শিরোনাম:
Ads-Top-1
Ads-Top-2

​ভুলে যাওয়া ইতিহাস

আলেমদের রেশমি রুমাল আন্দোলন

রেজাউল করিম
১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার
প্রকাশিত: 05:01:00 আপডেট: 12:00:00

ব্যবসা- হ্যাঁ, ব্যবসার জন্যই এসেছিল ইংরেজরা। সবাই, এমনকি বিলাসিতায় মত্ত থাকা তৎকালীন মোগল সম্রাটরাও জানত ইংরেজদের ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে ব্যবসার জন্যই এসেছে। কিন্তু পরে দেখা গেল এটা ছিল ইংরেজদের প্রতারণা। ব্যবসার আড়ালে মূলত তারা এসেছিল ভারতের শাসনক্ষমতা দখলের জন্য।
 
এক পর্যায়ে তারা মুসলমানদের কাছ থেকে শাসনক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়। ক্ষমতার মসনদে বসে ইংরেজরা এদেশে শোষণ নিপীড়নের শাসন চালাতে থাকে। ইংরেজদের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে বিক্ষিপ্ত কিছু বিদ্রোহ হয়। কিন্তু সেগুলো ব্যর্থ হওয়ায় দেশের সাধারণ মানুষ ইংরেজদের উড়ে এসে জুড়ে বসা দুঃশাসনকে অগত্যা মেনে নেয়। কিন্তু চিরস্বাধীনতাকামী আলেম সমাজ সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার নিরবচ্ছিন্ন মেহনত চালিয়ে যান। রেশমি রুমাল আন্দোলন তারই একটি অংশ। এ আন্দোলনে যারা নেতৃত্বে ছিলেন শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান রহঃ।
 
মাওলানা মাহমুদুল হাসান ১৮৫১ সালে বেরেলীতে এক বিদ্বান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাওলানা জুলফিকার আলী সরকারি শিক্ষা বিভাগের ডেপুটি ইন্সপেক্টর ছিলেন। মাওলানা মাহমুদুল হাসান, চাচা মাওলানা মাহতাব আলীর নিকট হতে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৮৬৬ সালে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামি বিদ্যাপীঠ ঐতিহাসিক দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে সেখানে ভর্তি করানো হয়। তিনি হচ্ছেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম ছাত্র।
 
লেখাপড়া শেষে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতার মহান পেশার মাধ্যমে তিনি স্বাদীনতার চেতনায় উদ্দীপ্ত একদল ছাত্র গড়ে তুলেন। তিনি ১৯০৯ সালে তাঁর একনিষ্ঠ শিষ্য স্বাধীনচেতা মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধীকে জমিয়াতুল আনসার নামক এক সংগঠনের পতাকাতলে সকল ছাত্রকে সমবেত করার নির্দেশ দেন। এরপর ভারতকে ব্রিটিশ আগ্রাসন থেকে মুক্ত করার জন্য শাইখুল হিন্দ রহঃ ‘আজাদ হিন্দ মিশন’ নামে একটি বিপ্লবী পরিষদ গড়ে তুলেন। একটি চূড়ান্ত বিপ্লবের মাধ্যমে ইংরেজদেরকে এদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে আন্দোলন শুরু করেন। যা ইতিহাসে ‘রেশমি রুমাল’ আন্দোলন নামে সমধিক পরিচিত। উল্লেখ্য, এটাই ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন।
 
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিশ্ব দু’টি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে ছিল ইংল্যান্ড ও তাদের মিত্র শক্তি ফ্রান্স, ইতালি, রাশিয়া, বেলজিয়াম ও জাপান। অপরদিকে কেন্দ্রিয় শক্তি হিসেবে তাদের বিপরীতে ছিল জার্মান, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও তুরস্ক। এ সময় শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান রহঃ তুর্কী ও আফগান সরকারের সাথে এই ঐক্যমতে উপনীত হন যে, তুর্কী বাহিনী নির্ধারিত সময়ে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে এসে ব্রিটিশ-ভারতে আক্রমণ করবে এবং একই সময় ভারতবাসীও একযোগে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। এভাবে ব্রিটিশদেরকে উৎখাত করে তুর্কী বাহিনী বিপ্লবী সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে স্বদেশে ফিরে যাবে। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় আক্রমণের জন্য নির্ধারিত তারিখটি হবে ১৯১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। এ সময় ইংরেজ সরকার বেশ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। রাজনৈতিক নেতাদের ধরপাকড় শুরু হয়। মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহার, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও মাওলানা শওকত আলী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ গ্রেফতার হলে শাইখুল হিন্দ তাঁর শিষ্য মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধীকে কাবুল চলে যেতে বলেন। আর তিনি নিজে রওনা হন হিজাজের পথে। হিজাজ তখন ছিল তুরস্কের শাসনাধীন। শাইখুল হিন্দ তার পরিকল্পনা নিয়ে হিজাজের গভর্নর গালিব পাশার সাথে কথা বলেন। এরপর মদীনায় তুরস্কের যুদ্ধমন্ত্রী আনোয়ার পাশার সাথে তার বৈঠক হয়।
 


