Ads-Top-1
Ads-Top-2

ধান চাষে ড্রাম সিডারে ঝুঁকছেন কৃষক

মো. মোশারফ হোসেন, শেরপুর
২৩ ডিসেম্বর ২০১৭, শনিবার
প্রকাশিত: 07:08:00 আপডেট: 12:00:00
ধান চাষে ড্রাম সিডারে ঝুঁকছেন কৃষক

শেরপুর : নানা প্রযুক্তির ছোঁয়ায় লাভবান হচ্ছেন কৃষক। কৃষি উন্নয়নে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। এমন একটি প্রযুক্তি ব্যবস্থা হলো ড্রাম সিডার। বীজতলা তৈরি না করে সরাসরি ক্ষেতে ধান বপনের এই পদ্ধতিটি কৃষকের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগাচ্ছে। 

ধান চাষে ড্রাম সিডার ব্যবহারে অধিক লাভ দেখে দিন দিন এর প্রতি কৃষক ঝুঁকছেন। শেরপুরের সব উপজেলায় কয়েক বছর ধরে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে ধান চাষির আগ্রহ বেড়েই চলছে। যেকোনো ধান চাষে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই ড্রাম সিডারের ব্যবহার। ড্রাম সিডারে ধান চাষ করায় উৎপাদন খরচ ২০ থেকে ২৫ ভাগ কম লাগছে। 

নকলার উপজেলার টালকী ইউনিয়নের কৃষক গাজী মিয়া, গৌড়দ্বার ইউনিয়নের রুনিগাঁও গ্রামের কৃষক শাহাব উদ্দিনসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগের মতো বীজতলায় চারা উৎপাদনের পরে অন্য ক্ষেতে চারা রোপনের চেয়ে ড্রাম সিডারের মাধ্যমে সরাসরি ধান ক্ষেতে বীজ বপন করায় শ্রমিক, সময় ও উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে কম লাগে। ফলনও ভালো পাওয়া যায়। 



কৃষক শাহাব উদ্দিন ও গাজী মিয়া জানান, সনাতন পদ্ধতিতে ৩ একর জমির জন্য আগে ৪৫ থেকে ৫০ কেজি বীজ বপন করতে হতো। বীজ বপনের ৩০ থেকে ৩৫ দিন পরে বীজতলা থেকে চারা তোলে নিয়ে ধান ক্ষেতে রোপন করতে হতো। তাতে কমপক্ষে ৩৩ জন শ্রমিক লাগত। যাদের মোট শ্রম বাজার মূল্য অন্তত ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। আর ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ওই ৩ একর জমিতে সরাসরি ধান বপন করতে দেশের বেশকিছু জমিতে ৪৫ থেকে ৫০ কেজি বীজ লাগলেও শেরপুরের অধিকাংশ জমিতে ৫৪ কেজি থেকে ৬০ কেজি বীজ লাগে এবং শ্রমিক লাগে এক থেকে দুই জন। ফলে অতিরিক্ত বীজ বাবদ লাগে ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং শ্রমিকের মজুরি বাবদ লাগে ৬০০ টাকা থেকে একহাজার ২০০ টাকা। ফলে প্রতি তিন একর জমিতে অতিরিক্ত বীজের দাম বাদে রোপন ব্যয় ১৪ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ১৫ হাজার ৪৫০ টাকা থেকে কম লাগে। তাছাড়া আগের চেয়ে ফলন ভালো হয়, সেবা যত্ন করাও সহজ হয়। খরচ কয়েক গুণ কম লাগে। 

অন্য কৃষক লিয়াকত আলী ও ছাইদুল জানান, ড্রাম সিডারে ধান রোপন করায় কয়েকবার সেচ বেশি দিতে হয়। কিন্তু সেচ পাম্পের মালিকরা সাধারণত ডিসেম্বরের শেষার্ধে বা জানুয়ারি মাসের প্রথমার্ধ থেকে সেচের ব্যবস্থা করেন। ফলে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ড্রাম সিডারে ধান রোপনের পর পরই সেচের সমস্যায় পড়তে হয়। তবে সব কৃষক যখন ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান রোপন করবেন তখন আর এই সমস্যা থাকবে না বলে তারা আশা করেন। যদিও সেচের খরচ কিছু বাড়বে। তবুও আগের তুলনায় উৎপাদন খরচ অনেক কম থাকবে বলে তারা জানান। 

