শিরোনাম:
Ads-Top-1
Ads-Top-2

একজন মাকসুদুল আলম ও একটি গর্ব

সাফওয়ান মাহমুদ
২০ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার
প্রকাশিত: 05:02:00 আপডেট: 12:00:00

মাকসুদুল আলম উল্টো পথে হাঁটতে ভালোবাসতেন। ছোটখাটো বা মাঝারি মানের কোনো গবেষণা কোনোমতে শেষ করেই দেশ-বিদেশে জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়া গবেষকদের মতো তিনি ছিলেন না। গবেষণার ফল হাতে আসার পর তা আন্তর্জাতিক কোনো জার্নালে প্রকাশ হলে তার পর তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জানাতেন তিনি। ফলাফল তুলে ধরার জন্য সংবাদ সম্মেলন হলে তাতে তিনি থাকতেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন। তার পর তিনি আবারো তার গবেষণার ক্ষেত্র ল্যাবরেটরিতে ডুব দিতেন। গবেষণা চলাকালীন যত প্রভাবশালী আর বহুল প্রচারিত গণমাধ্যমই তার কাছে আসুক না কেন, তিনি দেখা দিতেন না। জাতীয় সংসদ ভবনের উল্টো পাশে পাট গবেষণা কেন্দ্রের জৈব প্রযুক্তি গবেষণা কেন্দ্রে তিনি কবে আসতেন, আর কবে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে ফিরে গেছেন তা জানত শুধু তার গবেষক দলের কয়েকজন।

দেশী পাট, তোষা পাট ও ব্যাকটেরিয়ার জীবনরহস্য উন্মোচনের পর আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের পর দেশবাসীকে তা জানিয়েছিলেন মাকসুদুল আলম। তাও সংসদে দুবার আর একবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করে তা দেশবাসীকে জানান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাকসুদুল শুধু পাশে বসে দু-একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। 

২০১০-এর জুনে পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের ঘোষণা দেয়ার আগ পর্যন্ত মাকসুদুল আলমের নাম দেশের হাতেগোনা কয়েকজন বিজ্ঞানী ছাড়া কারোই জানা ছিল না। তিনি তা জানতেও দেননি। হাওয়াইতে বসেই মাকসুদুল পৃথিবীর মোট আটটি প্রাণের জীবনরহস্য উন্মোচনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় অনুরোধে ডাক পড়ায় মালয়েশিয়ায় রাবারের জীবনরহস্য উন্মোচনের কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ২০০৮-এ বিশ্বের প্রভাবশালী বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার মাকসুদুল আলমের ওপর প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশ করল। বিশ্বের বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহীরা তখন তাকে প্রথম ভালোমতো জানল। কিন্তু এক প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাকে আর পাওয়া গেল না। তিনি তো মুঠোফোনও ব্যবহার করতেন না।

বাংলাদেশের বিজ্ঞান-মনস্করা মাকসুদুল আলমকে চিনতে কিছুটা সময় নিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে পেঁপে ও মালয়েশিয়ার হয়ে রাবারের জীবনরহস্য উন্মোচনের ঘটনা বিশ্ব গণমাধ্যমে চাউর হলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তার ছিটেফোঁটা অনুবাদ হিসেবে ঠাঁই পেল। কোন গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে কী ছাপা হচ্ছে, তা নিয়ে অবশ্য মাকসুদুল আলম চিন্তিত ছিলেন না। অনেক ক্ষেত্রে তার খোঁজও রাখতেন না। তবে দেশের হয়ে পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করা যাবে কিনা, সেই খোঁজ নিতে ২০০৮ সালে দেশে এসেছিলেন মাকসুদুল।

দেশে যে তিনি আসতেন না, তেমনটা অবশ্য নয়। দেশে তার তিন ভাইবোনসহ অনেকেই থাকেন। তাদের কাছে তিনি নিয়মিত আসতেন। কিন্তু দেশের সোনালি আঁশ পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করে এর নতুন জীবন দেয়ার লক্ষ্য ভেতরে পুষতে পুষতে তা বাস্তবায়নের স্বপ্ন নিয়ে মাকসুদুল আলম ২০০৮ সালে তত্কালীন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জীবনরহস্যের ইংরেজি ‘জিনোম সিকোয়েন্সিং’ এই শব্দগুলো দিয়ে দেশের নীতিনির্ধারকদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন তিনি। বিশ্বের বাঘা বাঘা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনোম গবেষকরা যাকে পেতে লাখ লাখ ডলার খরচ করতে বসে আছে। সেই মাকসুদুল তার মাতৃভূমির নীতিনির্ধারকদের কাছে শুনলেন উল্টো কথা।

