শিরোনাম:

তারাই মানুষ, তারাই দেবতা

মিথুন রায়
১ মে ২০১৮, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 4:11 আপডেট: 6:19
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা

“হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,/পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,/তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,/তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;/তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,”। সভ্যতার ইমারত গড়ার কারিগর শ্রমিকশ্রেণিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে তাদেরই জয়গান গেয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি নজরুল। যুগে যুগে আরও বহু মনীষীই কুলি ও মুজুর শ্রেণির পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। অধিকার আদায়ে লড়াই-সংগ্রামের কথা বলেছেন। 

আমাদের দীনের নবী মানবজাতির পয়গম্বর রাসূল সা. শ্রমিকদের ন্যায্য প্রাপ্য দ্রুত পরিশোধ করার জন্য বলেছেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও।’ (ইবনে মাজাহ : ২/৮১৭)

ভুলে যাবেন না, ভুল মানুষেরই হয়। আপনারও হয়। তাই ভুলকে ক্ষমা করে দেওয়াই প্রকৃত মানবতা। মানবতার এই জয়োল্লাসেরর জন্যই নবীজী বলেছেন- ‘তোমাদের কারো অধীনে যদি কেউ থাকে, তাহলে সে যেন নিজে যা খায় তাকেও তা থেকে খাওয়ায়। নিজে যা পরিধান করে তাকেও তা থেকে পরিধান করায়। এবং তোমরা তাদের ওপর সাধ্যের বেশি কাজ চাপিয়ে দিও না। যদি দাও তাহলে নিজেও সে কাজে তাকে সহযোগিতা করো।’ (সহিহ বোখারি : ২৫৪৫)

একইভাবে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থেও মানুষের ন্যায্য যথাযথভাবে যথাসময়ে পরিশোধের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের চারপাশের বাস্তবতা বিপরীত। আর এই বিপরীত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হয়েছে শ্রমজীবী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তাদের শ্রমের বিনিময়ে যে প্রাসাদ গড়ে উঠছে তাতে শ্রমিকের কোনও হক নেই, পুরোটাই এক ভোগ করছে মালিক। ফলে শ্রমিকের সঙ্গে মালিয়ের বৈষম্য ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে। 

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে শ্রমিকদের বড় একটা অংশ পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত। গত কয়েক বছরে বারবার প্রমাণ হয়েছে- পোশাক খাত দেশের অন্যতম রফতানি খাত। এ খাত থেকে সরকার সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আহরণ করে। একই সময়ে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় পোশাক খাতের উপর দিয়ে বারবারই ঝড় বয়ে গেছে। এখনও যাচ্ছে। এইসব ঘটনায় একদিকে যেমন পোশাক উৎপাদনের খরচ বেড়েছে অপর দিকে তৈরি পোশাক রফতানিতে বৈদেশি বাণিজ্যেও ভাটা পড়েছে। তবে বিজিএমইএ বারবারই বলছে, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে পোশাক খাতেও কাঙ্ক্ষিত রেমিটেন্স অর্জন সম্ভব নয়। 

সে যাই হোক- তবে পোশাক খাতসহ দেশের অন্যান্য শিল্পখাতে যেসব শ্রমিক কর্মরত আছেন তাদের ভাগ্য যেন শিকলে বাঁধা। গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ও দেশের বেশ কিছু শ্রমিক সংগঠন বারবারই দাবি জানিয়ে আসছে- শিল্পখাতের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার জন্য। কিন্তু তাদের গলছে না বরফ। মালিক পক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করছে না। উল্টো নিজেদের আখের গোছাতে শ্রমিকের ওপর চালানো হচ্ছে স্টিম রোলার। যখন তখন ছাঁটাই করা হচ্ছে শ্রমিকদের। পাওয়া পরিশোধেও গাফিলতির শেষ নেই। 

একটি দেশের চালিকা শক্তি শ্রমজীবী মানুষ। কৃষি থেকে শুরু করে কল-কারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান সর্বত্র শ্রমিকের ঘামে উর্বর হয় উৎপাদন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে শ্রমিক ফসল কিংবা পণ্য উৎপাদন করে তাকেই থাকতে হয় অভুক্ত। তাকেই থাকতে হয় সবচেয়ে বেশি অনিরাপত্তা অনিশ্চয়তায়। অথচ নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে তাদের কথা বলার জায়গাটুকুও নেই। সামান্য প্রতিবাদ উঠলে মালিক পক্ষ ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে গলা টিপে ধরে। শুরু হয় আটক, গ্রেফতার, ধরপাকড়। 

