Ads-Top-1
Ads-Top-2

জীবনযুদ্ধে সফল নারী নাজমুন্নাহার

মো. আমিনুল ইসলাম, ঝালকাঠি
১০ জানুয়ারি ২০১৮, বুধবার
প্রকাশিত: 01:17:00 আপডেট: 06:02:47
জীবনযুদ্ধে সফল নারী নাজমুন্নাহার<br />

টাকার অভাবে যিনি পড়াশুনা করতে পারেননি, বিড়ির কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছে, মানুষের ছেঁড়া জামাকাপড় পরে দিনযাপন করতে হয়েছে, ভাগ্যক্রমে ঈদ উপলক্ষে মামা-নানা বাড়ি থেকে কখনও নতুন জামা পেলে পরতেন, নয়তো পুরাতন জামা দিয়েই ঈদ পালন করতেন, খাট-বিছানা-টিভি-ফ্রিজ-সোফা ইত্যাদি বাসায় থাকা তো দূরের কথা ঘরে একটা চৌকিও না থাকায় মাটিতে মাদুর বিছিয়ে ঘুমাতে হতো, মাঝে মধ্যে ঠাণ্ডা লেগে অসুখ হলেও টাকার অভাবে ডাক্তার দেখানো এবং ঔষধ কেনা সম্ভব হতো না, মামা বাড়ি থেকে মাসে ২/১ দিন মাছ/মাংস কিনে দিলে ভাগ্যে উপাদেয় খাবার জুটতো, নয়তো সবজি দিয়েই ৩ বেলার পরিবর্তে ২ বেলা খেয়েই দিন অতিবাহিত করতেন নাজমুন্নাহার। সেই নাজমুন্নাহার এখন জীবনযুদ্ধে সফল এবং অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
 
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার কামদেবপুর গ্রামে ১৯৮৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন নাজমুন্নাহার। এক বছর বয়সেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা মোঃ বক্কর আলী হাওলাদারের মৃত্যু হয়। ৯ সদস্যের পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়ে মা বকুল বেগম। তিনি সংসার চালাতে কাজ নেন বিড়ি তৈরির কারখানায়। শিশু কাল থেকেই পড়ালেখার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল নাজমুন্নাহারের। থাকতেন মায়ের সাথে বিড়ি কারখানায়।
 
এসব কথা জানিয়ে নাজমুন নাহার বলেন, পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারণে ছয় বছর বয়সেই নিজেই বিড়ি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। সেই আয় দিয়ে নিজের পড়াশুনার খরচ ও বিদ্যালয়ের বেতন দিয়ে যে কয়টাকা বাকি থাকতো তা দিয়ে মা’কে সংসার চালাতে সাহায্য করতেন। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করে আর সামনে এগুনো সম্ভব হয়নি।
 
১৫ বছর বয়সেই বেকার ছেলের হাতে পাত্রস্থ হতে হয়েছে নাজমুন্নাহারকে। বিয়ের পর বেকার স্বামীর ঘরে গিয়ে যন্ত্রণা একটুও কমেনি। শ্বশুর-শাশুড়ির যত্ন নেয়া, সংসারের অন্যান্য কাজ করা, নিজে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় সুখের মুখ দেখতে পাননি। তারপরও অসুস্থাবস্থায় গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে নকশিকাঁথার কাজ নিয়ে করতেন। সেখান থেকে যা সামান্য আয় হতো তা দিয়ে স্বামীর সংসারেই জোগান দিতে হতো। সেখান থেকেই সেলাই কাজে তার আগ্রহ জন্মে। দর্জির দোকানে গিয়ে কাপড় কাটা দেখে বাসায় এসে পুরাতন কাপড় মাটির ফ্লোরে ফেলে ব্লেড দিয়ে কেটে জামা তৈরির চেষ্টা করেন। প্রতিবেশীদের জামাকাপড় কেটে হাতে সেলাই করে তৈরি করে সরবরাহ করতেন। সেখান থেকে কিছু টাকা জমিয়ে ২০১৫ সালে একটি পুরাতন সেলাই মেশিন কিনেন।
 
পরের বছর ঝালকাঠি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে সেলাইয়ের উপর ছয় মাসের একটি প্রশিক্ষণ নেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দুই বারে এক লাখ টাকা ঋণ নেন। সেই ঋণের টাকা দিয়ে ২টি গর্ভবতী গাভী এবং আরো ২টি সেলাই মেশিন কিনেন। শহরের মধ্য চাঁদকাঠিতে ‘চাঁদনি টেইলার্স’ নামের একটি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। সেখানে বর্তমানে ৪ জন মহিলা শ্রমিক নিয়োজিত। নিজের জমি না থাকায় পার্শ্ববর্তী একটি জমি মৌখিক চুক্তিতে নিয়ে সবজি চাষাবাদ করেন।
 
বর্তমানে তিনি ৫৭ জন মহিলা সদস্যা নিয়ে ‘মধ্যচাঁদকাঠি মহিলা কল্যাণ সমিতি’ নামের একটি সংগঠনও পরিচালনা করছেন। প্রবল ইচ্ছা থাকায় অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি উপেক্ষা করে একমাত্র কন্যা সন্তানকে পাত্রস্থ করে এবং পুত্রসন্তানকেও পড়াশুনা করাচ্ছেন। নিজের পরিশ্রম দ্বারা উপার্জিত অর্থে স্বামীকে নিজ বসতঘরের পাশে একটি স্টেশনারি দোকান স্থাপন করেছেন। এখন তার গোয়ালে ৫টি গরু, চাঁদনী টেইলার্সে ৩ টি সেলাই মেশিন, স্টেশনারী দোকান, সবজি চাষাবাদ সবমিলিয়ে দারিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে সফল আত্মসংগ্রামী হিসেবে নাজমুন্নাহার নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার এ উদ্যোগী কার্যক্রমে সহায়তা করছেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ফিল্ড সুপারভাইজার আইরিন সুলতানা।
 
আইরিন সুলতানা জানান, নাজমুন্নাহারের ইচ্ছা আর আমার সহায়তায় সে কর্মদক্ষতার কারণে নিজ জীবনের সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সে এখন আত্মসংগ্রামী সফল নারী।
 
ব্রেকিংনিউজ/আমিনুল/জিসা
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2