধারীরা।
 
ট্যানডক মনে করেন, নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনিই সাংবাদিক বিবেচিত হতে পারেন, যিনি প্রথাগত চাকরির পাশাপাশি সংবাদ ‘মাধ্যম’ও নির্ধারণ করে নেন। কারণ বিশেষায়িত সংবাদ মাধ্যমের সংজ্ঞা নির্ধারণের একটা প্রবণতা সংবাদপত্র শিল্পে দেখা যাচ্ছে। এটাকে নিশ্চিতভাবে বদলে যাওয়া সময়ের প্রতিফলন বলা যায়। কারণ সাংবাদিকরা এখন আর শুধু একটি একক মাধ্যমে কাজ করেন না।
 
ব্রেকিংনিউজ/জিসা
 

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2