শিরোনাম:
Ads-Top-1
Ads-Top-2

‘নারী উদ্যোক্তা হতে চাই ইতিবাচক মনোভাব’

মাইদুল ইসলাম
৮ মে ২০১৮, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 11:03:00

আইনুন নাহার সফল নারী উদ্যোক্তা। উদ্যম ও সাহসী মনোভাবই তাকে অনেক দূর নিয়ে গেছে। ২০০৩ সালে আইনুন নাহার যুব উন্নয়নের সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে মাত্র দুই হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে পোশাক তৈরির ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেই ব্যবসার পুঁজি এখন প্রায় অর্ধ-কোটি টাকা। কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পেয়েছেন সফল নারী উদ্যোক্তার পুরস্কার।
 
এই উদ্যোক্তার হওয়ার পথে নাহার ডিঙ্গিয়ে এসেছেন নানা প্রতিবন্ধকতা। তবে দমে যাননি। এই উদ্যোক্তা হওয়ার নানা দিকে নিয়ে ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি এর সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন আইনুন নাহার। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি এর স্টাফ করেসপন্ডেন্ট মাইদুল ইসলাম
 
ব্রেকিংনিউজ: আজকে আপনি সফল উদ্যোক্তা। এই উদ্যোক্তার হওয়ার শুরুটা কেমন ছিল?
 
আইনুন নাহার: ২০০৩ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি সেলাই মেশিন পাই। এই সেলাই মেশিন দিয়ে খুব ছোট পরিসরে ঘরে বসে গ্রামের বিভিন্ন জনের পোশাকের কাজ শুরু করি। এভাবে কাজ করে সামান্য আয় হতে থাকে। এই আয়ের কিছু টাকা জমিয়ে দুই হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করি পোশাক তৈরির ব্যবসা। এর নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই থেকে আজকের অবস্থা এসেছি।
 
ব্রেকিংনিউজ: ব্যবসা শুরু প্রথম দিকে কি ধরনের পণ্য তৈরি কাজ করতেন?
আইনুন নাহার: ২০০৭ সালের দিকে আরও দুটি মেশিন কিনে নিয়ে আসি। আর ব্যবসাও মোটামুটি শুরু হলো, তিন জন কর্মী নিয়োগ দিলাম। প্রথম দিকে চুক্তিতে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, নার্সিং হোমের ইউনিফর্ম পোশাকের অর্ডার নিয়ে তা তৈরি করে দিতাম। অনেক আন্তরিকতা সাথে কাজ করে এসব অর্ডারের মালামাল যথাসময়ে নিখুঁতভাবে কাজ করে দিতাম। এভাবে চারপাশে আমার একটা পরিচিতি লাভ করতে থাকে। অর্ডারও অনেক আসতে থাকে।
 
ব্রেকিংনিউজ: নতুন নতুন অর্ডার আসায় কাজগুলো একাই কিভাবে সামাল দিতেন?
আইনুন নাহার: ব্যবসার পরিসর কিছুটা বাড়ায় আমার কর্মী দরকার পড়ে। তখন আমি নিজে বিনা পয়সায় কর্মী তৈরি লক্ষে তাদের প্রশিক্ষণ দিতাম। এসময় অনেক নারী নিজে ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে আসত। গ্রামের বিভিন্ন নারী আমরা কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিত। তাদের কাছ থেকে একটি ফি নিতাম। এখান থেকে আমার ভালো একটা আয় হতে থাকে। এরপর ব্যবসার পরিসারটা আরও বড় করা চিন্তা আসে মাথায়।
 
ব্রেকিংনিউজ: আপনি বলছিলেন ব্যবসার পরিসর বাড়াতে চাইছিলেন, সেটা কিভাবে করলেন?
আইনুন নাহার: ব্যবসা ভালোই চলছিল। আমি চাইছিলাম আরও বড় পরিসরে। কিন্তু এর জন্য পুঁজি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ঋণ নেয়ার জন্য আমি ব্যাংকে যাওয়ার সাহস পাইনি। আস্তে আস্তে যখন কাজ করছি, তখন যুব উন্নয়ন থেকেই আমাকে আর্থিক সাহায্য করে। এছাড়া আমাদের স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আমার কাজ দেখে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি নিজ উদ্যোগে কোনো জামানত ছাড়াই এক লাখ টাকা ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করে।
 
