শিরোনাম:

নিরাপদ খাদ্য কত দূর..?

আব্দুল জাব্বার খান,
ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি
প্রকাশিত : শনিবার, ১৭ জুন ২০১৭, ১০:৪৬
অ-অ+
নিরাপদ খাদ্য কত দূর..?
ফাইল ফটো

ঢাকা: জীবন ধারণের জন্য প্রধান উপাদান হলো খাদ্য। মানুষের  মৌলিক অধিকারসমূহের মধ্যে খাদ্যকে রাখা হয়েছে সবার উপরে। খাদ্যের কারণেই পৃথিবীতে মানুষের  অবিরাম ছুটে চলা। মানুষের অসমাপ্ত সংগ্রাম, ত্যাগ-তীতিক্ষা, আহাজারি, অপরাধ, সহিংসতা সবই খাদ্যের কারণে। অতঃপর সে খাদ্যই যদি মানুষের মরণব্যাধি বিভীষিকার কারণ হয়, তবে কেন তার জন্য এতো ছুটে চলা।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে উচ্চ আদালতের রয়েছে বেশ কিছু নির্দেশনা। আদালতের নির্দেশনা অনুসারে ‘নিরাপদ খাদ্য বিল-২০১৩’ পাস হলেও এ আইন বাস্তবায়নে তেমন কোনও তোড়জোড় না থাকায় ঝুঁকিতেই রয়ে গেছে নিরাপদ খাদ্য।

বিশেষ করে পবিত্র রমযান এবং  ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ভেজাল খাদ্য তৈরি করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চক্র। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অসাধু এ চক্রের সদস্যরা গোপনে ভেজাল খাদ্য সরবারহ করে যায় রাজধানীসহ সারা দেশে। আগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে খাদ্য ভেজালমুক্ত করার প্রচেষ্টা কিছুটা দেখা গেলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কারণে সেটিও এখন বন্ধ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘প্রতিটি জেলায় খাদ্য আদালত গঠন এবং ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করে খাদ্যের মান ও রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য খাদ্য পরীক্ষক নিয়োগের নির্দেশ দিয়ে ২০০৯ সালের ২০ জুন একটি রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়া ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ফরমালিনসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার বন্ধে ৫ দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট। তাতে বলা হয়েছে, ছয় মাসের মধ্যে দেশের সব স্থল ও সমুদ্রবন্দরে ‘কেমিকেল টেস্ট ইউনিট’ স্থাপন করতে হবে, যেন আমদানি করা ফল রাসায়নিক পরীক্ষার পর বাজারে ছাড়া হয় এবং রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো কোনো ফল দেশে প্রবেশ করতে না পারে।’

সংশ্লিষ্ট মামলার আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের কতগুলো দায়দায়িত্ব রয়েছে। এসব দায়িত্ব পালন করলে অসাধু ব্যবসায়ীরা জনগণের পকেট কেটে অধিক মুনাফা লাভ করতে পারতো না। এসব নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার, বিএসটিআই, খাদ্য অধিদফতর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ইতোপূর্বে হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশনা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য মোবাইল কোর্ট করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে আরতে রেখে খাদ্যে ভেজাল মেশানো প্রতিরোধেরও নির্দেশনা দিয়েছেন মহামান্য আদালত।’

‘এসব নির্দেশনার সাথে সাথে কিছু পদক্ষেপ নিলেও দিন গড়ালেই নির্দেশ অকার্যকর হয়ে যায়। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও তাদের দায়িত্ব পালন ভুলে যাওয়ার ফলে রমযানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং ভেজাল মেশানোর সুযোগ পাচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা’- বলেন তিনি।

ভেজাল প্রতিরোধে আমাদের দেশে আইন এবং আইনের ক্ষমতা যথার্থই দেয়া আছে উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভেজালমুক্ত খাবার পেতে হলে সরকারের প্রশাসনিকযন্ত্রের অনেক দায় রয়েছে।’

এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘প্রতিনিয়ত হাইকোর্টের নির্দেশনা দেয়া সম্ভব হয় না। যখন দেয় তখন পালন করা হয়। পরে ভুলে যায়। একটা বিষয় নিয়ে তো বারে বারে আদালতে যাওয়া যায় না।’ আইন আছে, নির্দেশ আছে, এখন প্রয়োজন প্রশাসনের দৃঢ পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যারা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলে তাদের দায়িত্ব তারা পালন করলেই এটা মুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

আগের তুলনায় খাদ্যে ভেজাল কিছুটা কমে এসেছে, তবে তা খুবই সামান্য। আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘এখনও শতভাগ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হয়নি। তবে জনগণের মধ্যে বেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘খাদ্যে ভেজাল দেয়া মানে জীবন কেড়ে নেয়া। এটা মারাত্মক একটি অপরাধ। এই অপরাধ প্রতিরোধে উচিত এটাকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা।’

তিনি বলেন, ‘আদালতের আদেশ মোতাবেক একটি মামলায় ফুড কোর্ট গঠন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। পিওর ফুড অর্ডিনেন্স আইনটাকে সংশোধন করেই খাদ্য আইন ২০১৩ পাস করা হয়েছে। এতে খুব বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে তেমনটা নয়। তবে ফুড অ্যানালাইস্ট ও ফুড কোর্ট এটা যদি যথাযথভাবে চালু হয় সেক্ষেত্রে অনেকটা সমাধান হবে। আর ইনসট্যান্ট অ্যাকশনের বব্যবস্থা নেয়া যায় তাহলে ভাল হবে।’

মোবাইলকোর্ট আমরা পজেটিভ দেখি তবে মোবাইলকোর্টের সমস্যাটা হলো ওনারা অপরাধীকে ধরে অপরাধের সাথে সাথে সাজা দিয়ে দেয়। সেটাতো আইন অনুমোদন করছে না। কিন্তু মোবাইল কোর্ট যদি অপরাধীকে ধরে সাজা না দিয়ে শুধুমাত্র মামলা করে দেয়  তাহলে সেটি চলতে বাধা নেই।  তাহলে তার অ্যাকশন আরও বেশি হবে। আর বিশেষ করে যে খাদ্যগুলো আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়, সেনসেটিভ, এসব খাদ্যে যেখানে ভেজাল পাওয়া যাবে তাহলে সেখানে বিশেষ ক্ষমতায় আইনে মামলা করা যাবে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে সর্বোচ্চ সাজা এবং অজামিন যোগ্য হওয়ায় অপরাধীর সঠিক সাজা হবে।

নতুন আইনে যে খাদ্য ভেজাল সম্পূর্ণ মুক্ত হবে সেটা তো দেখছি না। খাদ্যে ভেজাল রোধে যথেষ্ট আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ফুডকোর্ট আছে। কিন্তু কার‌্যকর করাই বড় কথা। একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার আইনেও কিন্তু ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে। আইনের প্রয়োগটা যদি যথাযথা করে শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তাহলেই খাদ্য ভেজালমুক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী।

রাজধানীর রামপুরা বাজারে সাপ্তাহিক বাজার করতে আসা আব্দুর রহিম পাটোয়ারী বলেন, ‘শিশুদের আকর্ষণ করতে বিভিন্ন রং মিশ্রিত করে সেকারিন দিয়ে মিষ্টি করে অনেক ধরনের জিনিস বাজারজাত করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ভেজালের কথা পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি। কিন্তু কি করবো আমরা তো আর ফ্যাক্টরির ভেতরে গিয়ে পরীক্ষা করতে পারি না। প্রশাসন যদি এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলেই জনগণ মুক্তি পাবে।’

ব্রেকিংনিউজ/ এজেডখান/ এমআর