কৃষকরা জানায়, জমি ও পরিবেশ ভেদে আউশ, আমন ও বোরো তিন মৌসুমেই এ প্রযুক্তিতে ধান চাষ করা যায়, তবে আউশ ও বোরো ধান চাষে এটি বেশি উপযোগী। ধান রোপনের জন্য জমি যেভাবে কাদা করতে হয় সেভাবেই জমি উত্তমরূপে চাষ ও মই দিয়ে কাদাময় করে নিয়ে তার পরে ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান রোপন করতে হবে। বোরো মৌসুমে নভেম্বরের শেষার্ধ থেকে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে এবং আমন মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা আছে এমন উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে জুনের শেষার্ধ থেকে জুলাইয়ের প্রথমার্ধে বীজ বপন করা উত্তম। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন জমির কোনো স্থানে পানি জমে না থাকে। তাহলে ধানের বীজ তথা অঙ্কুরিত চারা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সার ব্যবস্থাপনা রোপা পদ্ধতির মতোই। তবে ইউরিয়া এলসিসি ভিত্তিক প্রয়োগ করতে পারলে সুফল পাওয়া যায়। বপনের প্রথম ৫-৬ দিন সেচের প্রয়োজন হয়না। ধান গাছ একটু বড় হলে রোপা পদ্ধতির মতোই পানি সেচ দিতে হয়। রোপন পদ্ধতির চেয়ে বোনা পদ্ধতির ক্ষেতে আগাছা সামান্য বেশি হয়। তাই ড্রাম সিডারে সারিতে বপন হওয়ায় নিড়ানি বা উইডার দিয়ে আগাছা দমন সহজ হয়। এ ক্ষেত্রে ব্রি-উইডার বেশ উপযোগী।



তবে উইডার প্রয়োগের পরেও হাত দিয়ে অবশিষ্ট আগাছা পরিষ্কার করে দেয়া জরুরি। তাছাড়া আগাছানাশকও ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বোরো বীজ বপনের ৭ থেকে ১০ দিন এবং আমন ও আউশ মৌসুমে ৪ থেকে ৬ দিনের মধ্যে প্রতি ৫ শতাশেং জমিতে ২০ থেকে ২৫ মিলি লিটার রনস্টার বা ১০ থেকে ১২ মিলি লিটার রিফিট ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। আগাছা নাশক ব্যবহারের পরে ৪ থেকে ৫ দিন ক্ষেতে ছিপছিপে দাঁড়ানো পানি থাকতে হবে। সঠিক পরিচর্যায় ড্রাম সিডারে বোনা ধানের ফলন রোপা ধানের তুলনায় শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ বেশি হতে পারে। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে ধান চাষ করলে রোপা পদ্ধতির চেয়ে ১২ দিন থেকে ১৫ দিন আগে পাকে।

উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা ও টালকী ইউনিয়নে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা আতিকুর রহমানের তত্বাবধানে ৫-৭ বছর যাবত শাহাব উদ্দিন ও গাজী মিয়া ড্রাম সিডারের মাধ্যমে আউশ ও বোরো ধান বপন করে আসছেন। তাছাড়া উপজেলার কোন কৃষক ড্রাম সিডারে ধান বপন করতে হলে আগে আতিকুর রহমানের কাছেই পরামর্শ নিয়ে থাকেন বলে জানা গেছে। কারন ড্রাম সিডারের বিষয়ে তিনি বেশ অভিজ্ঞ। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল ওয়াদুদ জানান, তারা কয়েক বছর ধরে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সিডারের মাধ্যমে ধান চাষে কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে আসছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হুমায়ুন কবীর জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১২ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তার মধ্যে উপজেলায় সরকারি ১৫টি ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ২৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করার লক্ষ মাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে এবং ড্রাম সিডাররে মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ধান বপন করা হচ্ছে। বাকি আবাদের জন্য ৮০৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা করা হয়েছে। 

তিনি আরো জানান, ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান চাষের উৎপাদন ব্যয় কম ও উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। এই চাষ পদ্ধতিতে লাভ দেখে অন্যান্য কৃষকরা উদ্যোগী হয়েছেন। কয়েক বছরের মধ্যে উপজেলার সব জমিতে ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান চাষ করা হবে বলে তিনি আশা করছেন।



অতি সম্প্রতি (২১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার) নকলার রুনিগাঁও এলাকায় ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান চাষের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট (ব্রি) গাজীপুরের মহা পরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে ব্রি গাজীপুরের এসএসও ড. মো. আব্দুল কাদের ও ড. বিশ্বজিত কর্মকার এবং শেরপুর খামার বাড়ির উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আশরাফ উদ্দিন তাদের বক্তব্যে জানান, ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান চাষ করলে কৃষকরা হবেন অধিক লাভবান, আর কৃষি অর্থনীতি আরও দ্রুত সমৃদ্ধ হবে। তাদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন কৃষি গবেষকসহ স্থানীয় সুধীজন।

ব্রেকিংনিউজ/এমএইচ/পিআর

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2