Ads-Top-1
Ads-Top-2

তবু স্বপ্ন দেখে মন

নিউজ ডেস্ক
১০ মার্চ ২০১৮, শনিবার
প্রকাশিত: 10:10:00 আপডেট: 06:02:47

‘তোমাকে ভালোবাসি বলেই বেঁচে আছি। তোমার জন্যই লড়বো, যেমন করে লড়ে যাচ্ছি। তোমার জন্যই প্রাণ দিচ্ছি। আমার নামের সাথে দুঃখ জড়িয়ে নেই।’
 
‘জীবনের কাছে আমার চাওয়া ছিল খুবই সামান্য। একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর, কিছু গবাদি পশু আর আবাদযোগ্য খানিকটা জমি। কিন্তু তোমাকে দেখার পর উপলব্ধি করলাম: না, কেবল এটাই নয়- আরো অনেক কিছু চাই আমি।’
 
শোয়েবের মধুমাখা সেই চিঠিগুলোর কথা এখনো কানে বাজে অপর্ণার। পুরো নাম আন্তরিক রহমান অপর্ণা। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ। সুন্দরী ও স্মার্ট। অথচ দেখে বোঝার উপায় নেই, কত্ত বড় একটা বিয়োগান্তক নাটকের নায়িকা সে।
 
আটপৌরে জীবনে তার চাওয়া পাওয়া খুব একটা ছিল না। সাধ ছিল ছোট্ট একটি জীবনের। যেখানে সুখ আছে, দুঃখ আছে। প্রাচুর্য আছে, দৈন্যও আছে। আর আছে এগুলো সমানভাগে ভাগ করে নেয়ার জন্য মনের মতো একজন সঙ্গী, যাকে নিয়ে সাগর সৈকতে দাঁড়িয়ে অস্তাচলগামী লাল টুকটুকে সূর্যটাকে বিদায় সম্ভাষণ জানানো যায়। যাকে নিয়ে কর্ণফুলী নদীর বুক বেয়ে দূর অজানায় হারিয়ে যাওয়া যায়। যাকে নিয়ে জীবনের সবটুকু পথ সহজেই পাড়ি দেয়া যায়।
 
শোয়েবের সুগারকোটেড বাতচিতে অপর্ণা মুগ্ধ হয়ে যেত, নিজেকে হারাত। বাবা-মার প্রবল আপত্তি উপেক্ষা শোয়েবকে নিয়ে ঘর বাঁধে। জীবনের স্বপ্ন গাঢ় হয়। কিন্তু তার চারপাশের পৃথিবী পাল্টে যেতে দেরি হয়নি। তবে এখানে ওখানে রেখে গেছে সময়ের দাগ। এখন তার চিরচেনা স্বপ্নের জগতটাই সেই কর্কট, যে নিজেকে নিজে খেয়ে ফেলছে। প্রতিক্ষণে মনে জাগছে একটি অবিশ্বাসী প্রশ্ন- এ স্বপ্ন তার জীবনের শুরু, নাকি শেষ?
 
স্বপ্নভঙ্গের নালিশ সে এখন কাকে জানাবে? হাতে মেহেদির গন্ধটুকু না শুকাতেই অন্যরকম শোয়েবকে সে চিনতে পারে। পরনারীর প্রতি তার ভয়াবহ আসক্তির কারণে শারীরিক নির্যাতনকেও অপর্ণার কাছে পানসে মনে হয়। জীবনটাকে নতুন করে শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েও থমকে গেছে। কারণ অফিসে বিগ বসদের লোলুপ দৃষ্টির কথা মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। স্বপ্ন ভেঙে চৌচির হওয়ায় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিজেকে সমৃদ্ধ করার সাহসটুকু হারিয়ে ফেলেছে। তার কানে বার বার বাজে সোরেন কিয়ের্কেগার্ডের সেই ফিলোসফিক্যাল ফ্যালাসি:
 
‘সে বৃদ্ধ হতে পারে না। কারণ সে কখনো তরুণ ছিল না। এক অর্থে সে মৃত্যুবরণ করতে পারে না, কারণ সে কখনো বাঁচেনি। এক অর্থে সে বাঁচতে পারে না, কারণ ইতিমধ্যেই সে মৃত।’
 
স্বপ্নাহত ও বিচ্ছিন্ন এক দেবদারু গাছের মত সোজা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অপর্ণা। কোথাও যেন তার ছায়া পড়ছে না। কেবল কিছু অর্বাচীন কাঠঠোকরা পাখি এসে তার ডালপালায় বাসা বাঁধছে।
 
এখানে অপর্ণার মত হাজারো মেয়ের স্বপ্ন ভাঙে প্রতিদিন। ওদের শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কত ভাগ জানা যায়? বিষয়টাকে সামাজিক-সংস্কৃতির দৃদ্বিকোণ থেকে দেখা এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
 
সমাজ একজন নারীকে কোন দৃষ্টিতে দেখছে এবং সেই দেখার মাঝে ফাঁকগুলো চিহ্নিত করতে না পারলে নারীর স্বপ্ন হয়ত স্বপ্নই থেকে যাবে।
 
আমাদের দেশে নারীর স্বপ্ন ভাঙার মূল উপাদান রয়ে গেছে হাজার বছরের সমাজ-সভ্যতা আর সাংস্কৃতিক চিন্তা চেতনায়। শাস্ত্রকাররা একদিকে নারীর সৌন্দর্য নিয়ে কষ্টকল্পিত হাজারো উপমা যেমন করে আমাদের সমাজ-মননে গেঁথে দিয়েছেন, অন্যদিকে লৈঙ্গিক বৈষম্যের দেয়াল চিরস্থায়ী করতে হাজারো কটু শব্দ তার প্রতি অহরহ প্রয়োগের পথও খোলা রেখেছেন।
 