উভয়ের মাঝে সর্বাত্মক সহযোগিতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শাইখুল হিন্দ আনোয়ার পাশাকে দিয়ে আফগান সরকারের উদ্দেশ্যে পত্র লিখিয়ে নেন। তাতে লেখা ছিল আফগান সরকারের সম্মতি থাকলে ১৯১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী তুর্কী বাহিনী আফগান সীমান্তের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ-ভারত আক্রমণ করবে এবং সাথে সাথে ভারতের অভ্যন্তরেও বিদ্রোহ ঘটাবে। পত্রটি আফগানিস্তানে অবস্থানরত মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধীর কাছে পৌঁছানো হয়। তার নেতৃত্বে ভারতীয় নেতৃবৃন্দ পত্রটি নিয়ে আফগান বাদশাহ হাবিবুল্লাহ্‌র সাথে সাক্ষাৎ করেন। ইংরেজদের কাছে নতজানু হওয়ার কারণে বাদশাহ হাবিবুল্লা বিষয়টি ভালোভাবে গ্রহণ করলেন না। তবে পরিস্থিতির চাপে তিনি ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন। মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধী ও আমীর নাসরুল্লাহ খান চুক্তির বিষয়বস্তু ও ভারত আক্রমণের তারিখ আরবিতে রূপান্তর করেন। এরপর একজন দক্ষ কারিগর দ্বারা একটি রেশমি রুমালের গায়ে সেই আরবি ভাষ্য সুতার সাহয্যে অংকিত করে মক্কায় অবস্থানরত শাইখুল হিন্দ রহঃ এর নিকট পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। যাতে ব্রিটিশ বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে খবরটি নির্বিঘ্নে পৌঁছানো যায়।
 
একজন কাপড় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সিন্ধুর শাইখ আবদুর রহীমের নিকট রেশমি রুমালরূপী পত্রটি পৌঁছানো হয়। যাতে হজ্জে গিয়ে তিনি তা শাইখুল হিন্দ রহঃ এর হাতে পৌঁছে দেন। অপর দিকে বাদশাহ হাবীবুল্লাহ বিরাট অংকের আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এসব গোপন তথ্য ইংরেজদের সরবরাহ করে। ফলে গোয়েন্দা পুলিশ শাইখ আব্দুর রহীমের বাড়ি তল্লাশী চালিয়ে রেশমি রুমালরূপী পত্রটি উদ্ধার করে। ইংরেজ বিরোধী গোপন তৎপরতার কথা ফাঁস হয়ে যায়। শুরু হয় নেতাকর্মীদের ধরপাকড়। ইতিমধ্যে ইংরেজদের মদদপুষ্ট শরীফ হুসাইন হিজাজে তুর্কী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। গালিব পাশা, শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান, সহযোগী মাওলানা উযাইর গুল, মাওলানা ওয়াহীদ আহমদ ও মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীকে গ্রেফতার করা হয়।
 
ইংরেজরা শাইখুল হিন্দ রহঃ-কে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পর্‌যাপ্ত রেকর্ডপত্র না থাকায় তারা আপসহীন স্বাধীনতা সংগ্রামী এই নেতাকে ভূমধ্য সাগরীয় দ্বীপ মাল্টায় নির্বাসনে প্রেরণ করে। স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের চূড়ান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো প্রেরণের জন্য রেশমি রুমালকে মাধ্যম বানানোর কারণেই এ ঘটনাটি ইতিহাসে “রেশমি রুমাল” আন্দোল নামে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।
 
‘রেশমি রুমাল’ আন্দোলন হয়েছিল ১৩৩৪ হিজরী সালে (১৯১৬ ইং সালে)। ১৩৩৪ থেকে ১৪৩৪ পেরিয়ে যায় একশটি বছর। শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে ভারত সরকার গত ১১ জানুয়ারি ‘রেশমি রুমাল’ আন্দোলনের উপর ডাকটিকেট প্রকাশ করে। এতে দারুল উলুম দেওবন্দে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। রাজধানী দিল্লীর বিজ্ঞান ভবনে আয়োজিত ডাক-টিকিট প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি বলেন, স্বাধিনতার জন্য শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান ও শাইখুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীর আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন জেনারেশনকে অবশ্যয়ই জানতে হবে। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন দারুল উলুম দেওবন্দের মজলিসে শুরার সদস্য আনওয়ারুর রহমান।
 
তিনি বলেন, আজ শাইখুল হিন্দ রহঃ এর অবদানকে স্বীকৃতি প্রদানের সাথে সাথে মূলত দারুল ‍উলুম দেওবন্দের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়া হলো। তথ্যমন্ত্রী শ্রী কপিল সিবাল বলেন, আমাদের স্মরণ রাখা ‍উচিত, মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দীই মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধীকে মহাত্মা উপাধি প্রদান করেছিলেন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রধান মাওলানা কারী মুহাম্মাদ উসমান মানসূরপুরী আল্লাহ্‌র শুকরিয় আদায় করে বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের মুজাহিদদের স্মরণ করা হয়েছে এবং স্বধীনতা আন্দেলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ রেশমি রুমাল আন্দোলনের উপর ডাক-টিকেট প্রকাশ করে তা স্বীকৃতি প্রদান করা হলো।
 
তিনি আরও বলেন, যদি রেশমি রুমাল আন্দোলন সফল হতো তাহলে ভারত তিরিশ বছর পূর্বে স্বাধীন হতো। উত্তর খন্ডের গভর্নর ড. আজীজ কুরইশী বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনে উলামায়ে দেওবন্দের অবদানকে সিলেবাসভুক্ত করা উচিত। তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। ইতিহাসের পাতায় তাদের যোগ্য আসন দান করা হয়নি। ভারত দেরীতে হলেও বৃটিশ খেদাও আন্দোলনে উলামায়ে দেওবন্দের অবদানকে স্বীকৃতি দিল। আর আমরা? এদেশে কখনো বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন হয়েছিল সে’কথা আমরা একদম ভুলে গেছি। নাকি পরিকল্পিতভাবে ভোলানো হচ্ছে?
 
ব্রেকিংনিউজ/জিয়া
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2