শিরোনাম:
Ads-Top-1
Ads-Top-2

কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিকতা অযৌক্তিকতা

রাশেদ শাওন
১১ এপ্রিল ২০১৮, বুধবার
প্রকাশিত: 10:02:00

কোটা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে এখন আর শুধু ঢাকা নয়; সারাদেশ উত্তাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম এত বড় একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন হচ্ছে। বিদ্যমান এই পুরনো ব্যবস্থা নতুন করে সাজানোর পক্ষে পুরো দেশের মানুষ। কোটা ব্যবস্থাকে সব সময়ই অযৌক্তিক বলা যায় না- তাই এই ব্যবস্থা বাতিল নয়, সংস্কারের আন্দোলনে নেমেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
 
কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু হওয়ার সঙ্গে এর যৌক্তিকতা-অযৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মনে রাখা দরকার- শুধু বাংলাদেশ নয়; সারা পৃথিবীতেই কোটা ব্যবস্থার পেছনে যে তত্ত্বটি কাজ করে, তার নাম বিপরীত বৈষম্য তত্ত্ব (Reverse discrimination theory)। বৈষম্য দূর করার জন্য এক ধরনের বিপরীত বৈষম্যের সৃষ্টির কথা বলে এই তত্ত্ব।
 
বিপরীত বৈষম্য নীতি সমাজের বৈষম্যকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এবং প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সমাজে দুটি শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে। একটি গোষ্ঠী অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বিকশিত হয়। বিপরীত দিকে অন্য গোষ্ঠীটি থাকে বঞ্চিত, একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে। কিন্তু একটি সমাজের সুষম উন্নয়নের জন্য সব স্টেক হোল্ডারদের সমান অংশগ্রহণ জরুরি।
 
সেই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণিকে কিছুটা বঞ্চিত করে প্রান্তিক গোষ্ঠীকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা দিয়ে এগিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। তবে এটাও মনে রাখা দরকার- এই নীতি সাময়িক নীতি মাত্র। স্থায়ীভাবে প্রয়োগ করা হয় না। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি নীতিটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে।
 
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো, ভারত, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ব্যবস্থাটি প্রচলিত আছে। যুক্তরাজ্যে ১৯৯৫ সালের Disability Discrimination Act এবং ২০১০ সালের Equality Act- আইনের মাধ্যমে এই নীতি বহাল রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এর নাম ‘অ্যাফার্মেটিভ অ্যাকশন’। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ও আদিবাসীসহ অন্যান্য গোষ্ঠীকে এগিয়ে আনার জন্য এই নীতি প্রয়োগ করা হয়। অন্য দেশগুলোতেও একই অবস্থা।
 


এবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রথম কোটা ব্যবস্থা চালু হয়। তখন ৪০ শতাংশ ছিল জেলা কোটা, ৩০ শতাংশ ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটা আর ১০ শতাংশ ছিল যুদ্ধাহত নারী কোটা। পরে ১৯৭৬ সালে কোটায় পরিবর্তন আসে। মেধা কোটায় দেয়া হয় ৪০ শতাংশ, জেলা কোটায় ২০ শতাংশ আর মুক্তিযোদ্ধা কোটা আগের মতোই থাকে। কোটার ইতিহাস নিয়ে লিখতে গেলে আরো অনেক পেছন থেকে লিখতে হবে। সেখানে যাবো না।
 
যাই হোক, বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধরনের কোটা মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ সরকারি নিয়োগ হয় কোটায়। বাকি ৪৪ শতাংশ বরাদ্দ থাকে মেধা কোটায়। সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে উদ্ভট কোটা ব্যবস্থা বাংলাদেশে বিদ্যমান। এখানকার আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে কোটার বিদ্যমান ব্যবস্থা কিছুতেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
 
বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি প্রকৃত ‍সুবিধা বঞ্চিতদের সুবিধা না দিয়ে সুবিধাপ্রাপ্তরাই বেশি সুবিধা পাচ্ছে। এতে কোটার মূল লক্ষ্য বৈষম্য তো দূর হচ্ছেই না; বরং আরো বাড়ছে। বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা নির্ধারিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল সামাজিক স্তরবিন্যাসের (Social stratification) আলোকে। পেশা, আয়, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা, ভৌগোলিক অবস্থান ও ক্ষমতায়নের ভিত্তিতে কে কোটা পাবে, আর কে পাবে না- সেটা নির্ধারণ করা জরুরি। বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ১০ শতাংশের উপর কোটা কিছুতেই যৌক্তিক হতে পারে না।
 
