শিরোনাম:
Ads-Top-1
Ads-Top-2

‘বাঘ-ভালুকের রাজ্যে থাকি.....’

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
৮ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার
প্রকাশিত: 03:13:00 আপডেট: 12:00:00

সহজ কথা বলা ও লিখা, কোনোটাই সহজ নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এ কথার স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। এ সহজ সরল, অকপট স্বীকৃতির জন্য তার অক্ষমতার (?) নিন্দা আজ পর্যন্ত কেউ করেননি, করাটা সঙ্গতও নয়। বরং তার সহজ-সরল স্বীকৃতি একটা আদর্শিক ব্যাপ্তিতে পরিণত হয়েছে। তারপরও আমরা এ কথামালা নিয়ে প্রতিদিন কোলাহলে মাতি, ঝগড়া-ঝাঁটি করি, আবার আপসও করি। মুগ্ধ হয়ে বত্রিশ দন্ত বিকশিত করে স্ত্ততি গাই। না-পছন্দ হলে মুর্দাবাদও দিই।
 
অবশ্য ঘড়েল লোকদের কথা আলাদা। তারা উদ্দেশ্যবাজ, চান্সনারায়ণ। উদ্দেশ্য ছাড়া তারা বাঁচেনও না, মরেনও না। কারো বেফাঁস কথায়, না-হক কথায় তারা মুচকি হাসেন, বগল দাবান, কায়দামতো সমর্থন জানাতেও ভুল করেন না। পরজীবী সম্প্রদায়ের মতো তারা তেল মারেন, সুযোগমতো আখেরও গোছান সঙ্গোপনে। এক্ষেত্রে তাদের যুক্তি: ‘তেলা মাথায় তেল দেয় সরকারেও/তেলহীনেরা পায় না তেল দরকারেও।’
 
এসব মহামানবের সরেস উপমা দেয়া যায় বাদুর আর ক্যাঙ্গারুর সঙ্গে। বাদুরের মতো তারা স্বার্থের ডালে ডালে ঝুলে থাকেন অথবা ক্যাঙ্গারুর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে আদর্শ বা ‘গুরু’ পাল্টান। মওকামতো কথার চাল দিয়ে তারা বাঘ বনে উতরে যায়। আর কর্তার কথার মর্ম যারা বোঝেন না, বুঝতেও চান না অথবা ধার ধারেন না, তারা পদে পদে হোঁচট খেয়ে বিড়াল সেজে ঘরের কোণে সঙ্গোপনে কল্কে টানেন।
 
কথা বলা একটা আর্ট এবং কথার শক্তি আছে। এটা মানুষকে প্রভাবিত করে। ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। আসলে আমরা কথায় হাসি, কথায় কাঁদি। কথায় দেশ জয় হয়, কথায় মন জয় হয়। কারো কথায় গলে যাই, কারো কথায় রেগে যাই। আবার কখনো শুধু কথায় চিড়ে ভিজে না।
 
পৃথিবীর ভূগোলের একটা স্বীকৃত মাপকাঠি থাকলেও কথার প্রকারভেদের কোনো মাপকাঠি নেই। ইষ্টকথা, তত্ত্বকথা, দশকথা, মর্মকথা, মোটকথা, সুকথা, অজানা কথা, অনুক্ত কথা, অনুচিত কথা, অতি গোপন কথা, অদ্ভুত কথা, অপ্রিয় কথা, অযৌক্তিক কথা, একটানা কথা, আন্দাজি কথা, কথার মতো কথা, খোনা কথা, গা-জোরি কথা, গায়েবি কথা, ঘুমজুড়ানো কথা, চাট্টিখানি কথা, চ্যাটাং-চ্যাটাং কথা, ছোটমুখে বড় কথা, টানা টানা কথা, ঠেস মারা কথা, ড্যামনা কথা, তেরছা কথা, দশ কথার এক কথা, না-হক কথা, ন্যাকা-ন্যাকা কথা, পষ্টাপষ্টি কথা, প্রাইভেট কথা, ফুটানি মারা কথা, বাতেনি কথা, বে-আন্দাজি কথা, ভাবের কথা, মস্তবড় কথা, মুখ-ফসকা কথা, মোদ্দা কথা, যার-তার কথা, রঙ্গ-তামাশার কথা, লম্বা-চওড়া কথা, শানানো কথা, আত্মকথা, স্মৃতিকথা, রূপকথা, কল্পকথা, ইতিকথা, ছোট মুখে বড় কথা, গোপন কথা, আসল কথা, নকল কথা, কাজের কথা, কথার কথা, কটু কথা, সত্য কথা, মিথ্যা কথা, ফালতু কথা, ভাংতি কথা, দুষ্ট লোকের মিষ্টি কথা, কড়া কথা, সুখের কথা, দুঃখের কথা, মনের কথা, দেশের কথা, দশের কথা, সহজ কথা, কঠিন কথা, শেষ কথা, সাফসাফা কথাসহ হাজার রকমের কথা থাকলেও তার ফিরিস্তি দেয়া সম্ভব নয়।
 