সরকারের সংশ্লিষ্ট শ্রম মন্ত্রণালয় শ্রমিকদের স্বার্থে বিভিন্ন সময় নানা সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানালেও শেষ পর্যন্ত প্রায়োগিত ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন চোখে পড়ে না। যেন পুঁজির দাস হয়ে পড়া এই রাষ্ট্র পুঁজিপতিদের কথায়ই উঠবস করছে। তাজরিন ফ্যাশনস কিংবা রানা প্লাজার ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারগুলো এখনও ধুঁকছে। পাচ্ছে না সহযোগিতা। পাচ্ছে না ন্যায়বিচারও। 

আমরা আজ উন্নয়নশীল দেশের তকমা গায়ে মেখেছি। কিন্তু উন্নয়নের বেসিক সঙ্গা কী? উন্নয়ন মানে কি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের না খেয়ে না পড়ে ধুকে ধুকে মরা। উন্নয়ন কি একটি রাষ্ট্রের কতিপয় মানুষের ফুলেফেঁপে উঠা। সমস্ত কাঙালের ধন চুরি করে রাজা বনে মসনদে বসে থাকার নাম কি উন্নয়ন? দেশটা যদি জনগণের হয় তবে উন্নয়ন বলতেও জনগণের সার্বিক উন্নয়নকে বুঝতে হবে। তাই নয় কি?  

আক্ষেপের ব্যাপার হচ্ছে, আর মাত্র কদিন বাদের শুরু হচ্ছে পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস। মাহে রমজান। অথচ এই রমজানের শুরু থেকে শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়। এবার তিনি পরিবার নিয়ে গ্রামে গিয়ে ঈদ করতে পারবেন তো! অথবা যাদের পরিবার গ্রামেই থাকে তারা বছরের দুই ঈদে বাড়ি ফেরার জন্য অধির অপেক্ষায় থাকে। সেই শ্রমিকের স্ত্রী-সন্তানও পথ চেয়ে থাকে কখন তার স্বামী কিংবা কখন তার বাবা বাড়ি ফিরবে। ঈদের কেনাকাটা করবে। একসঙ্গে বসে ভালোমন্দ খানাদানা করবে। 

কিন্তু সেই শ্রমিক যখন ঈদের আগের দিনও বকেয়া বেতন ও বোনাস পান না তখন তার সব স্বপ্ন ধুলোয় লুটায়। তার মন ছুটতে থাকে বাড়ির পানে, কিন্তু পা গুলো স্থির। তার অনুপস্থিতিতে পুরো পরিবারের ঈদের আনন্দও তখন মাটি হয়ে যায়। এ দায় কে নেবে? অর্থই তো বিনিময়ের একমাত্র মাধ্যম নয়। যে শ্রমিক সারা বছর ঘাম ঝরিয়ে কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করতো সেই শ্রমিকই সামান্য ক’টি টাকার জন্য পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পারলেন না। এর চেয়ে কষ্টের এর চেয়ে আক্ষেপের আর কি আছে!

১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকা ও কানাডায় প্রায় তিন লাখেরও বেশি শ্রমিক শিকাগোর হে মার্কেটের সামনে তরুণ নেতা এইচ সিলভিসের নেতৃত্বে কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা করার দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভে নেমেছিল। মালিকদের স্বার্থরক্ষাকারী মার্কিন সরকারের পেটোয়া বাহিনী পুলিশ ও কতিপয় ভাড়াটিয়া গুন্ডা সেদিন শ্রমিকদের ওপর গুলি চালিয়ে ৬ জন শ্রমিককে হত্যা করেছিল। আহত হয়েছিল আরও অন্তত শতাধিক শ্রমিক। তবে ইস্পাতকঠিন বিক্ষোভের এক পর্যায়ে আমেরিকার সরকার নির্ধারিত ৮ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা করতে বাধ্য হন। 

পরে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগোর রক্তঝরা অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়ে ওই ঘটনার স্মারক হিসেবে ১ মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৯০ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ‘মে দিবস’ হিসাবে পালন করতে শুরু করে। এবছর মে দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘শ্রমিক-মালিক ভাই ভাই সোনার বাংলা গড়তে চাই।’ 

প্রতিপাদ্য আর প্রতিশ্রুতি যাই হোক, শ্রমিক যদি তার শ্রমের ন্যায্য মজুরি না পায় তবে সে প্রতিবাদী হয়ে উঠবে, প্রয়োজনে জ্বালাও-পোড়াও করে রাস্তায় নামবে, অধিকার আদায়ে আগ্রাসী হয়ে উঠবে- এই তো স্বাভাবিক। মনে রাখতে হবে- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- রাষ্ট্র নামক রথের রশিটি কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের হাতে। ওদের হাত দিয়ে রশিতে টানা না পড়লে রথের চাকা ঘুরবে না, রাষ্ট্রেও নেমে আসবে অচলাবস্থা। 

লেখক: কবি ও সংবাদকর্মী

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2