মাকসুদুল আলমের ভাষ্যেই জানা গিয়েছিল একজন উপদেষ্টা পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কথা শুনে বলেছিলেন, ‘জিন-ভূত’-এর পেছনে সময় ও টাকা খরচ করার মতো অবস্থা তাদের নেই। মাকসুদুল আলমের মানের একজন গবেষকের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পারিশ্রমিক মাসে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা। আর মাকসুদুল বিনা পারিশ্রমিকেই সেই কাজ করে দিতে রাজি হয়ে তত্কালীন সরকারের কাছে শুধু কিছু  জনবল ও গবেষণা তহবিল পেয়েছিলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। মাতৃভূমির জন্য কিছু করার আগ্রহ নিয়ে এসে ব্যর্থ মনোরথে আবারো হাওয়াই ফিরে গেলেন তিনি।    

পাটের স্বপ্ন বুনন: ২০০৯-এর নভেম্বরে মাকসুদুল আলমকে নিয়ে দেশের একটি পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হলো। সেখানে তার নেতৃত্বে রাবার ও পেঁপের জীবনরহস্য উন্মোচনের তথ্য উল্লেখ করা হলো। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর নজরে পড়ল সে সংবাদ। তিনি ওই প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে মাকসুদুল আলমের ফোন নম্বর জোগাড় করলেন। নিজেই সরাসরি টেলিফোন করলেন মাকসুদুল আলমের কাছে। কৃষিমন্ত্রীর ডাক পেয়ে দ্রুত দেশে চলে এলেন তিনি। কৃষিমন্ত্রী প্রস্তাব দিলেন যত টাকা লাগে সরকার দেবে, তিনি যাতে পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করে দেন। এই প্রস্তাবের জন্য কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অনেকের কাছে ধরনা দিয়েছিলেন তিনি। দেশের জন্য কাজ করাকে পেশাদারিত্বের বাইরে নিয়ে ভাবলেন তিনি। মাকসুদুল আলমের জন্য সরকার থেকে গবেষণা প্রকল্পের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে মাসে ২৮ লাখ টাকা পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছিল। তিনি ওই টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তা পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে তার প্রতিষ্ঠিত জৈব প্রযুক্তি গবেষণা কেন্দ্রে দিয়ে দিলেন।

কিন্তু একজন মাকসুদুল আলম কী করে তৈরি হলেন। মাসে ২৮ লাখ টাকার পারিশ্রমিক না নিয়ে দেশের জন্য দিয়ে দিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হাওয়াই থেকে বাংলাদেশে তার যাতায়াত ছিল দেশের কৃষকের হাতে উন্নত মানের পাটের জাত তুলে দেয়ার স্বপ্ন থেকে। পাট নিয়ে মাকসুদুল আলমের এই স্বপ্নের সূতিকাগার অবশ্য হাওয়াই শহরে না। এর শুরু ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে কামরাঙ্গীরচরে। সেসব কথা তার নিজের বয়ানেই শোনা যাক। 

তার ছেলেবেলা: মাকসুদুল তখন ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে দশম শ্রেণীতে পড়েন। বাবা বুড়িগঙ্গার পাড়ে কামরাঙ্গীরচরে একখণ্ড জমি কিনলেন। সেখানে একটি ঘরও তৈরি করলেন। তিনি প্রায়ই সেখানে যেতেন। নিজের উদ্যোগেই ঘরের এক কোণে একটি গবেষণাগার তৈরি করলেন। বিভিন্ন উদ্ভিদের লতাপাতা এনে একটার সঙ্গে আরেকটি মিলিয়ে দেখলেন কী হয়। প্রাণরসায়ন নিয়ে গবেষণায় তার সেখান থেকেই হাতেখড়ি। সোনালি আঁশ পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনকারী দলের নেতা মাকসুদুল আলমের যাত্রা শুরু সেখান থেকে।

