Ads-Top-1
Ads-Top-2

দেয়ালে উঠে লিখুন

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
২৪ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার
প্রকাশিত: 10:28:00 আপডেট: 12:00:00

দেয়ালে উঠা কষ্টকর এবং ঝুঁকির। বলা হয়ে থাকে এই কষ্ট এবং ঝুঁকিকে নাকি  এড়াতে চান আমাদের ‘দলীয়’ বুদ্ধিজীবী কলামিস্টরা। কারণ দেয়ালে উঠলে দেয়ালের দুপাশের যাবতীয় কিছু দেখা যায়। এতে লেখার ভেতর এই ‘দেখাগুলো’ও ফুটে উঠতে পারে। আর দলীয় প্লাটফর্মে থেকে নিরপেক্ষ বা দু দিকের ভালোমন্দ লিখতে গেলে ‘লাইনচ্যুত’ হবার আশঙ্কা হান্ড্রেড পারসেন্ট। বন্ধ হতে পারে রুটি-রুজির একটা রমরমা পথ।
 
অতএব, তাদের দর্শন একেবারে সোজা। আর তা হলো: আওয়ামী লীগ লাইনের বুদ্ধিজীবী হলে সতর্ক অধ্যবসায়ের সঙ্গে দলটির দোষগুলো চেপে রাখতে হবে। বরং যাবতীয় দোষ আর ব্যর্থতার দায়দায়িত্ব বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়ে আওয়ামী লীগকে বানাতে হবে পূতপবিত্র রাজনৈতিক দল। দেশ জাহান্নামে যাক, হরতাল-অবরোধে দেশ পঙ্গু হয়ে যাক- যাক না। দল ক্ষমতায় যাওয়াটাই আর যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় থাকাটাই হলো বড় কথা। দল ক্ষমতায় থাকলে ঢাকায় তাদের ফ্ল্যাট জুটবে। বিদেশ সফরের মওকা মিলবে। দেশপ্রেম? ওটা আবার কি চিজ? একমাত্র বোকাদের মুখেই দেশপ্রেমের অমৃত বচন ঝরে! আর যাই হোক, তারা ‘বোকাদের’ এই কাতার থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারছেন।
 
একই   কথা   বিএনপির   ব্যাপারেও  কি  ষোল   আনা   প্রযোজ্য? মোটেও নয়। কারণ তাদের কোনো বুদ্ধিজীবী গ্রুপ নেই। কোনো মিডিয়া নেই। শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতাও তারা করেন না। তাই দেশের এই শীর্ষ দলটির চরম বিপর্যয়েও কেউ মুখ খোলেন না। আর দলটিও মনে করে, বুদ্ধিজীবী নামক ‘লেজুড়’ পালন করে কি লাভ? বরং এই বেশ ভাল আছি। মাঝে মাঝে রাত আটটায় মিটিংয়ে বসি। দশটায় মিটিং শেষ রাত এগারটায় হালকা পাতলা ব্রিফিং দেই। তারপরও মিডিয়া তা ছেপে দেয়। এর চেয়ে বেশি কিছু করার দরকার কী? তাহলে কি দলটিতে কোনো বুদ্ধিজীবী নেই। আছে বৈকি! তাও আবার দুই কিসিমের। এক কিসিমের বুদ্ধিজীবী বাদুড় টাইপের। তারা বাদুড়ের মতো স্বার্থের ডালে ডালে ঝোলেন। বাকি কিসিমের বুদ্ধিজীবীরা ক্যাঙারু টাইপের। তারা লাফিয়ে লাফিয়ে ‘আদর্শ’ বা ‘গুরু’ পরিবর্তন করেন। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিএনপি তো ওদের বেঁচে থাকার পথ খোলা রাখেননি। তাই তারাও আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের মতো দেয়ালে উঠে লিখতে পারেন না। মানে বিএনপির দোষটাও তুলে ধরতে পারেন না। যেটা পারেন, সেটা হলো আওয়ামী লীগের নির্মমতা তুলে ধরতে। এতে দেশবাসী ধীরে ধীরে ভাবতে অভ্যস্থ হয়ে যাচ্ছে, জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দলটি বোধহয় আর কোমর সোজা করতে পারছে না!
 
বর্তমানে ‘জাতীয় সংলাপের’ চরিত্রটা পুরোপুরি ‘দলীয়’ হয়ে গেছে। অথচ আম জনতা কিন্তু ঠিক দেয়ালে উঠে বসে আছে। তারা দেয়ালটার দুপাশে ভালো করে দেখছে। এ কারণে তারা এটা ভাল করেই বুঝতে পারছে, ‘পতিত’ এরশাদ আজও কেন এতোটা গুরুত্বপূর্ণ। আর এই গুরুত্বের কারণে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘দেশবাসী’ ও ‘রাজনীতি’ হারলেও পতিত এরশাদ ঠিকই জিতেছেন। পাবলিক ‘অলিখিত’ সমঝোতার কথা বুঝলেও বিএনপি তা বোঝাতে গিয়ে লেজে-গোবরে করে ফেলেছে। তাই মির্জা ফখরুল আর রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যে ফারাক দেখা গেছে।
 
