Ads-Top-1
Ads-Top-2

প্রশ্ন ফাঁস: দায়ী জুকারবার্গ!

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 10:05:00 আপডেট: 06:02:47

 প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। বলা যেতে পারে, প্রশ্নপত্র ফাঁসে আমরা বেশ এগিয়ে গেছি। এক্ষেত্রে বিশ্ব আমাদের চেয়ে কতোটা পিছিয়ে আছে, সেটা পরিসংখ্যান দিয়ে মাপার জন্য চোখে বাই-ফোকাল চশমা লাগিয়ে বুদ্ধিজীবীরা উঠেপড়ে লেগে যেতে পারেন। তবে সবচেয়ে সহজ কাজ হবে ফেসবুকের জনক মার্ক জুকারবার্গের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়া।
 
এতে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আমাদের দিকে বাড়তে পারে। কারণ, সরকারি মিডিয়া আর মন্ত্রীদের কল্যাণে দেশবাসী প্রতিদিনই জানার সুযোগ পাচ্ছে, দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রশ্নফাঁস একটা বিচ্ছিন্ন ও ছোটোখাটো ঘটনা। এটার দিকে হয়তো বিদেশীরাও নজর দেবেন না!
 
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে মন্ত্রী যখন পরীক্ষার আগে ফেসবুক দুইদিন বন্ধ করার ‘অসাধারণ’ পরামর্শ দিতে পারেন, তখন জুকারবার্গকে গ্রেফতার করতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।
জাতি এটা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছে, যারা দিনের পর দিন প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাতির ভবিষ্যতকে ফোকলা করে দিচ্ছে, তারা ধরা–ছোয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকার প্রধানের বিরুদ্ধে কেউ মন্তব্য করলে সাথে সাথে তাকে গ্রেফতার করতে সরকার দুই মিনিট দেরী করছে না। বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের কথা বাদই দিলাম। ওরা তো গিনিপিগ। যখন-তখন তাদের গ্রেফতার করা যাবে, গুম করা যাবে, জেলে দেওয়া যাবে, গণগ্রেফতার করা যাবে।
 
দুর্জনেরা বলছেন, এখন নাকি পরীক্ষার পড়া রিভিশন দেয়ার চেয়ে শিক্ষার্থীরা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সংগ্রহতেই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এই অভিযোগে জুকারবার্গকে গ্রেফতার করা যায় কিনা, তা সরকারের বিজ্ঞ মহল ভেবে দেখতে পারেন।
 
আসলে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে করা বেশ কঠিন। কারণ শিক্ষকরাই বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন, কিভাবে বোর্ড থেকে এসএসসি, এইচএসসিসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় অধিক নম্বর দিয়ে অধিক হারে জিপিএ প্রাপ্তির সংখ্যা দেখানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মানে শিক্ষার গুণগত মান নয়, সংখ্যা বাড়ানোর দিকেই সরকারের নজর। বোঝা যাচ্ছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ‘অপরাধের’ পর্যায়ে নেই, এটা ‘কৌশলে’ পরিণত হয়ে গেছে। তাই যারা প্রশ্নফাঁসে জড়িত, তাদের গলায় স্বর্ণের মেডেল ঝুলিয়ে সম্মানিত করা করা উচিত। যদি বিচার করতেই হয়, তাহলে জুকারবার্গের বিচার হওয়া উচিত। কারণ ওই ব্যাটা কেন যে ফেসবুক বানাতে গেল! প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে ফেসবুকের উপর মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী গোস্বা দেখে এটা যে কোনো ম্যাঙ্গো-পাবলিক  (আম-জনতা) ভাবতেই পারেন।
 


জাতি এটা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করেছে, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা মিডিয়াতে প্রকাশ পেলেই শিক্ষামন্ত্রী এটাকে প্রায়ই ‘গুজব’বা দেশের স্বার্থবিরোধী এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রগতিশীল রাজনীতির বিরোধী কর্মকাণ্ড বলে চালিয়ে দিয়েছেন। সর্বশেষ দোষটা চাপিয়ে দিলেন শিক্ষকদের ঘাড়ে। সোজা কথায়, সত্যকে চাপা দিয়ে দুর্নীতিবাজদের রেহাই দেওয়ার ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি স্বাভাবিক ঘটনায় দাঁড়িয়েছে, যা এখন শৈল্পিক রূপে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফেসবুকের মাধ্যমে হাতের নাগালে চলে এসেছে। সুতরাং জুকারবার্গ বাবাজির বুঝি এবার আর রক্ষা নেই!
 
আমি আশঙ্কায় আছি, চুরি–ডাকাতি প্রতিরোধে বাড়িতে মূল্যবান জিনিসপত্র না রাখার নির্দেশনাটি মন্ত্রীরা কখন জানি জাতিকে দিয়ে দেন। একই কায়দায় দুর্ঘটনা রোধে গাড়ি না চড়া বা রাস্তায় না হাঁটারও পরামর্শ বা সরকারি নির্দেশনা আসতে পারে।
 
প্রথম ও দ্বিতীয় পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে শিশুদের উপর কী কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে? দুর্জনেরা মনে করছেন, মোটেও নয়। কারণ তারা এসব বুঝবে না! মাশাআল্লাহ! বদের বাষট্টি আর কারে কয়?
 
দুর্জনেরা নাকি এটাও বলছেন, দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের যে মহোত্সব চলছে, তার ফল এখন টের না পেলেও আর কয়েক বছরের মধ্যেই এর ফল জাতিকে ভোগ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, এমনকী চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাতেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। সন্দেহ নেই, আগামীতে অযোগ্যরাই যোগ্যদের স্থান দখল করে দেশকে করে তুলবে অচল, অর্থনীতিকে করবে ভারসাম্যহীন। তথাকথিত সৃজনশীল পরীক্ষার নামে জাতিকে বিজ্ঞানমনস্ক করা এই প্রক্রিয়া দেখে কি আপনি বিস্মিত হচ্ছেন? আমি হই না। জুকারবার্গের গ্রেফতার দেখলেও হবো না। এটাই আমার অযোগ্যতা। এটাই আমার ক্ষমাহীন ব্যর্থতা!
 
প্রশ্নফাঁসের এ মহামারীর জন্য পরীক্ষা নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ভয়াবহভাবে পরীক্ষাকেন্দ্রিক করে ফেলা হয়েছে। ‘ক্লাসরুমে সে কী শিখছে, শিক্ষকরা কেমন পড়াচ্ছেন তা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখলো বা জানলো তা না দেখে দেখা হচ্ছে পরীক্ষায় কে কত ভালো করছে। শিক্ষার্থীরা মূল বই না পড়ে গাইড নোটের পেছনে ছুটছে। যে কোনো উপায়ে ভালো ফল করার মানসেই এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধংস করে দিচ্ছে।’ তাঁর ভাষায়, ‘অভিভাবকদের মনে এক ধরনের ধারণা প্রোথিত করা হয়েছে যে শিক্ষাও এক ধরনের পণ্য এবং তা কিনতে পাওয়া যায়। তাই তারা টাকা ব্যয় করে ছোটে প্রশ্নপত্রের পেছনে।’
 
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, বিশ্লেষক
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বাধিক পঠিত
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2