কামরাঙ্গীরচরের ওই টিনের তৈরি ছোট্ট শখের গবেষণাগার থেকে মাকসুদুল আলম পৌঁছে গেলেন রাশিয়া, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র হয়ে মালয়েশিয়ার বড় বড় গবেষণা কেন্দ্রে। পেঁপে, রাবার ও সর্বশেষ পাটের মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ফসলের জীবনরহস্য উন্মোচন করে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

প্রাণের জীবনরহস্য উন্মোচনের প্রথম আগ্রহের শুরুটা হয়েছিল ঢেঁড়স থেকে। একথা বলে হেসে উঠেছিলেন মাকসুদুল আলম। বলেছিলেন, একবার অনেক বন্যা হলো। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর বাবা আমাদের জমিতে ঢেঁড়সের বীজ লাগালেন। কয়েক মাস পরে দেখলাম সেখানে বিশাল আকৃতির ঢেঁড়স হয়েছে। এত বড় ঢেঁড়স আগে কখনো দেখিনি। অবাক হয়ে ভাবলাম বন্যার আগেও তো বাবা ঢেঁড়সের চারা রোপণ করেছিলেন। কিন্তু এবার এত বড় আকৃতির ঢেঁড়স কিভাবে হলো? প্রাণের এই গভীর রহস্যময় আচরণ তাকে ভাবিয়ে তুলল।

ভাবলেন নিশ্চয়ই এখানে মাটি, পানি, বীজের মধ্যে এমন কোনো সমন্বয়ের ব্যাপার আছে, যা ফসলের চেহারা ও আকৃতি একেক সময় একেক রকম করে। কী করলে সারা বছর ও সব জায়গায় একই রকম উন্নত ফসল পাওয়া সম্ভব তা অনুসন্ধান করতে থাকলেন। 

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজ পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগে ভর্তি হলেন তিনি। সেখান থেকে রাশিয়া ও জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা নেয়ার সময় বিশ্বের অনেক বড় বড় গবেষকের সান্নিধ্য পেলেন। তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিলেন। নিজের শৈশব থেকে দেখে আসা প্রকৃতি ও প্রাণের নানা রহস্য সম্পর্কে জানার আগ্রহ আর বৈশ্বিক জ্ঞান দুটোকে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছিলেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় গবেষণাগারে কাজের সুযোগ তাকে সফলতার দিকে নিয়ে যায়।

বাবার বিডিআরে চাকরি সূত্রে ঢাকা পিলখানাতেই শৈশব-কৈশোরে বেড়ে ওঠা। মাকসুদুল আলমের অন্য ভাইবোনরা তার ভাই সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানালেন, পিলখানার খেলার মাঠে বিকালবেলা সবাই হইহুল্লোড় করে খেলাধুলা করত। মাকসুদুল সবার সঙ্গে যোগ দিলেও মাঝে মাঝে সে উধাও হয়ে যেত। অনেক খুঁজে তাকে পাওয়া যেত কোনো গাছের সামনে। লতা-গুল্ম নেড়ে কী নিবিষ্ট মনে কী যেন দেখছেন। ভাবছেন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়া প্রথম সপ্তাহেই পাকবাহিনী মাকসুদুলের বাবা দলিলউদ্দিন আহমেদকে ধরে নিয়ে গেল। ৩ এপ্রিল পিলখানার এক কোণে বেশ কয়েকজন বিডিআর সেনাকে পাকবাহিনী গুলি করে হত্যা করে। সেখানে দলিলুরও ছিলেন।

বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরলেন মা লিরিয়ান আহমেদ। নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করা এই নারী সব সন্তানকে ডেকে বললেন, তোমাদেরকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। কাপড় সেলাই করাকে পেশা হিসেবে নিয়ে তিনি সংসারের হাল ধরলেন। মাকসুদুল ও তার বড় ভাই মনজুরুল (বিটিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মনজুরুল আলম) সহ চার ভাই ও চার বোনের সবাই টিউশনি করে নিজেদের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করতেন।

ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে মাকসুদুল উচ্চশিক্ষা নিতে চলে যান তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। সেখান থেকে মাইক্রোবায়োলজিতে স্নাতকোত্তর শেষ ও পিএইচডি শেষ করে আবারো জার্মানির ম্যাক্স প্লাংক ইনস্টিটিউট থেকে আবারো পিএইচডি করেন তিনি। যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে। ১৯৮৭ সালে জার্মান সায়েন্স ফাউন্ডেশনের হুমবোল্ডট রিসার্চ ফেলো, ১৯৯৭ সালে এনআইএইচ শানান অ্যাওয়ার্ড ও ২০০১ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব রিজেন্টস এক্সেলেন্স অব রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড পান তিনি। 

সবচেয়ে বড় বোন শামসুন নাহার নিরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিতে যোগ দিলেন। ভাইবোনদের উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নিলেন। সংসারের দায়িত্ব নিয়ে সবাইকে একত্রে রাখলেন। পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনকারী এই বিজ্ঞানী নিজের জীবনের সফলতার রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে বলেছিলেন, নিজের গায়ের চামড়া দিয়ে জুতো বানিয়ে দিলেও তার বড় বোনের ঋণ শোধ হবে না। মায়ের কথা বলতে গিয়ে আবারো আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন এ বিজ্ঞানী। সব ভাইবোনকে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত করে ও বিয়ে দিয়ে মা মারা গেলেন ১৯৯৮ সালে। ঠিক বাবার মৃত্যুর দিন ৩ জুন।

যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে পেঁপের জীবনরহস্য উন্মোচনের (জিনোম সিকোয়েন্সিং) সময় মাকসুদুলের শুধু আফসোস হয়েছে দেশের জন্য কিছু করতে পারলেন না। সুযোগ পেলে আমাদের দেশের জন্য প্রয়োজনীয় শস্য ও ফসলের জীবনরহস্য উন্মোচন করার সাধ তখন থেকেই ছিল। পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের আগ্রহের শুরুটা বলতে গিয়ে একথা বলেছিলেন মাকসুদুল।

যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই রাজ্যের প্রধান কৃষি পেঁপে। জীবন রহস্য উন্মোচনের পর আমরা বেশকিছু নতুন জাত উদ্ভাবন করলাম। পেঁপের বেশকিছু রোগ হতো। পোকার আক্রমণেও প্রচুর পেঁপে নষ্ট হতো। কৃষক বারে বারে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। উন্নত জাত উদ্ভাবন করে কৃষকের হাতে পৌঁছে দেয়ার পর তাদের ভাগ্য বদলে গেল। পেঁপের উত্পাদন বহুগুণে বেড়ে গেল। হাওয়াই রাজ্যের কৃষি অর্থনীতির চেহারাই পাল্টে গেল। আমার দেশের ধান, পাট, বনজ ওষুধি গাছগুলোর জীবনরহস্য উন্মোচন করা গেলে দেশের কৃষির চেহারা পাল্টে দেয়া সম্ভব, এমনটা মনে হয়েছিল তার।

২০০৮ সালের শেষের দিকে মালয়েশিয়া সরকার জিনোম সিকোয়েন্সিং নিয়ে গবেষণা করার জন্য একটি বড় গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে। সেখানে আমার ডাক পড়ল রাবারের জিনোম সিকোয়েন্সিং নিয়ে গবেষণা করার জন্য। আমার সঙ্গে হাওয়াই থেকেও কয়েকজন যোগ দিলেন। ২০০৯ সালের নভেম্বরের মধ্যেই আমরা রাবারের জিনোম সিকোয়েন্সিং উন্মোচন করে ফেললাম। তখন আরো বেশি করে দেশের জন্য কাজ করার আগ্রহ বোধ করলাম। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। প্রাণরসায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন এমন বন্ধুদের সবাই শুনেই উত্সাহ দেখাল। বলল যেকোনো মূল্যেই হোক এটা হতেই হবে। আমরাই পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করব।

