Ads-Top-1
Ads-Top-2

পহেলা বৈশাখের ইতিবৃত্ত

আবু সাঈদ সজল
১৩ এপ্রিল ২০১৮, শুক্রবার
প্রকাশিত: 12:34:00

পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠার দিন। গ্রামীণ কৃষক সমাজের ঘরে ফসল তোলা আর খাজনা আদায়ের মধ্যে সামঞ্জস্যতা আনয়নের জন্য এই বঙ্গাব্দের শুরু। মোগল সম্রাট আকবরের বাংলা সন প্রবর্তনের মাধ্যমে ‘বঙ্গাব্দের’ শুরু। সেখান থেকেই এই ১লা বৈশাখের  আনুষ্ঠানিকতা পায়। কিন্তু কোত্থেকে এ বাংলা সনের মাস, সপ্তাহ নামের উৎপত্তি? জানাযায়, ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ নভেম্বর সম্রাট আকবর দ্বিতীয় পানি পথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে সিংহাসন লাভ করেন। তখন থেকেই রাজস্ব আদায়কে সহজ ও তার বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য  বাংলা সন প্রবর্তন করেন। প্রথমে এটি তারিখ-ই এলাহি নামে পরিচিতি লাভ করে এবং পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।

সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তার রাজত্বের ঊনত্রিশতম বর্ষে বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ নতুন এই সালটি তারিখ-ই এলাহি থেকে বঙ্গাব্দে পরিচিতি পায়। বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের ফলে বাংলায় এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। এর আগে মোগল সম্রাটরা রাজস্ব আদায়ের জন্য হিজরী বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করতেন। কিন্তু এতে কৃষকরা বিপাকে পরতেন।

আবুল ফজল আকবরনামা গ্রন্থে বলেন, হিজরী বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা কৃষকদের জন্য খুবই সাংঘর্ষিক ছিল। কারণ চন্দ্র ও সৌর বর্ষের মধ্যে ১১ থেকে ১২ দিনের ব্যবধান ছিল, ফলে দেখা যায় ৩০ সৌরবর্ষ ৩১ চন্দ্র বর্ষের সমান ছিল। তখন কৃষকরা সৌরবর্ষ অনুযায়ী ফসল সংগ্রহ করত কিন্তু চন্দ্রবর্ষ অনুযায়ী তাদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো। ফলে এটি কৃষকদের জন্য শুধুই বিড়ম্বনার ছিল। তাই আকবর তার রাজত্বের শুরু থেকেই দিন-তারিখ গণনার সুবিধার্থে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, আধুনিক ও যুগোপযোগী বর্ষপুঞ্জির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেন। এজন্য তার জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী বর্ষপঞ্জি সংস্কার করে তা যুগোপযোগী করে তোলার দায়িত্ব অর্পণ করে। বিজ্ঞানী শিরাজী ৯৬৩ হিজরী সালের শুরু থেকে বাংলা বর্ষ ৯৬৩ অব্দের সূচনা করেন। আরবি মুহাররম মাসের সাথে বাংলা বৈশাখ মাসের সামঞ্জস্য থাকায় বাংলা অব্দে চৈত্রের পরিবর্তে বৈশাখকে প্রথম মাস করা হয়। চন্দ্রবর্ষ হয় ৩৫৪ দিনে, আর সৌরবর্ষ হয় ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনে।

জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ থেকে বাংলা মাসের বর্তমান নামসমূহ গৃহীত হয়েছে। যেমন: বৈশাখ- বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, জ্যৈষ্ঠ- জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, আষাঢ়- উত্তর ও পূর্ব আষাঢ়া নক্ষত্রের নাম অনুসারে, শ্রাবণ- শ্রবণা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ভাদ্র- উত্তর ও পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্রের নাম অনুসারে, আশ্বিন- আশ্বিনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে, কার্তিক- কৃত্তিকা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, অগ্রহায়ণ (মার্গশীর্ষ) মৃগশিরা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, পৌষ- পুষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, মাঘ- মঘা নক্ষত্রের নাম অনুসারে, ফাগুন- উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে, চৈত্র- চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে। বাংলা সনে দিনের শুরু ও শেষ হয় সূর্যোদয়ে। এর থেকেই ক্রমে ক্রমে বাঙালির আত্মপরিচয় ফুটিয়ে তোলার নিমিত্তে পুরাতনের বিদায় জানিয়ে নতুনের আবাহনের উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বাস নিয়ে বাঙালিদের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের প্রেরণা জোগাতে শুরু করে।

বর্ষবরণে কবি গান, গাজীর গান, পুতুল নাচ, ভাটিয়ালী, মুর্শীদি, বাউল গান, যাত্রাপালাসহ লাঠি খেলা, বলি খেলা, ষাঁড়দৌড়, ঘৌড়দৌড় ইত্যাদি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাঙালি তার  মনের বহি:প্রকাশ ঘটায়। স¤্রাট আকবরের এ সংস্কার বাঙালির ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে কাল হতে কালান্তর।

লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2