অথচ স্বৈরাচারী এরশাদ নিজেও জানেন, ক্ষমতায় যেতে বিএনপি মরিয়া না হলে আর ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগ ধনুভাঙা পণ না করলে তিনি এতোদিনে তলিয়েই যেতেন। দেয়ালে উঠলে দেখতে পাবেন, যেসব দলীয় বুদ্ধিজীবী এখন এরশাদ নিন্দায় মুখর, তারা একসময় এমন ছিলেন না। আবার যারা এখন এরশাদ বন্দনায় মেতেছেন, তাদের অতীত ভিন্ন ক্যাসেট বাজাচ্ছে। এরশাদের দাপাদাপিও আপন শক্তির কারণে নয়। ক্ষমতাসর্বস্ব রাজনীতির কারণেই তিনি এখন সুপারহিট। একই কথা জামায়াতের বেলায়ও খাটে। বিএনপি কিক মারলে দলটি আওয়ামী লীগের কোলে চড়বে। ক্ষমতায় যেতে দলটিকে আওয়ামী লীগ কাছে টানবে না? অতীত কিন্তু ভিন্নকথা বলে। জামায়াতও এখন সেই সুযোগের অপেক্ষায়। বিএনপিকে কালারিং করার পর আওয়ামী লীগ তাদের টার্গেট। বনিবনা না হলে ওরা সোজা দৌড় দেবে লীগের দিকে। সাধে কি আর বলে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কোনো কিছু নেই!
 
দলীয় চশমা পরে রাজনৈতিক সমস্যার কারণ ব্যাখ্যা করার বাতিক আমাদের   সো-কলড বুদ্ধিজীবীদের ফ্যাশন। অথচ এটা প্রান্তিকধর্মী চিন্তন পদ্ধতি। এটা আর কিছু নাই পারুক, দেশের গণতন্ত্রের বারোটা বাজায়। দলীয় নেতারা ভুলের বৃত্ত থেকে বের হবার পথ খুঁজে পান না। দেশের চেয়ে দলকে যারা বড় করে দেখান বা দেখাতে চান, তারা জাতিকে গণতন্ত্র কিভাবে শেখাবেন? এতে দলও গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে উৎসাহ পায় না।
 
বলা যায়, দুর্নীতি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো জাতির ঘাড়ে চেপে বসার সুযোগ তো এভাবেই তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আসল সমস্যা এড়িয়ে যাবার যে প্রবণতা রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে দেখা যায়, একই কায়দায় বুদ্ধিজীবীদের কলমের  খোঁচায়  আসল   ‘সত্য’  হাজারো   মিথ্যার   চাপে   হা-পিত্যেস  করে।   প্রতিক্রিয়াশীলদের টিকে যাবার সূত্রটা কিন্তু এখানেই।
 
বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবীর মুখে এখন আকারে-ইঙ্গিতে ‘তৃতীয়শক্তি’র উত্থানের কথা শোনা যাচ্ছে। তাদের মাঝে কয়েক জন বলার চেষ্টা করেছেন, আওয়ামী লীগ আর বিএনপি নামের শাসক শ্রেণীর দল দুটোর রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই নাকি এ দেশে তৃতীয়শক্তির উত্থান ঘটতে পারে। আবার তৃতীয়শক্তির উত্থানটাকে   আকারে   ইঙ্গিতে সমর্থন  জানাচ্ছেন  সুশীলসমাজের   কেউ   কেউ।   অভিযোগ  রয়েছে, বিদেশী  এক রাষ্ট্রদূতের বাসায়  নাকি ‘তৃতীয় শক্তি’  উত্থান কনসেপ্টটির জন্ম। এ দেশে সেনাবাহিনী ও সোকল্ড বুদ্ধিজীবী ও পতিত রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে এ দেশে আফগান স্টাইলে ‘কারজাই’ মার্কা সরকার বানিয়ে মার্কিন স্বার্থ পাকাপোক্ত করাই নাকি এ তৃতীয়শক্তির উত্থানের পেছনের কাহিনী। ধারণাটি অবশ্য হালে তেমন পানি পায়নি। কিন্তু শীর্ষ রাজনৈতিক দল দুটোর মাত্রাজ্ঞানহীন ক্ষমতাপ্রীতির কারণে তৃতীয়শক্তির উত্থানটা হয়তো আবার মাথাচাড়া দিতে পারে, এমন আশঙ্কা কেউ কেউ উড়িয়ে দিচ্ছেন না। দেয়াটা হয়তো জরুরিও নয়।
 
তবে শেষ পর্যন্ত জনতারই জয় হয়। কিন্তু হাঁটতে হয় বহুদূর। আসলে দেয়ালে উঠে লেখা কি সম্ভব? কে জানে? কথাটা এক বুদ্ধিজীবীকে জিজ্ঞেস করতেই যা জবাব পেলাম তাতেই আক্কেল গুড়ুম, ‘রাখ তোমার নিরপেক্ষতা। শুনে রাখো, এ দেশে সত্য বলা আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষে একই কথা।’ কথাটি তিনি হয়তো ভুল বলেননি।
 
তার চেয়ে শুনুন একটি পুরনো গল্প। ঘটনাটি আমেরিকার এবং একশো বছর আগের। আমেরিকার কানসাসে এক অপরাধীর ফাঁসি হবে প্রকাশ্যে। ৩৫ হাজার দর্শক ময়দানে হাজির। বিচারক জানালেন, ‘ওয়াশিংটন থেকে একজন সিনেটর এখানে এসেছেন। তার সঙ্গে তুমি পাঁচ মিনিট কথা বলার সুযোগ পাবে।’
‘আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে অপরাধীর দৃঢ়োক্তি।
সিনেটর নিজেই এগিয়ে এসে বললেন, ‘আসলে কি তুমি আমার কথা শুনতে আগ্রহী নও?’
‘অবশ্যই শুনতে চাই। তবে আমার ফাঁসির পর’- অপরাধীর নির্লিপ্ত জবাব।
 
লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

ব্রেকিংনিউজ/জিয়া
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বাধিক পঠিত
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2