Ads-Top-1
Ads-Top-2

যেভাবে আমি আফগানিস্তানে নিহত হলাম

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর
৬ এপ্রিল ২০১৮, শুক্রবার
প্রকাশিত: 01:11:00

আমি যে বছর হাফেজ হই- ১৯৯৮ সালে। সম্ভবত, আমার পরিবারের প্রায় সবাই আমার মাদরাসার মাহফিলে হাজির হয়েছিল। মা-বাবা, বোন, চাচি এমনকি আমার বৃদ্ধ দাদিও ভ্যানে চড়ে চলে এসেছিল আমাকে পাগড়ি প্রদানের শুভমুহূর্ত দেখার আশায়।
 
আমরা যারা পুরো কুরআন হেফজ করে হাফেজ হয়েছিলাম, মাহফিলের আগে থেকেই সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে অব্যক্ত উত্তেজনায় মাদরাসার এখানে সেখানে ছুটে বেড়াচ্ছি। আমাদের সবারই বয়স ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে, মাথায় সাদা পাগড়ি বাঁধার অপেক্ষায় সাদা সারসের মতো কখনো মাদরাসার দফতরে, কখনো মসজিদে, কখনোবা মঞ্চের পেছনে ছোটাছুটি করছি।
 
একটু পরই হাজার হাজার মানুষের সামনে মঞ্চ থেকে আমাদের নাম ঘোষণা করা হবে, প্রধান অতিথি আমাদের মাথায় সাদা পাগড়ি পরিয়ে দেবেন, হাফেজরা তো বটেই, সবার পরিবারের সদস্যরাও ঢিবঢিব হৃদয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন— কখন আসবে সেই শুভক্ষণ?
 
হাজারো উপস্থিতির সামনে যখন তাদের সন্তানের নাম ঘোষণা করা হবে, গর্বে বুকটা স্ফীত হয়ে যাবে সবার। কুরআনে হাফেজের মা-বাবা হওয়া, এ কি কম গর্বের বিষয়? মঞ্চের সামনে বসে বাবা-ভাই-দাদা অপেক্ষা করছিলেন, মহিলা প্যান্ডেলে অপেক্ষা করছিলেন মা-বোন-চাচি-দাদি..!
 
গত ২ এপ্রিল ঠিক এমনই একটা মাহফিল চলছিল আফগানিস্তানের কুন্দুজ প্রদেশের দাশতে আরচি এলাকার একটি মাদরাসায়। মাদরাসার হাফেজ ছাত্রদের পাগড়ি প্রদান উপলক্ষে মাদরাসা সংলগ্ন মসজিদে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় হাজারখানেক মানুষ, যাদের অধিকাংশই হাফেজ ছাত্রদের অভিভাবক, এলাকার সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এবং মাদরাসাসংশ্লিষ্ট লোকজন।
 
খবর ছিল, এ মাহফিল উপলক্ষে তালেবানের কয়েকজন শীর্ষ নেতাও উপস্থিত হয়েছেন।
 
গোপন সূত্রে খবর পেয়ে তালেবানের এই শীর্ষ নেতাদের হত্যা করতে আফগান বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার মাহফিলস্থলে বোমা ও গুলিবর্ষণ করে। মুহূর্তে মসজিদে উপস্থিত মাদরাসাছাত্র, তাদের অভিভাবক, সাধারণ মুসল্লিসহ প্রায় ১০১ জন নিরীহ ব্যক্তি নিহত হন।
 
তালেবানের কোনো শীর্ষনেতা নিহত হয়েছেন কি-না, সে খবর এখন পর্যন্ত আফগান অফিসিয়াল বা কোনো নিউজ এজেন্সি নিশ্চিত করতে পারেনি।
 
উল্লেখ্য, এই চপার হেলিকপ্টারটি আফগান সরকারকে দান করেছিল ভারতীয় সরকার এবং এর কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে আসছিল মার্কিন বাহিনী।
 
দুই
একবার চিন্তু করুন, এই বোমা হামলা যদি ১৯৯৮ সালে আমার পাগড়ি প্রদান মাহফিলে করা হতো আর সেই হামলায় আমার বাবা-মা-বোন-দাদি নিহত হতেন এবং ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে যেতাম, তাহলে আমার করণীয় কী হতো?
 
একজন আফগানি বা একজন তালেবান হিসেবে নয়, আমি আপনাকে একজন মাছে-ভাতে বাঙালি হিসেবেই জিজ্ঞেস করছি— আপনার পরিবারের চারজন সদস্যকে আপনার চোখের সামনে বিনা দোষে বোমায় ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে থাকতে দেখার পর মনে মনে আপনি কী শপথ নিতেন?
 
