Ads-Top-1
Ads-Top-2

অন্তরালে, খবরের অন্তর্জালে

ইমদাদুল হক
৯ এপ্রিল ২০১৮, সোমবার
প্রকাশিত: 01:04:00

ইন্টারনেট তথা অন্তর্জালে দ্রুত ছুটছে খবর। আর এই খবরের টানে ক্রমেই অনলাইনমুখী হচ্ছেন দেশের সব বয়সী রেডিও শ্রোতা, টেলিভিশন দর্শক এবং কাগজের পাঠক। শুরুতে তরুণরা অনলাইনমুখী হলেও এখন এই খবরের জন্য বয়সীরাও অনলাইনমুখী হচ্ছেন। ফলে চায়ের কাপে ধোঁয়ার সঙ্গে দিনের শুরুতে খবরের পাতায় চোখা বোলানোর চিরায়ত দৃশ্যপট এখন বদলে যেতে শুরু করেছে।
 
তাই বলে কী নাগরিকরা খবর বিমুখ হয়ে পড়ছে? তা কিন্তু নয়। বরং তারা এখন বিচিত্র তথ্যের জন্য স্মার্টফোনের দিকে ঝুঁকছেন। ইন্টারনেট সংযোগে তারা বাধাহীন ও বৈচিত্রময় খবরে চোখ বুলাচ্ছেন।
 
আগে যেখানে দিনে একবার পত্রিকার পাতায় চোখ বোলাতেন সেই অভ্যাস এখন মুহূর্ত বিরতিতে গিয়ে ঠেকেছে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে এবং ঘুম থেকে জেগেই নয়, খবর জানতে এখন কাজের ফাঁকে ফাঁকে যেমন অনলাইনে ঢুঁ দিচ্ছেন, তেমনি ঘর থেকে বের হওয়ার আগে, অফিস ছুটির আগে এমনকি তন্দ্রা যাওয়ার আগেও খবর জানছেন।
 
আর এর কারণে গত ১ এপ্রিল থেকে ভোরের রেডিও অনুষ্ঠান প্রভাতী আর রাতের অনুষ্ঠান পরিক্রমা বন্ধ করে দিয়েছে বিবিসি বাংলা।
 
কেন এই অনুষ্ঠানগুলো বন্ধ করা হলো। এমন প্রশ্ন জবাবে পাঠকদের বিবিসি বাংলার সম্পাদক সাবির মুস্তাফা বলছেন, ‘কয়েক বছর ধরে আমরা খেয়াল করছি, বাংলাদেশের রেডিও শ্রোতা ক্রমশ কমছে এবং বেশিরভাগ মানুষ খবর শোনা বা জানার জন্য টেলিভিশনের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। আজকের বাংলাদেশে ৮১ শতাংশ মানুষ টেলিভিশন দেখেন আর রেডিও শোনেন মাত্র ১৫ শতাংশ।  অন্যদিকে তরুণরা তাদের খবর আর বিনোদনের চাহিদা মেটাতে ক্রমশ ডিজিটাল মাধ্যম এবং অনলাইনে যাচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি রেডিও অনুষ্ঠান কমিয়ে টেলিভিশন এবং অনলাইনে আমাদের পরিবেশনা আরও বৃদ্ধি করবো।’
 
বোঝাই যাচ্ছে, কেবল খবরের সুনির্দিষ্ট পোর্টাল নয়, সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক হয়ে রাজ্যের ডোমেইন থেকে খবর নিচ্ছেন। একটি - দুইটি কিংবা গৎবাঁধা কোনো ডোমেইনে আটকে থাকছেন না। বাড়তি কোনো খরচ না থাকায় মনে সন্দেহ জাগা মাত্রই এই খবরের সূত্র ও সত্যতাও নিরীক্ষা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ডাকসাইটে খবরের মাধ্যমগুলো বাধ্য হয়েই নড়েচড়ে বসছেন। ছুটছেন অনলাইন প্রকাশনায়। এর ফলে অনেকটা জ্যামিতিক হারেই ঋদ্ধ হচ্ছে অনলাইনভিত্তিক অর্থনীতি।
 

অথচ এখান থেকে সুফল পাচ্ছেন না দেশীয় অনলাইন পোর্টালে বিনিয়োগকারীর। প্রয়োজনীয় নীতিমালার অভাবে তারা এই অর্থনীতির অংশীদার হতে পারছেন না। দুধের যে স্বর জমছে তা চলে যাচ্ছে মোড়লদের হাতে। কোনো রকম কর না দিয়েই হাজার হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে গুগল, ইউটিউব আর ফেসবুকের পকেটে। আর ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে কর গুণতে হচ্ছে ভোক্তাদের। আবার ইন্টারনেট ছড়িয়ে দেয়ার ফাইবার অপটিক এবং মডেমের ওপর কড়া শুল্ক থাকায় এই অন্তর্জালের ঐন্দ্রিজালিক আবাহনে অবগাহন করতে বেগ পাচ্ছেন গ্রামের অধিবাসীরা। সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে তারা থাকছেন অন্তর্জালের অন্তরালে।
 