যেমন মুক্তিযোদ্ধা কোটার কথা বলি- দেশের অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, যারা শুধু সুবিধা বঞ্চিতই নন; অনেকেই পরিবারের খরচ চালানোর মতো সক্ষম নন। আবার অনেক মুক্তিযোদ্ধাই আছেন, যারা কোটি কোটি টাকার মালিক, বড় বড় শিল্পপতি। কোটার কোনো প্রয়োজন তাদের বা তাদের সন্তানদের তো নেই-ই; বরং তারাই অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্ট করছেন। সেক্ষেত্রে কোটা পেলে সুবিধাবঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধারা পাবেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অবশ্য এখন চাকরির বয়স নেই। তাদের জন্য পর্যাপ্ত ভাতা এবং তা নিয়মিতকরণ জরুরি। যাদের বাসস্থান নেই, তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
 
এর বাইরে সমাজে বিশাল একটি প্রান্তিক শ্রেণিও পড়ে রয়েছে। যথার্থ সুযোগের অভাবে তারা বিকশিত হতে পারছে না। অনেকের আছে পেশাগত সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত আয়, সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের অভাব। ভৌগোলিক কারণেও বৈষম্য হয়। যেমন শহরের মানুষের চেয়ে নগরের মানুষ এবং নগরের মানুষের চেয়ে গ্রামের মানুষ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা অনেক কম ভোগ করে থাকেন। এক্ষেত্রে কম সুবিধাপ্রাপ্তদের জন্য কোটা থাকতে পারে। যাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ তাদের জন্যও। কিন্তু কোটার পরিমাণ এতটা বেশি হওয়া উচিত নয় যে রাষ্ট্র মেধাবীদের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।
 
পাশের দেশ ভারতে নিম্নবর্ণের মানুষের জন্য ৫০ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত। অবশ্য বাংলাদেশে এ ধরনের তীব্র বর্ণপ্রথা নেই। আছে সামাজিক বৈষম্য। সেই বৈষম্য দূর করতে যে ধরনের কোটা দরকার, এখানে তা-ই কার্যকর থাকা উচিত। আর কোটার ক্ষেত্রে শিক্ষা, চাকরি- সবক্ষেত্রে নয়; যেকোনো এক জায়গায় কোটা সুবিধা পাওয়া যাবে। যাকে রাষ্ট্র কোটা সুবিধা দিয়ে উচ্চ-শিক্ষার সুযোগ করে দেবে, নিজ যোগ্যতায় সে চাকরি খুঁজে নেবে।
 
মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান- এই যুক্তিতে কোটা বরাদ্দ অযৌক্তিক। বাবা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন- তাই সন্তান কোটা পেতে পারে না। অনেক সৎ, ভালো বাবার সন্তানরাই ব্যক্তিগত জীবনে সৎ হন না। বাবার ভালো কাজের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সুবিধা দেয়া যায় না। এটা এক ধরনের বর্ণবাদী চিন্তা। রাজার ছেলে রাজা হবে- সে ধরনের। বাবার অপকর্মের দায়িত্বও সন্তানের ওপর বর্তায় না; ভালো কাজের জন্যও তারা সুবিধা পেতে পারে না।
 

একই কথা বলা যায় নারী ও অন্যান্য কোটার ক্ষেত্রে। এখানেও সুবিধাবঞ্চিত নারীরাই কোটা পাওয়ার যোগ্য। যাদের পরিবার সচ্ছল, সামাজিক মর্যাদার দিক থেকেও এগিয়ে, তারা কোটা পেতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে বৈষম্যের শিকার শ্রেণিকে বেশি সুবিধা দিলে সেখানে বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, নারী ও অন্য সবাই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তবে পরিমাণটা অবশ্যই ভারসাম্যপূর্ণ থাকতে হবে।
 
যেকোনো যুক্তিতেই বাংলাদেশের বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা চরম অযৌক্তিক। এটাকে যৌক্তিক করা দরকার। ছাত্র সমাজ যে আন্দোলন করছে, সেটা কোটা বাতিলের জন্য নয়; বরং যৌক্তিক করার জন্য। এই দাবি বুদ্ধিজীবী মহল অনেক আগেও করেছেন। এখনো সাবেক আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ সবাই কোটার সংস্কার চাইছেন। আন্দোলনে দেখেছি, নারীরাও বিদ্যমান ব্যবস্থা চান না। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানরাও এই ব্যবস্থার বিরোধী।
 
সবমিলিয়ে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। চলমান আন্দোলন তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক বা সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে না দেখে, সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন হিসেবে দেখা উচিত। কোটা ব্যবস্থা সংস্কার হলেই চাকরি পেয়ে যাবো- এমন লক্ষ্য নিয়ে কেউ আন্দোলন করছে না। এই আন্দোলনের লক্ষ্য, কোটা ব্যবস্থার সংস্কার হলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ একটি অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে।
 
লেখক: সাংবাদিক, কূটনীতিক বিশ্লেষক
 
ব্রেকিংনিউজ/আরএস/জিসা
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2