ব্রেকিংনিউজ: ঋণের এক লাখ টাকা দিয়ে কিভাবে ব্যবসা শুরু করেন?
আইনুন নাহার: ২০০৮ এর দিকে ঋণের এক লাখ টাকা দিয়ে ব্যবসার পরিসর বাড়ানোর কাজ শুরু করি। এসময় কিছু কাঁচামাল কিনে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করতে থাকলাম। বিভিন্ন জায়গায় পাইকারি দরে পণ্য বিক্রি করতে থাকি। নিজস্ব পণ্য তৈরি করে বিক্রি করলে অনেক লাভ হয়, এক্ষেত্রে প্রায় ৫০ শতাংশ লাভ থাকে। এছাড়া হাতে পুঁজি থাকায় ঢাকা থেকে কাঁচামাল এনে পণ্য তৈরি করতে থাকি। এসময় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, নার্সিং হোমের ইউনিফর্ম তৈরির অর্ডার আসে। তারা আমাকে প্রায় অর্থেক টাকা অগ্রিম দিত। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থারও কাজ করে দিতাম। ব্যবসার পরিসরও বাড়তে থাকে। এই সময়ের মধ্যে আমার ৭টি মেশিন হয় এবং ১৮-২০ জন কর্মী কাজ করে। বিভিন্ন মার্কেটে পাইকারিভাবে পণ্য সরবরাহ করতে থাকি। এর মধ্যে আমি ২০১০ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ময়মনসিংহ জেলার সফল আন্তকর্মী নারী হিসেবে পুরস্কার পাই। এই পুরস্কার আমার কাজের গতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
 
ব্রেকিংনিউজ: আপনি প্রধানত কি কি পণ্য তৈরি করেন?
আইনুন নাহার: বেডশিট, নকশী কাঁথা, মেয়েদের সেলোয়া-কামিজ থ্রি-পিচ, ওয়ান-পিচ, ছেলেদের পাঞ্জাবি, পাটের তৈরি বিভিন্ন ব্যাগ, পুতুল ও শো পিস তৈরি করি। এসব পণ্যের মান গুণগত রয়েছে। এছাড়া পাটের তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য রয়েছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় এসব পণ্য সরবরাহ করি থাকি। এছাড়া ময়মনসিংহ ও ঢাকায় একটি নিজস্ব শো-রুম আছে।
 
ব্রেকিংনিউজ: পণ্যের বিক্রি বাড়াতে আপনি পদক্ষেপ নিয়েছেন?
ব্রেকিংনিউজ: আমি দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত মেলায় অংশ নিতে থাকে। মেলায় আমার পণ্যের বেশ সাড়া পাই। মেলায় অনেকেই পণ্যের অর্ডার দেয়। এসব অর্ডার আমি যথাযথা ক্রেতাদের পৌঁছে দেই। পাশাপাশি আমি যাদের প্রশিক্ষণ দেয় তারা যাতে হারিয়ে না যায় এজন্য ময়মনসিংহ জেলা নারী উদ্যোক্তা ও উন্নয়ন ফোরাম নামে একটি সমিতি তৈরি করি।
 

ব্রেকিংনিউজ: রাষ্ট্রীয়ভাবে কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন?
ব্রেকিংনিউজ: ২০১০ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ময়মনসিংহ জেলার সফল আন্তকর্মী নারী হিসেবে পুরস্কার পাই। ২০১৩ সালে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার পাই। ২০১৫ সালে ঢাকায় যুব মেলা পুরস্কার ও ২০১৬ সালে  এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে আঞ্চলিক পুরস্কার পেয়েছি। ২০১৬ সালে ১ নভেম্বর জাতীয় যুব দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সারাদেশের মধ্যে সফল নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার গ্রহণ করি। এসব পুরস্কার আমার কাজে স্বীকৃতি এবং আমার কাজের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
 
