Ads-Top-1
Ads-Top-2

কোটাপ্রথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী

জাহিদুল ইসলাম
৯ এপ্রিল ২০১৮, সোমবার
প্রকাশিত: 04:37:00 আপডেট: 04:40:00

দেশজুড়ে চলছে স্বতঃস্ফূর্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিপুল সংখ্যক অংশগ্রহণই বলে দেয় তারা এই অভিশাপ থেকে মুক্তি চান।  ঠিক এমন সময় কোটাপ্রথা সংস্কার চেয়ে করা রিট খারিজের সংবাদ মন খারাপের কারণ হলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ ইতিহাস বলে কোন নৈতিক দাবিই এতটা সহজে আদায় করা যায়নি। সরকার কোটা ইস্যুকে সবসময়ই সেনসেটিভ হিসেবে ধরে এটার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কারণ একটাই, এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বার্থ জড়িত।  এখন প্রশ্ন হচ্ছে  জাতির বৃহৎ স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করাতে তো কোন অপরাধ নেই।
 
কোটার সঠিক ইতিহাস যদি জেনে না থাকেন তাহলে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছি- হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটাপ্রথা চালু করেছিলেন ১৯৭২ সালে। যেখানে শুরু থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০% কোটা রাখা হয় শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধা প্রদানের জন্য। বঙ্গবন্ধু মারা যাবার পর পরের ২০ বছরেও এই কোটা প্রথায় কোন সংযোজন বিয়োজন করা হয়নি। কিন্তু ১৯৯৭ সালে কাদের পরামর্শে যেন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্যও কোটার সুবিধা প্রদান করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যেটা চলছে এখনও। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা কি ৩০ লাখ শহীদের চেয়ে দামি হয়ে গেলেন? দুই লাখ ধর্ষিতা বাঙালি নারীর চেয়েও কি তারা দামি হয়ে গেলেন? কোটার সুবিধা যদি দিতে হয় তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের দেয়ার আগে ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ  সম্ভ্রম  হারানো মা-বোনের পরিবারকে দিন।
 
বাস্তবতা কেন বোঝার চেষ্ট করছেন না? ১৯৯৭ সালে যেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরাও মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা পাবেন তার পর থেকে গত ২০ বছরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা কত বেড়েছে তার খোঁজখবর কি রেখেছেন? এইতো সেদিন  মাননীয় মন্ত্রীমহোদয় পরিতাপের সুরে বললেন তালিকায় চার বছরের শিশুও রয়েছেন।  গত ৪৫ বছরে ছয়বার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও মানদণ্ড ১০ বার পাল্টেছে। ১৯৯৪ সালে দেশে সরকারি হিসেবে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৮৬ হাজার। মাঝে ৯৭ সালে নতুন নিয়মে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরাও কোটার সুবিধা পাবেন আইন হলো। ফলাফল ২০০১ সালে দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা হলো  এক লাখ ৫৮ হাজার। যেটা মুক্তিবার্তা বা লাল বইয়ের হিসেব। আবার মুক্তিবার্তা সবুজ বইয়ের হিসেবে এক লাখ ৮৬ হাজার। সবশেষ ২০১৭ সালের হিসেবে দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ৩১  হাজার। এরপরও কি বোধগম্য হবার বাকি থাকে শুধুমাত্র কোটার সুবিধা ভোগ করার জন্যই বিভিন্ন সরকারের আমলে এক লাখের বেশি নতুন মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। সেই তাদের জন্য দেশের মেধাবী জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করা কতটা যৌক্তিক?
 
