Ads-Top-1
Ads-Top-2

জেরুজালেম, প্রিয় জেরুজালেম

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
১১ ডিসেম্বর ২০১৭, সোমবার
প্রকাশিত: 02:12:00 আপডেট: 12:00:00

আশির দশকে ইয়াসির আরাফাতের একটি মন্তব্যে বলা হয়েছিল: Anyone who relinquishes a single inch of Jerusalem is neither an Arab nor a Muslim- যিনি জেরুজালেমের এক ইঞ্চি ভূমির দাবি ত্যাগ করেন, তিনি আরবও নন, মুসলিমও নন। তখন এটাকে একজন বিপ্লবী নেতার স্মার্ট বিবৃতিই মনে হয়েছিল। এখন শত কোটি মুসলিমের মতো জেরুজালেম আমারও প্রাণের স্পন্দন; মূল্যবোধের আকর।
 
ভূমধ্যসাগর ও মৃতসাগরের মাঝে অবস্থিত ‘দখল’ শহরটির বর্তমান আয়তন ১২৫ বর্গকিলোমিটার। বলা যায়, ছোট্ট একটি শহর। অথচ শহরটার এমন কোনো জায়গা নেই যেটা মানুষের রক্তে ভিজেনি। ভাবা যায়, প্রতিষ্ঠার সাড়ে তিন হাজার বছর পরেও এই শহরের চাহিদা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং দিনকে দিন বাড়ছে! কবি সাহিত্যিক ও শিল্পীরাও এই শহরের বন্দনা করেছেন যুগে যুগে।
 
শহরটি মুসলিমদের কাছে আল-কুদস, খ্রিস্টানদের কাছে জেরুজালেম, ইহুদিদের কাছে ইরুশালাইম নামে পরিচিত। হাজার বছর ধরে পৃথিবীর অন্যতম পবিত্র নগরীর মর্যাদা এটির। আর এই ছোট্ট শহরকে ঘিরে, তিন ধর্মের মানুষের এমন আবেগ, স্মৃতি বা ঐতিহ্য নেই পৃথিবীর আর কোথাও।
 
ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা, ‘ওল্ড সিটি’ খ্যাত শহরটি বিভক্ত মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান ও আর্মেনীয় বসতিতে; যেখানে আছে বিভিন্ন ধর্মের অনেক পবিত্র স্থাপনা। তাই নগরীর পবিত্রতা নিয়ে মতভেদ না থাকলেও নিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে আছে নানা বিতর্ক; আছে দফায় দফায় দখল, পুনর্দখল, ধ্বংস আর পুনর্নির্মাণের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস।
 
তবে সবচেয়ে বেশি টানাপড়েন, পবিত্র ভূমি ‘হারাম আল শরিফ’-কে ঘিরে। এখানেই রয়েছে ইসলামের তৃতীয় পবিত্র মসজিদ আল-আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাসসহ মুসলিমদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বলা হয়, এটাই মুসলিমদের প্রথম কিবলা আল-আকসা। শবে মেরাজের রাতে এখান থেকেই আসমানে যাত্রা করেছিলেন মহানবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
 
আবার একই জায়গায় অবস্থিত, ইহুদিদের পবিত্র ভূমিখ্যাত ‘টেম্পল মাউন্ট’ বা ‘ঈশ্বরের ঘর’, যা মুসলিমদের কাছে পবিত্র ‘কুব্বাত আস-সাখরা’। টেম্পল মাউন্টকে ঘিরে থাকা ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’ ইহুদিদের কাছে ‘পৃথিবীর ভিত্তিপ্রস্তর’ হিসেবে স্বীকৃত। এখানে নিয়মিত প্রার্থনায় অংশ নেয় লাখো ইহুদি। যিশু খ্রিস্টের স্মৃতিবিজড়িত গির্জার কারণে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছেও পবিত্রতার দিক থেকে সমান গুরুত্বপূর্ণ জেরুজালেম। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, এখানেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল যিশুকে।
 
এটাই পৃথিবীর একমাত্র শহর, যা ৫২ বার আক্রমণের শিকার হয়েছে। এই শহরের ভাগ্য এতই মন্দ যে, তা ৪৪ বার দখল-পুনর্দখল হয়েছে, ২৩ বার অবরোধের মুখে পড়েছে। আর পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে কমপক্ষে দুই বার! তবুও এই শহরটিকে আছে। শুধু টিকে আছে বললে ভুল হবে, সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে এই শহর প্রভাবিত করে চলেছে সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে। এই শহরকে বলা হয় এক ঈশ্বরের আবাসস্থল, দুই জাতির রাজধানী ও তিন ধর্মের উপাসনালয়। ঐতিহাসিকরা বলেন, এই শহর রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই শহরের ইতিহাস মানুষের রক্ত নিয়ে উৎসব করার ইতিহাস।



এই শহর নিয়ে প্রথমে ইহুদি (বনি ইসরাইল), রোমান ও পারসিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। তারপর তাতে যোগ দেয় খ্রিস্টান ও মুসলমানরা। মুসলিমদের আগে ৫০০ বছর ধরে এই শহরের নিয়ন্ত্রণ ছিল রোমানদের হাতে। রোমানরা ছিল খ্রিস্টান। তখন ইহুদিদের জেরুজালেমে প্রবেশের অধিকার ছিল না। মুসলিমদের প্রতিনিধি হয়ে ওমর বিন খাত্তাব (হযরত ওমর) এই শহর যখন জয় করেন তখন তিনি ইহুদিদের এই শহরে প্রবেশের অধিকার দেন।
 
