শিরোনাম:
Ads-Top-1
Ads-Top-2

বন্ধ হোক এ রক্তক্ষরণ!

ইমদাদুল হক
১৭ এপ্রিল ২০১৮, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 05:12:00 আপডেট: 07:47:00
রাজীব হোসেন

‘মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ থেকে মৃত্যু হয়েছে রাজীব হোসেনের। ওই রক্তক্ষরণের জন্য তার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ে।’
 
দুই বাসের চাপায় হাত হারানো রাজীব হোসেনের মৃত্যুর কারণ জানাতে গিয়ে গণমাধ্যমকে দেয়া বক্তব্যে এমনটিই জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসিরউদ্দীন। 

আবেগাপ্লুত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের প্রধান ও রাজীবের চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান মো. শামসুজ্জামান বলেছেন, ‘রাজীব নেই। আমরা খুব কষ্ট পাচ্ছি। কিন্তু রাজীবের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে ত্রুটির কারণে এমন মৃত্যু, সেই ত্রুটিগুলো সারানো দরকার।’

তাদের বক্তব্যগুলো নেহায়েত একজন চিকিৎসকের চেয়েও বেশি বলে মনে হয়েছে। মনোবিজ্ঞানীদের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবীদের কাছেও ভবিষ্যৎ পাঠের নিয়ামক হতে পারে কথাগুলো। এই বক্তব্যটি আমার কাছে জাতীয় জীবনের অগস্ত্য যাত্রার উপসর্গ বলেই মনে হচ্ছে। জীবন বাস্তবতায় নিহিত ক্ষুব্ধতার সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছি। মনে হচ্ছে, কেবল রাজীবের নয়, এই রক্তক্ষরণ এখন ছড়িয়ে পড়ছে আম জনতার ধমনীতে। মস্তিষ্কে-মস্তিষ্কে। কানাকড়ির হালখাতায় উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও লাল সালুতে মোড়া খাতার পরতে পরতে রক্তস্বল্পতা অনুভূত হচ্ছে। 

অসুস্থ প্রতিযোগিতার আটকে পড়া রাজীবের হাতের মতো কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে হাসপাতালে নিবিঢ় পরিচর্যায় থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আশিকুর রহমানের যকৃৎ ও ফুসফুসে আটকে আছে অজ্ঞাতগুলি।  

পুলিশের হাত থেকে আন্দোলনকারীদের বাঁচাতে গিয়ে আহত নাট্যকলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মো. তানভীর হাসানের বুকের সিনাটাও আগামীতে আর সটান হবে কি না বলা মুশকিল। 

এর আগে পরীক্ষার দাবি জানানোর ‘অপরাধে’ পুলিশের ছোড়া গুলিতে অন্ধত্ব বরণ করা সিদ্দিকুর, ছাত্রলীগের নির্যাতনে চোখ হারাতে বসা এহসান রফিকের ঘটনায় আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে সময়টি যেন বিভীষিকাময় হয়ে উঠছে ক্রমেই।   

এরমধ্যেই কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী যুগ্ম আহবায়ক নূরুল হক নূর, ফারুক হাসান, মুহম্মদ রাশেদ খানকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, রাশেদ খানের দিনমজুর পিতাকে থানায় ডেকে নেয়া- এসবই আমাদের মস্তিস্কের রক্তক্ষরণের বহিঃপ্রকাশ। অবশ্য এই বহিঃপ্রকাশটা হচ্ছে চুপে চুপে। 

এই যেমন মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসের কলাভবনের সামনে অবস্থিত অপরাজেয় বাংলা, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য ও মধুর ক্যান্টিনের সামনে অবস্থিত মধসূদন দে স্মৃতি ভাস্কর্যগুলোর চোখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কে বা কারা এই কাজটি করেছে তা অজ্ঞাত। তবে কেন এমনটা হতে পারে সে বিষয়টি কিন্তু ততটা গোপন থাকছে না। 

বলা হচ্ছে, ‘ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, এর প্রতিবাদেও কেউ এটা করতে পারে। কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়ার অর্থ হলো, প্রশাসনের চোখের সামনে শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করা হচ্ছে, কিন্তু প্রশাসন তা চোখে দেখা সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। হয়তো কেউ এজন্য কালো কাপড় দিয়ে সব ভাস্কর্যের চোখ ঢেকে দিয়েছে।’ 

এমন পরিস্থিতিতে অনেকের কাছেই দুই বাসের প্রতিযোগিতায় একটি তরতাজা জীবনের এমন বলিদানকে তাই দুই ধারার মুখোমুখি মতবাদ আর রাজনীতির বলিদান এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকে ধোঁয়াশায় ফেলে দিয়েছে। আহ্বান করছে অনাহূত কোনো এক ধুলিশার। ইতোমধ্যেই যে ধুলোয় মলিন হতে দেখা গেছে শৈশবে বাবা-মা কে হারানো রাজীবের অনুজ দুই সহোদরের। আর্থিক সংস্থান হলেও কতটা ভয় আর বিহ্বলতায় তাদের আগামী কাটবে তা কেবল ভুক্তভোগীই বলতে পারে। 

কিন্তু এটা কেবল তাদের বুঝলেই চলবে না। এই বার্তা, এই বেদনাটা হৃদয় দিয়ে যাদের অনুভব করা দরকার তাদেরকি ঘুম ভাঙবে না সহসাই! তাদেরকে কী নাগরিকে মায়া-মমতার, দুঃখ-বেদনার, স্নেহ-ভালোবাসার, মান-অভিমানের অনুভূতিগুলো আর স্পর্শ করবে না! আমরা কি পারি না নিজেদেরকে একবারের জন্য হলেও রাজীব ভাবতে! না কি সামনের দিনগুলোতেও এই দীর্ঘশ্বাস হারিয়ে যাবে লাভ আর লোভের বৈরি বাতাসে! বলিদান হবে অসুস্থ প্রতিযোগিতার কাছে!   

ব্রেকিংনিউজ/ইহক/এমআর

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2