ব্রেকিংনিউজ: নারীদের ক্ষেত্রে ব্যবসায় প্রধান বাধাগুলো কি কি?
আইনুন নাহার: প্রথম দিকে পরিবার থেকেই বাধা আসে যে মেয়েদের আবার ব্যবসা করা কি প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যবসার প্রসারের জন্য অর্থ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তৃণমূল উদ্যোক্তারা সহজে ব্যাংক ঋণ পায় না। এছাড়া পণ্য মার্কেটিংয়ে বাধা রয়েছে। সহজে নারী পণ্য বিক্রি করতে পারে না।
 
ব্রেকিংনিউজ: বাধাগুলো দূরকরণে কি করা প্রয়োজন?
আইনুন নাহার: তৃণমূল উদ্যোক্তাদের জন্য সহজে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। জেলা ও বিভাগ পর‌্যায়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পণ্য বিক্রির সেন্টার তৈরি করতে হবে। এছাড়া সরকারিভাবে উদ্যোক্তা তৈরির জন্য যে অর্থায়ন করার হয় তার সুষ্ঠু ব্যবহার করতে হবে।
 
ব্রেকিংনিউজ: একজন নারীর ক্ষেত্রে গৃহিণী হিসেবে না উদ্যোক্তার হওয়া বড় প্রয়োজন ?
আইনুন নাহার: আমার দৃষ্টিতে একজন উদ্যোক্তাকে অনেক বড় করে দেখব। কারণ সে নিজে কিছু করছে। স্বাধীন মতামত দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। নিজে স্বাবলম্বী হচ্ছে পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। আর একজন গৃহিণী শুধু রান্নার কাজে নিজে গুটিয়ে রাখছে। গৃহিণীরা সারা রাতদিন ঘরের কাজ করছে তারপর পরিচয় দেয়ার সময় বলতে হচ্ছে আমি কিছু করি না।
 
ব্রেকিংনিউজ: নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেন প্রয়োজন?
আইনুন নাহার: এখনো পরিবারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নারীদের মতকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। কিন্তু অর্থনৈতিক শক্তি থাকলে সেই মূল্যায়নটা করা হয়।
 
ব্রেকিংনিউজ: পুরুষকে আপনারা প্রতিদ্বন্দ্বী না সহযোগী ভাবেন?
আইনুন নাহার: অবশ্যই পুরুষরা সহযোগী। তবে একসময় পুরুষরাই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবে। যখন সমাজে নারীদের অবস্থানটা উন্নতি হয়। তখন তারা ভাবতে পারে তাহলে আমাদের মূল্যায়ন কি কমে গেল। তারা এটা মনে করতে পারে তবে আমরা নারীরা না।
 
ব্রেকিংনিউজ: বর্তমান অবস্থান নিয়ে আপনি কত সন্তুষ্ট?
আইনুন নাহার: পুরোপরি সন্তুষ্ট। আজ আমি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী, আমরা ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছি। নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে বাড়িঘর করেছি। এখন আমার কারখানায় ৩০টি মেশিনে প্রায় ৭০ জনের মতো কর্মী কাজ করছে। এখন ব্যবসায় প্রায় অর্ধ-কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ আছে।
 
ব্রেকিংনিউজ: আপনার ভবিষ্যত স্বপ্ন কি?
আইনুন নাহার: আমার ব্যবসাকে দেশে-বিদেশে আরও প্রসার করতে চাই। আমার তৈরি করা পণ্যের ব্র্যান্ডিং নাম ‘তৃণমূল্য কারুপণ্য’ কে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাই। এছাড়া ময়মনসিংহের যেসব নারী উদ্যোক্তা আছে তাদের ব্যবসার পরিসরকেও আরও বাড়াতে চাই। আমি একা বড় হতে চাইনা আমরা আশপাশের নারীদেরও আমি সফল দেখতে চাই।
 
ব্রেকিংনিউজ: নতুন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার বার্তা কী?
আইনুন নাহার: স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার স্বার্থকতাটাই আলাদা। তাই বলব একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হলে আপনাকে অবশ্যই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে মাঠে নেমে পড়তে হবে। প্রতিবন্ধকতা থাকবেই তবে ইচ্ছা থাকলে তা অভারকাম করা সম্ভব।
 
ব্রেকিংনিউজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
আইনুন নাহার:: ব্রেকিংনিউজ পরিবারকেও ধন্যবাদ।
 
ব্রেকিংনিউজ/এমআই/জিসা
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2