চারশ বছর মুসলিম শাসনের পর তা পুনরায় খ্রিস্টানদের অধিকারে আসে। ওমরের পরে সুলতান সালাহউদ্দিন পুনরায় জেরুজালেম দখল করেন। সালাউদ্দিনের পরে আবার খিস্টানরা। এভাবে দখল-পুনর্দখলের খেলা চলছিল মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মাঝে। সর্বশেষ ১৯৪৮ সালে জর্ডান জেরুজালেম দখল করে। কিন্তু ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে তা পুনরায় ইহুদিদের দখলে চলে যায়।
 
১৯১৭ সালের ডিসেম্বর মাস। অটোম্যান তুর্কিদের কাছ থেকে ব্রিটিশ জেনারেল এডমান্ড অ্যালেনবি জেরুজালেমের দখল নিয়ে নেন। সেদিন জেনারেল অ্যালেনবি শহরের পবিত্রতার প্রতি সম্মান দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন খালি পায়ে। এরপর গত ১০০ বছর ধরে, জেরুজালেম নিয়ে নানা রকম লড়াই হয়েছে। শুধু ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানই নয়, বহিঃশক্তিও এসেছে সমীকরণে। আধুনিক যুগে ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি লড়াই তার অন্যতম। বিশ্বজুড়ে ব্রিটিশরা সচেতনভাবেই যেসব হাই প্রোফাইল নোংরামি করেছে, জেরুজালেমে ইহুদি স্যাটেলারদের ঢুকতে দেয়া তাদের মধ্যে অন্যতম। তারই প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৫৫ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কণ্ঠে: You ought to let the Jews have Jerusalem; it was they who made it famous.
 
আবার ইসরাইলের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূগোলবিদ্যার অধ্যাপক ইয়েশুয়া বেন-আরিয়েহও মনে করেন, ব্রিটিশদের কারণেই জেরুজালেম এত গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। তারাই জেরুজালেমকে রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অথচ ইহুদিদের প্রথম বা দ্বিতীয় মন্দির নির্মাণের সময় থেকে জেরুজালেম কখনই কারো রাজধানী ছিল না।
 
জেনারেল অ্যালেনবি জেরুজালেম দখলে নেওয়ার পর তিন দশক ব্রিটিশরা এটা শাসন করে। তখনই জায়নবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু ইহুদি সেটেলার শহরটিতে পাড়ি জমাতে থাকে তৎকালীন ব্রিটিশ ফিলিস্তিনে। স্থানীয় আরব জনগোষ্ঠীর কাছে তখন অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতনের কারণে সৃষ্ট নতুন বাস্তবতা মেনে নেওয়া বৈ কোনো উপায় ছিল না। অটোম্যানরা ১৫১৭ সাল থেকে ১৯১৭ পর্যন্ত জেরুজালেম শাসন করেছে।
 
জেরুজালেম ইন্সটিটিউট ফর পলিসি রিসার্চ নামে একটি থিংক ট্যাংকের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যামনন র‌্যামন বলেন, ‘মজার বিষয় হলো, প্রাথমিকভাবে জায়নবাদী চিন্তকরা কিন্তু জেরুজালেম, বিশেষ করে পবিত্র ওল্ড সিটি থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন। প্রথম কারণ হলো জেরুজালেমকে মনে করা হতো ইসরাইলের বাইরে বসবাসরত ইহুদিদের প্রতীক। দ্বিতীয়ত, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের পবিত্র স্থাপনা থাকায় এই শহরকে রাজধানী করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করায় জটিলতা ছিল।’
 
১৯৭৭ সালে ডানপন্থী লিকুদ পার্টি ইসরাইলের ক্ষমতায় আসে মেনাচিম বেগিনের নেতৃত্বে। এরপরই ইসরাইলি জাতি-পরিচয়ের সঙ্গে জেরুজালেমের সম্পর্ককে অবিচ্ছেদ্য হিসেবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা হালে পানি পেতে থাকে। ইসরাইলের রাজনীতিতে ধর্মীয় সেটেলাররা আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। সেই থেকে এই প্রভাব আর কখনও কমেনি।
 
এই পরিবর্তনের কারণে জেরুজালেমের প্রতীকী গুরুত্ব ইসরাইলে বেড়ে যায়। ইহুদি ইতিহাসে জেরুজালেমের ভূমিকা সামরিক কুচকাওয়াজ, পাঠ্যক্রমে গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ইসরাইলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্কুলছাত্রদের জেরুজালেম সফরে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। এই জেরুজালেমকরণ তুঙ্গে উঠে ১৯৮০ সালে, যখন ইসরাইলি আইনপ্রণেতারা একটি বিল পাস করেন, যাতে বলা হয়, ‘পূর্ণাঙ্গ ও ঐক্যবদ্ধ জেরুজালেমই ইসরাইলের রাজধানী।’ দখলে থাকলেও, ইসরাইল আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় পূর্ব জেরুজালেম আত্মসাৎ (অ্যানেক্স) করা বা নিজ ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু ট্রাম্প সব সমীকরণ পাল্টে দিয়ে ইহুদিদের বগলে আশ্রয় নেন। ফের রক্তগঙ্গা বইছে।
 
লেখক: সাংবাদিক, বিশ্লেষক

ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি
 

সংশ্লিষ্ট আরো খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2