২০০৮-এর জুন মাসে তৈরি হলো স্বপ্নযাত্রা নামের একটি উদ্যোগ। প্রবীণ-নবীন মিলিয়ে ৭২ জন বিজ্ঞানী ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ যোগ দিলেন আমাদের সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিনা খান ও ড. জেবা সিরাজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। আমরা নিজেদের অর্থ ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে কাজ শুরু করলাম। পাটের জিনের প্রায় দুই কোটি তথ্য হাতে চলে এল।

কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে অর্থসহায়তা দেয়ার পর ৩ জানুয়ারি আমরা নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগের ১১ জন তরুণ বিজ্ঞানী ও ডাটা সফটের ২০ জন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের তরুণ বিজ্ঞানীরা এ কাজের সঙ্গী হলেন। হাসিনা খান, জেবা সিরাজ, মাহবুব জামান দেশে বসে কাজগুলো তত্ত্বাবধান করলেন। মাঝে মাঝে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা দিলেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল।

গবেষণা শুরুর আগে সবাই লিখিতভাবে চুক্তিবদ্ধ হলেন পুরো গবেষণা শেষ হওয়ার আগে কেউ কোনো তথ্য বাইরে কারো কাছে বলব না। গবেষক দলের ৪২ জন সদস্যের সবাই তা মেনে চলেছে। তত্ত্বাবধায়কদের ছাড়া সবার পরিচয় পর্যন্ত গোপন থেকেছে।

পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের প্রধান কৃতিত্ব তরুণ গবেষকদের দিতেন মাকসুদুল আলম। গবেষণাটি সফলভাবে শেষ করতে নিজেদের ব্যক্তিগত অনেক বিষয়ে তাদেরকে ছাড় দিতে হয়েছে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত একজনের মা অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ছিল। মাকে হাসপাতালে রেখে তিনি প্রতিদিন তার গবেষণার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। মা মারা যাওয়ার তিনদিনের মাথায় আবারো কাজে যোগ দিয়েছেন। সবাইকে দিন-রাত পরিশ্রম করে কাজ করতে হয়েছে। গবেষকদের পরিবারগুলো থেকে ব্যাপক সহায়তা পাওয়া গেছে।

পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের পর তুলসীসহ নানা দেড়শ ওষুধি গাছের জীবনরহস্য উন্মোচন করতে চান মাকসুদুল আলম। দেশের প্রাণরসায়ন বিজ্ঞানীদেরকে বিশ্বমানে উত্তীর্ণ করতে চান। এজন্য তরুণ গবেষকদের দেশে ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন তিনি। বর্তমান তরুণদের চোখে-মুখে দেশপ্রেম ও অঙ্গীকার দেখতে পেয়েছিলেন মাকসুদুল। তিনি মনে করতেন, আমরা সবাই মিলে যদি তাদের জন্য গবেষণা পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিং বা জীবনরহস্য উন্মোচনকে কাজে লাগাতে পারলে তা বাংলাদেশকে বদলে দেবে বলে মনে করতেন কামরাঙ্গীরচর থেকে গবেষণা শুরু করে বিশ্ব মাতানো গবেষক মাকসুদুল।

মাকসুদুল আলম বেঁচে নেই, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত গবেষণাগারটি এখনো জাতীয় সংসদ ভবনের উল্টো পাশে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের চত্বরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। (যকৃতের জটিলতায় ভুগতে থাকা মহৎ এই বিজ্ঞানী ২০১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে কুইন্স মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আজ তার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী)। হয়তো বাংলাদেশ নামের এই রাষ্ট্রের উৎপত্তির পেছনে পাটের দাম না পাওয়া কৃষকের কষ্ট, আন্তর্জাতিক বাজারে পাট বিক্রি করে সেই টাকা পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার যে বেদনা বাঙালিদের মনে জমা হয়েছিল। সেই ক্ষোভ আর বঞ্চনা যে স্বাধীনতা যুদ্ধে রসদ জুগিয়েছিল। সে কথা মাকসুদুল আলম হয়তো ভেবেছিলন। তাই তো স্বাধীন দেশের জাতীয় সংসদ ভবনের উল্টো পাশ থেকে বাংলাদেশের পাট গবেষণার নতুন যে যাত্রা মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল, তা সফল হবে। এই স্বপ্ন তো দেখাই যেতে পারে।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

বি: দ্র: শিরোনাম পরিবর্তিত

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2