আপনার কি ইচ্ছা হতো না এই বোমা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে? জীবনের শেষদিন পর্যন্ত হলেও আপনি সেই হত্যাকারীদের খুঁজে বেড়াতেন, আপনার স্বজন হত্যার প্রতিশোধ নিতে তাদেরও হত্যা করার অভিপ্রায় কোনোদিনই আপনি ভুলতে পারতেন না।
 
‘অ্যামেরিকান অ্যাসাসিন’ নামে একটা গল্পের বিষয়ে জানি। যার শুরুতেই দেখা যায়, গল্পের নায়ক তার বাগদত্তাকে নিয়ে একটি সমুদ্রসৈকতে অবকাশ যাপন করছিলো। হঠাৎ সেখানে একদল জঙ্গি হামলা করে এবং নায়কের বাগদত্তা ক্রসফায়ারে নিহত হয়।
 
পরবর্তীতে বাগদত্তা হত্যার প্রতিশোধ নিতে সাধারণ একজন যুবক থেকে সে যোগ দেয় সিআইএ-র গোপন মিশনে। দীর্ঘ ট্রেনিংয়ের পর সে সেইসব জঙ্গিকে হত্যা করে যারা তার বাগদত্তাকে হত্যা করেছিল।
 
আপনারা অনেকেই হয়তো হলিউডের এমন গল্পের সঙ্গে পরিচিত। হলিউডের অধিকাংশ অ্যাকশন সিনেমাতে দেখা যায়, নায়কের স্ত্রী-সন্তান বা বান্ধবীকে ভিলেন হত্যা করে। সেই হত্যার প্রতিশোধ নিতে নায়ক প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে একে একে হত্যা করে তার হত্যাকারীদের। কতো উদাহরণ চান?
 
হলিউডের এমন হাজার হাজার গল্প, উপন্যাস মুভি রয়েছে যেখানে নায়ক তার প্রিয়জন হত্যার প্রতিশোধ নিতে ডজন ডজন ভিলেনকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং যারাই এই হত্যাদৃশ্য দেখে থাকেন তারাই মনে করেন, এমনটিই তো হওয়ার কথা ছিল।
 
এ প্রতিশোধ নেয়া নায়কের ওপর অন্যতম ফরজ দায়িত্ব। নায়ক যতো নৃশংস কায়দায় ভিলেনকে হত্যা করতে পারে, দর্শক/ পাঠক ততো বেশি হাততালি দেয়। এর চেয়ে ন্যায়বিচার আর হতে পারে না, রক্তের বদলে রক্ত! খুনের বদলা খুন!
 
তিন
তো, মিস্টার আমেরিকা, আপনাদের হিরো প্রতিশোধ নিলে সেটা জাস্টিস, সে আমেরিকান অ্যাসাসিন, সে হিরো; আর আফগান, ইরাকি, সিরীয়, প্যালেস্টাইনীয়, কাশ্মিরি কেউ প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিলে সে হয়ে যায় টেরোরিস্ট! কতো বড় মিথ্যুক আপনারা!
 
নিজেরা বিশ্ববাসীকে টনকে টন মুভি-উপন্যাস গিলিয়ে বলছেন, কিল ফর রিভেঞ্জ- প্রতিশোধের জন্য হত্যা মহাপুণ্য। আর ১৬ বছর ধরে আফগানিস্তানে সাত লাখ মানুষ খুন করার পর সেখানকার কেউ প্রতিশোধ নিতে চাইলে তাকে বলবেন সন্ত্রাসী!
 
সিরিয়ায় দশ লাখ মানুষ হত্যার পর কোনো সিরীয় নিজের সন্তান হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে ব্রতী হলে তার জন্য বরাদ্দ হচ্ছে ব্যারেল বোমা! ইরাকের নাবালক কিশোর নিজের মায়ের হত্যার প্রতিশোধে অস্ত্র তুলে নিলে তাকে বলছেন ‘আত্মঘাতী কিশোর’। এ কেমন অসভ্য সভ্যতা নির্মাণ করছেন আপনারা? এটাই ন্যায়বিচার?
 
এই ন্যায়বিচারের বাণী ভরে দিয়েই প্রতিদিন টনকে টন বোমা ফেলছেন আফগান, সিরিয়া আর ইরাকে? বাহ! আপনাদের বুকে থাকলে সেটা প্রাণ, আর আফগানদের বুকে থাকলে সেটা কেবল নিশ্বাস মাত্র! এতোই সস্তা মুসলিমদের প্রাণ?
 
