Ads-Top-1
Ads-Top-2

মহান মে দিবস

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

আবু সাঈদ সজল
১ মে ২০১৮, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 03:17:00

‘‘স্বাভাবিক কাজের ঘণ্টা প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে শ্রমিক ও পুঁজিবাদীদের বহু শতাব্দী ব্যাপী সংগ্রাম’’ মার্কস (ক্যাপিটাল, প্রথম খন্ড)

মহান মে দিবসের আলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেটুকু প্রত্যাশা ছিল সে অনুযায়ী প্রাপ্তি ঘটেনি। এ দিবসটি হচ্ছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির লড়াইয়ের দিবস এবং যার শেষ ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে পুঁজিবাদকে অপসারিত করে সেখানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশে এর কিছুই নেই। আট ঘণ্টার শ্রম দিবস নিয়ে মে দিবসের সূত্রপাত। অথচ এখনো বাংলাদেশের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে আট ঘণ্টার বেশি শ্রম দিতে হয়। সেইসাথে বিশ্বে এখন এক শতাংশ ধনপতি মানুষের হাতে যত টাকা আছে, বাকি নিরানব্বই শতাংশ লোকের হাতে আছে তত টাকা। তারাই পৃথিবীটা লুটেপুটে খাচ্ছে। শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী স্বীকৃত অধিকারসমূহ বাস্তবায়িত হচ্ছেনা। শুধু কথার ফুলঝুড়ি নয়, বাস্তবে উন্নত বিশ্বের মতো শ্রমিকরা যেন তাদের শ্রম ও আত্মমর্যাদার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আর যেন রানা প্লাজার মতো লোভীমানবসৃষ্ট দানবের দ্বারা শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন না হয়। শ্রমিকরা যেন তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের লাল ঝা-া উর্ধ্বে তুলে ধরতে পারে। শ্রমিকরাও যেন মনে করতে পারে ‘আমিই এদেশের উন্নয়নের কারিগর, আমার শ্রম-ঘামেই দেশ এগিয়ে চলেছে সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোন নারী অথবা পুরুষ শ্রমিক যেন নিরাপত্তাহীনতা ও ন্যায্য মুজুরি থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে রাখতে হবে সজাগ দৃষ্টি। নারীদের সকল কাজে অগ্রাধিকার দিতে হবে কেননা তাদের হাতেই গার্মেন্টস শিল্পে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারছি। এদিনটি আমাদের ঐক্য হতে শেখায়, শেখায় কিভাবে ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায় সম্ভব। এ দিবসের সংগ্রাম এ সত্যটিকেই বহন করে চলেছে যে, অস্তিত্ব রক্ষা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামের পরাজয় নেই। 

মে দিবসের পেছনের ইতিহাস

আজ থেকে ১২৫ বছর আগে শ্রমিকদের দৈনিক কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট ছিল না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এমনকি তারও বেশি সময় শ্রমিকদের কাজ করতে হতো। কাজের পরিবেশ ছিল অমানবিক। চাকরির শর্ত বলে কিছু ছিল না। মালিকদের ইচ্ছে মতো সব কিছু চলতো। শ্রমিক কল্যাণ বলে কিছু ছিল না। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় শ্রমিকদের কাজ করে যেতে হতো। শুধু জীবিকার তাগিদে। কিন্তু সবকিছুরই তো একটা শেষ আছে। তাই শোষিত বঞ্চিত শ্রমিকেরা একদিন রুখে দাঁড়ালেন। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকেরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। এই ধর্মঘট সফল হয়েছিল ঠিকই, তবে এর জন্য শ্রমিকদের অনেক মূল্য দিতে হয়। শ্রমজীবী মানুষের একটি সমাবেশের ওপর কারখানা মালিকদের প্ররোচণায় সরকারের পুলিশ ও সেনারা গুলি চালালে ৬ শ্রমিক নিহত হন। হতাহত হন অনেকে। এ আন্দোলনের ৪ নেতাকে বিচারের প্রহসন করে ফাঁসিকাস্টে ঝুলানো হয় এবং অনেককে কারারুদ্ধ করা হয়।


সে শ্রমিকেরা ছিল নিরীহ, নিরস্ত্র। তাদের কোনো মশাল ছিল না। জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো। স্লোগানও দেয়নি তারা। তারা কোনো গাড়ি ভাংচুর করেনি। ঘেরাও করেনি কোনো শিল্প কারখানা। আগুন দেননি কারখানায়। তাদের দাবি ছিল সামান্য। তাদের কাজের সুস্থ পরিবেশ দাবি করেছিলেন। চাকরির নিরাপত্তা দাবি করেছিলেন; কিন্তু মালিক পক্ষের তা সহ্য হলো না। তারা অস্ত্রের জোরে শ্রমিকদের বাঁচার দাবি গুঁড়িয়ে দিতে এগিয়ে এসো। সরকার ও মালিকপক্ষের সে স্বপ্ন সফল হয়নি। সেসময় শ্রমিকেরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। সারা আমেরিকায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ববর্বর হত্যাকান্ডের নিন্দা করেছে। সে মার্কেটের ঘটনা আমেরিকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর আবেদন ছাড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সবখানে। এর তিন বছর পর ১৮৮৯ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এ সম্মেলনেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে পালন করবে। সেই থেকে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের মাইলফলক হিসেবে প্রতিবছর ১ মে মহান মে দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।তাই ১৮৯০ সাল থেকে ইউরোপ আমেরিকা ও পরে বিশ্বের সর্বত্র শ্রমজীবী মানুষের মিছিল সমাবেশ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে এ দিনটি পালন করে আসছে। বাংলাদেশ সরকার শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ এ দিনটি সরকারি ছুটি ঘোষণা করে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালন করে আসছে।

নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি

পৃথিবীর শ্রমজগতে নারী শ্রমিকেরাও বেশি হারে অংশগ্রহণ করেছে। পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি কাজ করতে গিয়ে তাদের পোহাতে হয় অনেক ঝামেলা। পুরুষ সহকর্মীদের হাতে উত্ত্যক্ত হওয়া ছাড়াও নিয়োগকারী এবং তাদের প্রতিনিধিদের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় নারী শ্রমিকদের। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রতিকার পাওয়া যায় না।এ জন্য নারী শ্রমিকদের কাজের সুস্থ পরিবেশ দাবি করা হয়।

আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনার যোগ্য। এখানে বর্তমানে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হচ্ছে গার্মেন্ট শিল্প। আমাদের দেশের তৈরি পোশাক বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রবেশ করে দেশের জন্য নিয়ে আসছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের শতকরা ৮০ ভাগ নারী। বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকান্ডে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আহত-নিহত হওয়ার সংবাদ প্রকাশ হয়। অগ্নিকান্ড যখন সংঘটিত হয় তখন মূল গেট থাকে বন্ধ। ভীত সন্ত্রস্ত শ্রমিকদের বেশিরভাগই নারী, তারা বেরিয়ে আসার পথ পায় না। আগুনে ঝলসে যায় তাদের শরীর। এমনিভাবে অনেক নারী শ্রমিক গার্মেন্টসের অগ্নিকান্ডে প্রাণ হারিয়েছেন। নির্যাতিতও হয়েছেন কেউ কেউ। এ নারী শ্রমিকরা অনেক কম বেতনে কাজ করেন বলে বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কমমূল্যে তৈরি পোশাক রফতানি করতে পারে।

অথচ এখনো শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি এবং ছুটি পায় না। এমনকি কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হলে এদের নালিশ করার কোনো জায়গা নেই। অনেক ক্ষেত্রে আইন তাদের নালিশ করার অধিকার দেয়নি। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ নেই যেখানে এই অসহায় শ্রমিক যেতে পারে। আশ্চর্য হলেও সত্য, একজন নারী শ্রমিক স্ত্রী হিসেবে স্বামীর বিরুদ্ধে দেনমোহর না দেয়া বা নির্যাতনের জন্য মামলা করতে পারে; কিন্তু সেই নারী যখন শ্রমিক হয় তখন তার মালিক যদি কাজ করিয়ে মজুরি না দেয় বা ঠিক সময়ে মজুরি পরিশোধ না করে অথবা কাজ করতে গিয়ে কারখানার অব্যবস্থাপনার জন্য সে আহত হয় তাহলে সেই নারী শ্রমিকের নালিশ জানানোর কোনো জায়গা নেই। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কর্মরত কিছুসংখ্যক শ্রমিক ব্যতীত দেশের হাজার হাজার নারী ও পুরুষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য।

আজ এ কথা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই, বিশ্ববাজারে নানাবিধ প্রতিযোগিতার টেকসই অবস্থান চাইলে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও শ্রমিক-মালিক সুস্থ শিল্প সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। কেননা কেবল সুস্থ শিল্পসম্পর্ক মালিক শ্রমিকের মধ্যে যে চাপা অসন্তোষের বীজ রয়ছে তা যেমন উপড়ে ফেলবে তেমনি এর মাধ্যমে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া সম্ভব হবে। এ কারণে মে দিবসে অনিবার্যভাবে উঠে আসে শ্রমিকের মজুরি ও নিরাপত্তার বিষয়টি। তাই মজুরির একটা জাতীয় মানদন্ড নির্ধারণ অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু শ্রমিকদের জন্যই এই মানদন্ড নির্ধারণ জরুরি নয় বরং দারিদ্র্য বিমোচনসহ সরকারের অসংখ্য কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন প্রকৃতরূপ লাভ করবে মজুরি মানদন্ডের ওপর।

সুতরাং আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিক যাতে শোষণ-বঞ্চনার শিকার না হয়, দেশের উন্নয়নে তাদের সবার ভুমিকা স্বীকৃত ও মূল্যায়ন হয়, উন্নয়নের সুফলে শ্রমিকের ন্যায্য প্রাপ্তি এবং জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, তাহলেই মে দিবস পালনের সার্থকতা। আজকের এই দিনে দেশে দেশে সব শ্রমজীবী-নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছি।

লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বাধিক পঠিত
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2