শিরোনাম:

আমার বাবার ‘বুড়ি’ আমি

মাহদিয়া রহমান বুশরা
প্রকাশিত : রবিবার, ১৮ জুন ২০১৭, ১২:০৯
অ-অ+
আমার বাবার ‘বুড়ি’ আমি
ফাইল ফটো

১৯৯১ সালের ১৮ অক্টোবর, মদিনায় তখন মাত্র ফজরের আজান হচ্ছে আর বাংলাদেশের ঘড়িতে সকাল ৯টা। সিদ্দিক সাহেব নামাজের জন্য উঠলেন; এমন সময় একটা ফোন এলো। তিনি একটু অবাকই হলেন। এতো সকালে তো সাধারণত কেউ ফোন করে না। তাহলে কি কোনও খারাপ খবর আছে? ভয়ে ভয়ে ফোনটা তুললেন তিনি। কোনও কথা না বলে চুপচাপ অপর প্রান্তের কথা শুনতে লাগলেন। না কোনও খারাপ খবর না, তিনি শুনতে পেলেন তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের খবর। তিনি বাবা হয়েছেন, মেয়ের বাবা। অবশেষে মহান আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেছেন, তাকে ৯ বছর পরে হলেও আর একটা মেয়ে দিয়েছেন। এ এস এম সিদ্দিকুর রহমান, আমার বাবা। পেশায় তিনি একজন প্রিন্সিপাল, সেই সাথে ব্যবসায়ী, যদিও ব্যবসার মারপ্যাঁচ কিছুই তিনি বুঝেন না।
 
আমার জন্মের কথাটা বাবা এভাবেই জেনেছিল। এর নয় মাস পরে বাবা দেশে আসে। ৯ মাস বয়সে আমি আমার বাবাকে প্রথম দেখি (যদিও আমার কিছু মনে নেই, মায়ের মুখে শোনা)।
 
আমার নামটা বাবারই দেয়া। বুশরা, মানে সুসংবাদ দাত্রী। সেই থেকে আমি বুশরা। সবার প্রিয় বুশরা। কিন্তু বাবা আমাকে কখনও এই নামে ডাকে না, বাবা ডাকে বুড়ি। আমার বাবার ‘বুড়ি’ আমি।
 
আমার বাবা, আমার চোখে এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। যদিও সবার বাবাই তার কাছে শ্রেষ্ঠ। তারপরও আমি বলতো আমার বাবাই সেরা। আজ পর্যন্ত বাবা কখনও আমাকে বলেনি মা আমি তোমাকে ভালোবাসি আর আমিও কখনও বলিনি। কিন্তু আমি জানি বাবা আমাকে কি ভয়াবহ পরিমাণ ভালোবাসেন আর আমি বাবাকে। খুব ছোটবেলায় আমার কি যেন হয়েছিল, আমার মনে আছে তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে বাবার সেকি কান্না!! আর একবার বাবার খুব বুকে ব্যাথা হয়েছিল, আমি তখন হোস্টেলে থাকি, উত্তরায়। আর বাবা মোহাম্মদপুর, আপুর বাসায়। বাবার অসুস্থতার খবর পেয়েই আমি ছুটে আসি। তারপর শুরু হয় বাপ-বেটির কান্না। কি আজব!! আমাকে দেখেই বাবার সব ব্যাথা দূর হয়ে যায়। এই হল আমার বাবা। মাঝে মাঝে বাবা আমাকে না জানিয়েই ঢাকাতে চলে আসেন, যেন আমি অবাক হয়ে যাই। আমাকে আমার বাবা এভাবেই সারপ্রাইজ দেন।
 
আমি আজ এই জায়গাতে আসতে পেরেছি শুধুমাত্র বাবার জন্য। বাবা আমাকে সবই শিখিয়েছেন। আমার আবৃত্তি, বিতর্ক, বক্তৃতা সবই আমার বাবার জন্য করতে পেরেছি। বাবাই আমাকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেতেন। মা খুব একটা পছন্দ করত না এসব, কিন্তু বাবা তারপরও আমাকে নিয়ে যেতেন। এখনও বাবার অনুপ্রেরণাতেই আমি সব কিছু করে যাচ্ছি। আমার জীবনে যা যা পেয়েছি সবই আমার বাবার জন্য পেয়েছি। এই যে আজ আমি আইন পেশায় সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছি সেটাও শুধুমাত্র আমার বাবার কারণেই। 

সবাই যখন আমার পেশা নিয়ে ঘোরতর আপত্তি জানিয়েছে তখন সাপোর্ট দিয়েছে শুধু আমার বাবা। কেইসে জয়ী হলে আমার চেয়ে আমার বাবাই বেশি খুশি হয়, আবার পরাজয়ের দুঃখটাও সমানভাবে ভাগ করে নেয় আমার সাথে। জীবনে অনেক বিপদ এসেছে, মুখোমুখি হয়েছি ভয়ংকর সব ঝড়ের, খুব ভয় পেয়েছি তখন, ভেঙে পড়েছি। কিন্তু সেই সময়ও পাশে পেয়েছি বাবাকেই। আমাকে আগলে রেখেছেন, সাহস দিয়েছেন, শক্ত করে চেপে রেখেছেন আমার হাত বাবার হাতের মুঠোয়। ঠিক একইভাবে বাবাও যখন কোনও সমস্যায় পড়েন আলোচনা করেন আমার সাথে। বাপ-বেটি মিলে খুঁজে বের করি সমাধানের রাস্তা। আর এভাবেই বাবা-মেয়ের কেমেস্ট্রিটা গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে দিনকে দিন। 
 
বাবার ভালোবাসা যেমন তেমন শাসনও পেয়েছি অনেক। কিন্তু অন্যদের মত আমার বাবা কখনও আমাকে মারেনি, এমন কি বকাও দেয়নি। শুধুমাত্র কথা বলা বন্ধ করে দিত। আর এটা যে কী পরিমাণ কষ্টের সে শুধু আমিই জানি। বাবার হাতে মার খেয়েছিলাম জীবনে শুধুমাত্র একবার, তাও আবার ভালোবাসার জন্য। 
 
বাবাকে মনে হয় আমার বটবৃক্ষ, যে আমাকে আগলে রেখেছেন তার ডালপালা দিয়ে আর ছায়া দিয়েছেন নিজেকে দিয়ে। বাবাকে আমি এতোকিছুর বিনিময়ে কিছুই দিতে পারিনি। কী দেব? বাবাকে দেবার মত কিছু কি আছে আমার?
 
বাবা আমি জানি এই লেখাটা হয়ত তুমি কখনও দেখবে না। আমি চাইও না তুমি এটা দ্যাখো। বাবা তুমি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকো আরও হাজার বছর। আমাদের ভালোবাসায় সিক্ত হোক তোমার জীবন। আমার জীবনের প্রতিটা ভালোমন্দ মুহূর্তে তোমাকেই পাশে চাই বাবা।
 
আমি তোমাকে কিছু দিতে পারবো কিনা জানি না, কিন্তু এটুকু জানি যে এমন কিছু করবনা আমি যেটা তোমার জন্য কষ্টের কারণ হবে। ভালো থেকো বাবা। খুব খুব ভালোবাসি তোমাকে। ভাল থাকুক সবার বাবা।
বাবার “বুড়ি” 

লেখক: আইনজীবী, উচ্চ আদালত

এমআর