আমেরিকান কোনো সৈন্য বাগদাদে ইরাকিদের হত্যা করতে এসে নিহত হলে তাকে নিয়ে সিনেমা বানানো হয় ‘অ্যামেরিকান স্নাইপার’ এবং সেই সিনেমাকে আপনারা অস্কারেও ভূষিত করেন।
 
আর ব্লাডি আফগানদের নিয়ে বানানো সিনেমা হয় ‘জিরো ডার্ক থার্টি’, যেখানে আফগানি মানেই খুনে, নৃশংস মানুষ! বিশ্ববাসীকে মিডিয়া আর চলচ্চিত্র দিয়ে মগজ ধোলাই করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
 
আমেরিকার দুজন মানুষ খুন হলে প্রতিটা মিডিয়ার হেডলাইন হয় সে খবর। আর আফগানিস্তানে ১০০ জন তাজা প্রাণ বোমায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো, অথচ সিএনএন-এ এ সংক্রান্ত কোনো নিউজই পেলাম না, একটা লাইন পর্যন্ত না!
 
আজকের যে কিশোরের চোখের সামনে কুন্দুজ ম্যাসাকার হলো, সেই কিশোর যদি কাল কাবুল বিমানবন্দরে গাড়িবোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, তখন কাকে আপনি দোষ দিবেন? সে যদি প্রতিশোধের চাপা আগুন বুকে লুকিয়ে একদিন আমেরিকার কোনো শহরের নাইটক্লাবে গিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায়, সে প্রতিশোধকে আপনি কীভাবে বিচার করবেন?
 
আজকের আমেরিকা কি নিজেই এই সন্ত্রাসের জন্ম দিচ্ছে না? একেকজন মানুষের হত্যাকাণ্ড অন্তত পাঁচজনকে প্রতিশোধ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। তাহলে? কীভাবে আপনি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে পারেন?
 
এই নৃশংস পদ্ধতিতে পৃথিবী থেকে কোনোদিন কি সন্ত্রাস নির্মূল সম্ভব, যেখানে একের হত্যায় প্রতিশোধ নিতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে পাঁচজন? ১০০ জনের জানাজা থেকে শপথ গ্রহণ করছে বেঁচে থাকা আর ৫০০ জন। কীভাবে আপনি সন্ত্রাসবাদকে সমূলে উৎপাটন করবেন?
 
বরং বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ প্রসারে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা যদি কেউ পালন করে থাকে, তবে সেটা এককভাবে আমেরিকার অবদান।
 
যে ‘সন্ত্রাসবাদ’ গুটিকয়েক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত ছিল, আমেরিকা সেটার বিশ্বব্যাপী প্রসার ঘটিয়েছে এবং ভিন্ন ভিন্ন নামে একেক দেশে সাপ্লাই করেছে। আমেরিকা : দ্য মোস্ট টেররিস্ট প্রডিউসিং কান্ট্রি ইন দ্য ওয়ার্ল্ড!
 
মানুষ হত্যার এই মিথ্যা যুদ্ধ আর কতোদিন চালাবেন আপনারা? জঙ্গিবিমান, চপার হেলিকপ্টার আর ড্রোন থেকে স্কাড মিসাইল ছুড়ে যতো মানুষকে হত্যা করেছেন আপনারা, হিসাব রাখুন, এই প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির জীবন্ত বংশধররা আমেরিকাকে ঘৃণাই করবে শুধু। সেটা বছরের পর বছর, যুগ যুগ ধরে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলতে থাকবে।
 
মানুষ হত্যার যে ঘৃণ্য পন্থা আপনারা আবিষ্কার করেছেন, দেখবেন, একদিন এই দানব আপনাদের ঘরে গিয়ে আপনাদেরই তাড়িয়ে ফিরবে।
 
আজকের আফগানরা হয়তো নিঃস্ব, রিক্ত, দরিদ্র; কিন্তু একদিন তারাও অর্জন করতে পারে অটোমেটিক মারণাস্ত্র। একদিন হয়তো স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রভর্তি ড্রোন ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশে উড়ে উড়ে শনাক্ত করতে থাকবে— সন্ত্রাসীরা কোথায় কোথায় ঘাপটি মেরে আছে।
 
লেখক : তরুণ আলেম, কবি ও কথাসাহিত্যিক
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বাধিক পঠিত
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2