আবার উচিত কথায় দেবতা তুষ্ট হলেও মানুষ তুষ্ট হয় না। কথার গোলক ধাঁধায় পড়ে আবার সেই মানুষই যখন বলে, ‘অকথাও কথা হয়, যদি দশে কয়’ তখন কোথায় যাবেন বলুন? বান্দরবান ছেড়ে সুন্দরবনে যাবেন? না হয় গেলেন। কিন্তু এরপর তো সীমান্ত। ‘পুশইন’ হলেই বাংলা বাতচিত শুনে রাইফেলের বাটন দিয়ে প্যাঁদিয়ে সোজা ‘পুশব্যাক’ করে দেবে।
 
আসলে কথায় কথায় আমাদের দিন কাটে। বিকাল গড়ায়, সন্ধ্যে হয়, রাত নামে। আবার সকালে কর্ণফুলির পুবপাশের পাহাড়গুলোর ফাঁক দিয়ে রাঙ্গামুখো সূর্যটা ওঠে। আমরা কবিতার কথা, বাজেটের কথা, বন্যার কথা, মুদ্রাস্ফীতির কথা, প্রধানমন্ত্রীর কথা, উইকিলিকসের কথা, সহায়ক সরকারের কথা, পত্রিকার ফার্স্ট লিড, সেকেন্ড লিড আর বটম লিডের কথা বলি। সবচেয়ে বেশি বলি পরচর্চার কথা। আবার যা বলি, তাতে আমাদের বিশ্বাস থাকে না। নড়চড়ন হয়, থার্মোমিটারের পারদের মতো ওঠে আর নামে। অনেকটা বানরের সেই তৈলাক্ত বাঁশে চড়ার মতো।
 
আসলে কথা কাটাকাটি, কথা চালাচালি, কম বেশি আমরা সবাই করি। আবার আমরা কথাও দিই। পরক্ষণে তা ভুলে যাই, খেয়ে টিস্যুতে মুখ মুছে ফেলার মতো। ভোজসভাতে সবার আগে যাই, আর প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেয়ে অবসাদে বত্রিশটা ঢেঁকুর তুলে মন্তব্য করি, ‘এই আয়োজনের সবটাই অপচয়, নাগরিক আইনে ওদের জরিমানা হওয়া উচিত।’ কোথায় যেন পড়েছিলাম, ‘আমরা কথা দেই, আবার দেই না, কথা না দিয়েও দিয়ে দেই। আমরা সত্য কথা বলি, আবার মিথ্যা কথাও বলি। এতে প্রমাণিত হয় আমরা মানুষ।’
 
রবীন্দ্রনাথ এক নতুন ধরনের কথার নাম বলে গেছেন। এ কথার নাম ‘চুপকথা’। তিনি বলেছেন, ‘পথ ভুলে যাই দূরপারে সেই চুপকথার।’ তবে আমরা কেউ তার ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পের মিনির মতো কথা না বলে একদণ্ড থাকতে পারি না। অথচ তার চুপকথার রাজ্যে ডুব মারতে পারলে অনেক ফ্যাসাদ সহজেই মাইনাস করা যায়। কিন্তু চুপ করে যে থাকা যায় না! হৃদযন্ত্রে প্রতিক্ষণ কথার স্পন্দন অনুরণিত হয়, আকুলি-বিকুলি করে। কথা না বলে আমরা থাকতে পারি না। শান্তি আর উদ্বেগে, উত্তেজনা আর দুঃখে, খেয়ালে-বেখেয়ালে আমরা কথার মালা গাঁথি প্রতিদিন, প্রতিরাত। চুপকথার হাকিকত বুঝেও আমরা কথার মাঝে নিজেদের হারাই।
 
বাও বুঝে কথা না বললে হিতে বিপরীত হয়। সুতরাং কথামালা যেমন ব্যাকরণহীন নয়, তেমনি সীমান্ত ছাড়াও নয়। সময়, পরিবেশ ও আবেষ্টনের কারণে একই কথাকে শালীন অথবা অশালীন হতে দেখা যায়।
 
কিন্তু বড় কথার কিছু মানুষকে চাটুকারিতার বন্যায় ভাসতে দেখে সবকিছু পাওয়ার মাঝেও একটা না পাওয়ার বেদনা মনকে পীড়িত করে, জীবনাহত করে। তখন যে আর চুপ করে থাকা যায় না, বিদ্রোহী মনটা কথা বলে ওঠতে চায় জীবনের প্রয়োজনে। কিন্তু জীবন যুদ্ধে এ জাতীয় বিদ্রোহ আর কথা বলার নতিজা অনুমোদনীয় নয়। তাই চুপি চুপি বলছি, ‘বাঘ-ভালুকের রাজ্যে থাকি, মনের কথা মনেই রাখি।’
 
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, বিশ্লেষক
 

Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
Ads-Sidebar-3
সর্বশেষ খবর
Ads-Sidebar-3
Ads-Top-1
Ads-Top-2