বলা হয়েছে, নারী নাকি অম্লানকুসুম। মানে যে ফুল কখনো মলিন হয় না। শাস্ত্রকাররা বলেছেন, কোনদিনই মলিন হবে না, এমন জিনিস সৃষ্টির জন্য ঈশ্বর প্রথম চাঁদ বানালেন। কিন্তু দিনে যে চাঁদ মলিন হয়ে যায়। সৃষ্টি করলেন পদ্মফুল, সেটাও আবার রাতে মলিন হয়ে যায়। তাই শেষে সৃষ্টি করলেন নারী। এ নারী সদা হাস্যময়ী অম্লানকুসুম, দিনে রাতে যার সমান উজ্জ্বলতা।
 
পুরুষশাসিত সমাজে নারী হয়ে আছে রমণী, কামিনী, অবলা, দাসী, ভ্রষ্টা, নর্মসহচরী। কিন্তু ‘মানুষ’ হতে পারেনি। দেহগত দিক থেকে সে কামনার এক অতি উপাদেয় ভোগ্যবস্তু। ইন্দ্রীয়ের দিক থেকে ভায়াগ্রার মত এক অতিউত্তেজক সচল অস্তিত্ব, যার পায়ের নখ থেকে শুরু করে মাথার কালো চুল পর্যন্ত কামগন্ধ মাখা। সে যেমন আনন্দের অফুরান উৎস, তেমনি হাজারো পাপেরও মূল উৎস।
 
আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে ‘নারীমন’ কখনো বিবেচনায় আসে না। তাকে ‘পূর্ণমানবী’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াসও তেমন চোখ পড়ে না। বোদলেয়ার পর্যন্ত তাকে ‘প্রোজ্জ্বল ক্লেদ’ যেমন বানিয়েছেন, তেমনি রবীন্দ্রনাথ তাকে বানিয়েছেন ‘অর্ধেক নারী, তুমি অর্ধেক কল্পনা’।
 
‘অগম্যা’ শব্দটির কথা ভাবুন। ওটার দায়দায়িত্ব স্রেফ নারীর। পুরুষের নয়। তাই শব্দটির পুরুষবাচক কোনো শব্দ অভিধানে নেই। অগম্যার পুংলিঙ্গ হিসেবে যে ‘অগম্য’ শব্দটি রয়েছে, তার সাথে পুরুষের সম্পর্ক নেই। নারী ‘পতিতা’ হয়, কিন্তু পুরুষ কখনো ‘পতিত’ হয় না। সাবেক এক রাষ্ট্রপতিকে আমরা গণধিকৃত অর্থে ‘পতিত’ বলি। পতিতার পুংলিঙ্গ হিসেবে ‘পতিত’ বলি না।
 
নারীকে আমরাও ‘মানুষ’ বলি না। বলি ‘মেয়েমানুষ’। হালে নারীবাদীদের আপত্তির কারণে অনেক শব্দে লৈঙ্গিক সমতা আনার চেষ্টা চলছে। যেমন এক সময় ইংরেজি চেয়ারম্যান শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গ হিসেবে চেয়ারওম্যান শব্দটি চালু হয় এবং অভিধানেও যথারীতি ঠাঁই পায়। কিন্তু নারীবাদীদের আপত্তির মুখে চেয়ারওম্যান শব্দটি উঠে যায়। তার জায়গায় এখন ‘চেয়ারপারসন’ শব্দটি চালু হয়েছে।
 
তবে বিশ্বের সব দেশের নারীবাদীর চিন্তাধারায় ঐক্য নেই বলেই নারীর ‘মানুষ’ হয়ে ওঠা আরো জটিল হয়ে গেছে। একেক দেশের নারীবাদী একের রকমভাবে নারীকে নিয়ে ভাবছে। ক্ষেত্র বিশেষে সমাজের বিদ্যমান সাংস্কৃতিক চেতনাকে অপটু হাতে হ্যান্ডলিং করতে গিয়ে তারা এমন উগ্রও সাজছেন, যা তাদের জন্য জরুরি নয়। আমাদের সমাজে মন নারীর, কিন্তু ওটা পরিচালনার অধিকার শুধু পুরুষের। পুরুষ নারীর গায়ে শুধু অবলাতত্ত্বের লেবেল সেঁটে দেয়নি। পুরুষ নারীর ওপর যৌন আধিপত্যের অনড় সংবিধানও চাপিয়ে দিয়েছে। নারীও তা মেনে নিয়েছে। তাই শরীর নারীর, কিন্তু সিদ্ধান্ত পুরুষের। সমাজ-সংস্কৃতির যাঁতাকলে পড়ে নারীর মেধামননও আজ অবনত।
 
দুঃখজনক ব্যাপার হলো, নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়া শোষণমূলক কুৎসাগুলো সময়ের ব্যবধানে নারী নিজেও বিশ্বাস করতে শিখে গেছে। একবার ভাবুন, নারীর প্রসাধন, বস্ত্র আর অলংকার কি নারীর নিজের উদ্ভাবন, নাকি চাপিয়ে দেয়া?
 
অপর্ণার চোখ দুটি এখন লোনাজলে ভেজা! পুরুষ যদি ‘মানব’ হয়ে না উঠতে পারে, নারী যদি পূর্ণাঙ্গ মানবী হতে না পারে, তাহলে এ জল কে মোছাবে?
 
জিয়াউদ্দিন সাইমুমের ব্লগ থেকে
 
ব্রেকিংনিউজ/জিসা
 
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2