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্জালের একটি জাতীয়  কাঠামো তৈরি করা না গেলে আগামীটা খাত সংশ্লিষ্টদের জন্য খুব একটা সুখকর হবে না। ইন্টারনেটের বিস্তারের সাথে সাথে জাতীয়ভাবে একটি অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী তারহীন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাও জরুরি। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ফেসবুক-ইউটিউব ও গুগলের মতো প্লাটফর্মগুলোর জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। দেশে বিদ্যমান বেশতো, ১০ মিনিট স্কুল ও পিপীলিকার মতো ডোমেইনগুলোর সংখ্যা ও পরিসর বিস্তারে সরকারকেই এগিয়ে আসা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এজন্য এসব সাইট ব্যবহারে ডেটা ফ্রি সুবিধা চালু করা যেতে পারে। জাতীয়ভাবে ফ্রি ম্যাসেঞ্জার চালু করা যেতে পারে। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ সংযোগের একটি মহাসড়ক তৈরি করে তা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া না হলে আগামীতে কপালে বানরের তৈলাক্ত বাঁশের চেয়ে বেশি কিছু মিলবে না।
 
আমার মনে হয়, যারা ইন্টারনেটনির্ভর ব্যবসায় করছেন তাদেরকে থোক বরাদ্দের মাধ্যমে এই খাতটি উন্নয়ন করা গেলে প্রকৃত অর্থেই প্রযুক্তি অর্থনীতির পথে নিজেদের অবস্থা সমুন্বত করা সম্ভব হবে। নতুবা গল্পকার আবু ইসহাকের জোঁক গল্পটির সঙ্গে সত্বরই আমাদের সাক্ষাৎ ঘটবে।
 
এর আলামত কিন্তু ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ফেসবুক থেকে তথ্য বেহাত হচ্ছে। আবার সেই ফেসবুকেই পাসপোর্টে এন্ডোর্স করা টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন বিজ্ঞাপনদাতারা। সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকলেও খাত সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে জানা গেছে, কেবল দেশের প্রতিষ্ঠিত ই-কমার্স ব্যবসায়ীরাই ডিজিটাল বিজ্ঞাপন দিয়ে এই ফেসবুকে বছরে এক লাখ ডলারের বেশি খরচ করছে। এর বাইরে প্রতিদিন ৫-১০ ডলারের বিজ্ঞাপন বুস্ট (বিজ্ঞাপন প্রচার বাবদ খরচ) করছে দেশের ১০-১৫ হাজার এফ-কমার্স (ফেসবুক নির্ভর ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান) প্রতিষ্ঠানগুলো।
 
দেশে ইন্টারনেট ও ফেসবুক ব্যবহারকারী বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্য ও সেবার প্রচার ও প্রসারের জন্য বিকল্প মাধ্যম হিসেব পছন্দের তালিকায় রেখেছেন গুগল-ফেসবুক-ইউটিউব। স্বল্প অর্থ খরচে বিপুল সংখ্যক টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছতে এই মাধ্যমগুলো এখন পছন্দের শীর্ষে ব্যবসায়ী ও সেবাপণ্য নির্মাতাদের। বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আট কোটি আট লাখ ২৯ হাজার। এর মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারীর সংখ্যা তিন কোটির বেশি। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে অনলাইন দুনিয়া বড় মাধ্যম হয়ে ওঠার কারণে  একইভাবে মোবাইলফোন আমদানিকারক এবং অপারেটররাও এখন বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছেন এই নেটওয়ার্কে।
 
বলা চলে মোট বাজেটের অর্থের ৯৯ ভাগই চলে যাচ্ছে বিদেশী বেনিয়াদের পকেটে। অথচ এই প্লাটফর্মগুলো জনপ্রিয় করে রাখছেন এখানকার সাধারণ মানুষই। তাদের কনটেন্টের বদৌলতে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এই নেটওয়ার্ক। অথচ ফেসবুকে যারা পোস্ট লেখেন তারা কিন্তু বন্ধুবান্ধবের লাইক-শেয়ার ছাড়া আর্থিক কোনো সুবিধা পন না। এই সুবিধাটিতে রয়েছে এই কর্তৃপক্ষের একক আধিপত্য। কোনো রকম কর না দিয়েই তারা আয় করছেন। আর সেই আধিপত্যকে কিন্তু অনেকটা ঘোরের বসেই আমরা আরও প্রতিষ্ঠিত করছি। বিজ্ঞাপনে নিজস্ব ওয়েব ঠিকানার পরিবর্তে প্রচার করছি ফেসবুক, ইউটিউব লিংক।
 
দুঃখের বিষয় হলো, কেবল জনতা নয়, সরকারের অনেক মন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ও এই চোরাবালিতে মুখ গুজেছেন। নির্লিপ্ত রয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনেরাও। ভুয়া লাইক, শেয়ার কিনে পেজ ভেরিফাই করতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন না অনেক সেলিব্রেটি। এতে করে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ব্যবস্থাটাও কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে অন্তর্জালের এই অন্তরালকে জাতীয়তার নিরিখে সমন্বিত ভাবে গ্রন্থিত করা না গেলে হ্যামিলিয়নের বাঁশি ওয়ালাদের সুর মূর্চ্ছনায় জেগে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়বে।   
 
লেখক: সাংবাদিক, বিশ্লেষক
 
ব্রেকিংনিউজ/ইহক/জিসা
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2