১৯৭২ সালে ২০ শতাংশ মেধা, ৪০ শতাংশ জেলা, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা আর ১০ শতাংশ যুদ্ধবিধ্বস্ত নারী কোটা ছিল। ১৯৭৬-এ তা পরিবর্তন করে মেধা ৪০ শতাংশ আর জেলা কোটা ২০ শতাংশ করা হয়। ১৯৮৫-তে মেধা ৪৫ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা ৫ শতাংশ করা হয়। প্রথম থেকেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ ছিল। পরে এ কোটার সুযোগ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পরবর্তীতে নাতি/নাতনিদেরও দেয়া হয়।

 

যখন জেলা কোটা চালু হয়েছিল তখন জেলা ছিল ১৯টি। এখন ৬৪টি। অথচ কোনো কোনো নিয়োগে ৬৪টি পদই থাকে না। আবার বেশিরভাগ সময় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় পদ খালি থাকে। কিন্তু সংরক্ষিত হওয়ার কারণে এ পদগুলোতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ সম্ভব হয় না।
 
১৯৭৭ সালে তৎকালীন পে ও সার্ভিস কমিশনের একজন সদস্য বাদে সবাই সরকারি নিয়োগে কোটাব্যবস্থার বিরোধিতা করেন। কোটার পক্ষে অবস্থা নেয়া এম এম জামান প্রচলিত কোটাগুলো প্রথম ১০ বছর বহাল রেখে ১৯৮৭ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছরে ধীরে ধীরে কমিয়ে দশম বছরে তা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালেই এই কোটাব্যবস্থাকে আরো সম্প্রসারিত করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের এর আওতাভুক্ত করা হয়।
 
তাই সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার। দেশের স্বার্থে সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে কোটা সংস্কার করা যেতেই পারে। কারণ যৌক্তিকভাবে চিন্তা করলে দেখুন কোটার জন্য যুগ যুগ ধরে হাজার হাজার পদ শুন্যই থেকে যাচ্ছে। সেই জায়গাটাতে মেধাবীরা আসলে ক্ষতি কিসে? আমরা কেন ভুলে যাই মুক্তিযোদ্ধের চেতনাই ছিলো বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ। এখন যদি কোটার মাধ্যমে সেই বৈষ্যম্যকেই ফিরিয়ে আনি কি হলো আমাদেরে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার? আরেকটা বিষয় কেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা গুরুত্ব দিচ্ছেন না সেটাও আমার বোধগম্য নয়। দেশের বিশাল মেধাবী জনগোষ্ঠীকে কেন প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে। তাদের নৈতিক ও ন্যায্য দাবি মেনে নিলে কি মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করা হবে? তারিা তো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীশক্তি নয়। শাস্তি যদি পেতেই হয় তাহলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীশক্তিতে যারা ছিলেন তারা পাবেন। তাদের তালিকা করুন। রাজাকার, আলবদর, আল শামসসহ মুক্তিযোদ্ধে বিরোধীতাকারী সকলকে এবং তাদের  প্রজাতন্ত্রের যে কোন চাকরি করা থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে। তাই বলে কোন না কোন ভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তাদেরকে বঞ্চিত করতে হবে কেন? দেশের প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধারই তো স্বপ্ন ছিলো একটা সমৃদ্ধ সোনার বাংলার। সে সোনার বাংলা বিনির্মানে দেশের মেধাবীদেরকেও কাজে লাগানো হউক। সংখ্যা অনুপাত অনুযায়ী দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের  পরামর্শে একটা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হউক কোটা।
 
নিজেদের ব্যর্থতাকেও একটু বড় করে দেখার চেষ্টা করুন। আপনি আমি যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি এতটাই যত্নশীল থেকে থাকি তাহলে যেদিন এই দেশে রাজাকারদের গাড়ীতে জাতীয় পতাকা উড়ল সেদিন কোথায় ছিলো আমাদের চেতনা। সেদিন কেন রাজপথ কাঁপল না? ক্ষমতায় না থাকা কিংবা বিরোধী দলে থাকা কিংবা আমজনতা কেউই এর দায় এড়াতে পারে না। তাই এত এত চেতনার বুলি আওড়ানোর চেয়ে একটা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথকে আরও গতিশীল করতে দেশের মেধাবীদের রাস্তা কণ্টকময় রাখা যাবে না।
 
লেখক: জাহিদুল ইসলাম, সাবেক শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 
ব্রেকিংনিউজ/জিসা
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বাধিক পঠিত
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2