শিরোনাম:

কোন দিকে যাচ্ছে দেশ?

মিথুন রায়
প্রকাশিত : বুধবার, ০৭ জুন ২০১৭, ০৬:২৫
অ-অ+
কোন দিকে যাচ্ছে দেশ?

স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পেরিয়ে গেলেও এখনও দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটেনি। রাজনৈতিক দলগুলোও এক ধরনের ব্ল্যাম গেমে মেতে আছে। কেউ কারও পজিটিভিটি দেখছেন না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে একে অপরকে দোষারোপ করেই চলেছেন। এ অবস্থার অবসান হবে কবে? কবে জাতি এমন হীনমন্যতা থেকে মুক্তি পাবে? 

স্বাধীনতা আসলেও বাঙালির মুক্তি যে এখনও অধরা সেটি টেলিভিশন টক শো, বিভিন্ন কলাম ও বিশিষ্টজনদের কথা শুনলেই বোঝা যায়। মানুষের চেতনার জায়গায় কিছুটা পরিবর্তন আসলেও সামগ্রিকভাবে সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীক সুস্থতা ফেরেনি এখনও। 

এ নিয়ে বিভিন্ন সময় দেশের সুশীল সমাজ তথা বুদ্ধিজীবী মহলকে সরব হতে দেখা যায়। তবে সেটি দিন শেষে কোনও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে না। মূলত, কেন আমাদের মধ্যে একটি সুস্থ ধারার অনুশীলন হচ্ছে না। এর জন্য দায় কার?

আসলে দায়ের কথা বলতে গেলে প্রত্যেককেই তা কিছু না কিছু ছুঁয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করছে। অপর দিকে বিএনপি বলছে, আওয়ামী লীগের ভেতরেও অনেক দেশদ্রোহী, স্বাধীনতাবিরোধী রয়েছেন, যাদের অতীত ইতিহাসে ঔজ্জল্যোর চেয়ে কালিমাই বেশি। এ দুয়ের মাঝে জাতীয় পার্টি কখন কি বলছে তা তারা নিজেরাই জানেনা। তাদের মধ্যে এক ধরনের স্ববিরোধিতা কাজ করছে। 

স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পেরিয়ে জাতি আজ আর কোনও নতুন নাটক চায় না। চায় একটু নিরাপত্তা, একটু মুক্তির আনন্দ। কিন্তু বারবার প্রতিক্রিয়াশীলরা তাদের নানা কূটকৌশলের জাল বিস্তার করে চলেছে স্বাধীন বাংলার উপর। ধর্মীয় রক্ষণশীলতার নামে তাদের অহেতুক নানা আপত্তি আবদারের সঙ্গেও ইতোমধ্যে আপস করতে দেখা গেছে সরকারকে। তাদের বেশ কিছু দাবিদাওয়াও পূরণ করেছে সরকার। প্রতিক্রিয়াশীল কিংবা মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সঙ্গে যেকোনও আপসই নিজেদের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ নয় কি!

এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তার দেয়া এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘পরবর্তী (একাদশ) জাতীয় নির্বাচনেও জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে। সেটা হবে আওয়ামী লীগের হ্যাট্রিক জয়। আর ওই নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির হ্যাট্রিক পরাজয় হবে।’

আওয়ামী সরকার হ্যাট্রিক জয় করবে বলে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দেয়া বক্তব্যের সমালোচনায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের পায়ের নিচে মাটি নেই, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তারা ভালো করে জানে সহায়ক সরকার কিংবা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ৩০টি আসনের বেশি পাবে না। নির্বাচনে জিততে পারবে না। তাই একেক সময় একেক ধরনের কথা বলে যাচ্ছে। দেশে এখন আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নেই। সংখ্যালঘুরা প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে। তাই এবার নির্বাচন হবে সহায়ক সরকারের অধীনে এবং সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে।’

এদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ বলছেন, ‘বর্তমান সময়ে আমরা কোথায় যাচ্ছি, কোন অতলে তলিয়ে যাচ্ছি। দেশ এখন দুঃশাসনের মধ্য দিয়ে চলছে। জাতীয় পার্টি জাতির কাছে প্রতিশ্রুতি করছে, আমরা দেশকে রক্ষা করবো, মানুষের জান-মাল রক্ষা করবো।’

তিনি বলেছেন, ‘মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার অর্থ আমি বুঝি না। আমরা মুসলমানরা ইসলামের কথা বললে হয়ে যায় সাম্প্রদায়িকতা- এ কেমন বিচার। এ সময় তিনি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামালের উদ্দেশে বলেন, মূর্তি সরালে মসজিদ সরাতে হবে এ দেশে এতো বড় স্পর্ধা।’

গতকাল এলডিপির ইফতার মাহফিলে বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়া সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘২০১৮ সাল হবে জনগণের বছর। ২০১৮ সালে জুলুম অত্যাচার-অত্যাচারীর বিদায় হবে। যেভাবে আইনশৃঙ্খলা অবনতি হচ্ছে ঠিক তেমনি ভাবে দ্রব্যমূল্যে উর্ধ্বগতি হচ্ছে। এই আওয়ামী লীগ মানুষকে ভাওতা দেয়ার জন্য অনেক মিথ্যা কথা বলে কিন্তু কাজে কখনো পরিণত করে না। এই আওয়ামী লীগই মানুষকে আশা দিয়েছিল ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়াবে কিন্তু আজকে ১ কেজি চালের দাম ৫০ টাকা। গরিব মানুষের অবস্থা খারাপ। মাছ-মাংসের দামের কথা বাদই দিলাম। কোন সবজি ৪০-৫০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না। তার উপর আবার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করেই যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আজকে দেশে আইনের শাসন বলে কিছু নেই। মানুষ ন্যায় বিচার পাচ্ছে না। কারণ বিচার বিভাগ বিচারকরা নয়, নিয়ন্ত্রণ করে এই আওয়ামী লীগ সরকার। এদের হাত এতো লম্বা যে কিছুইকেই পরোয়া করে না। তারা কাউকে সম্মান দিতে জানে না। পুলিশ-শিক্ষকের গায়েও তারা হাত তুলছে।’

সম্প্রতি বিএনপি ঘোষিত ভিশন-২০৩০ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিএনপি তাদের ভিশন ২০৩০-এ যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছে, তার অধিকাংশই বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে পূরণ করেছে। আগামী অর্থবছরে এর বাকি কাজগুলোও শেষ করা হবে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, রূপকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন উপযুক্ত কৌশল, যোগ্য নেতৃত্ব ও সুসংগঠিত দল। এর আগে নেতিবাচক রাজনীতি, অনিয়মতান্ত্রিক তৎপরতায় তারা ফিরে যাবেন না- এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।’

বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিএনপি তাদের শাসনামলে অনিয়ম-দুর্নীতি, জঙ্গি পৃষ্ঠপোষকতার যে দৃষ্টান্ত রেখেছে, এরপর ক্ষমতার বাইরে থেকে জ্বালাও পোড়াওসহ অনিয়মতান্ত্রিক তৎপরতা দিয়ে যে নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করেছে, তা কাটিয়ে উঠে এতটা জনআস্থা অর্জন তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, গ্রেনেড হামলা, সংসদ সদস্য হত্যাসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কাজে যারা পারদর্শী। তারা আবার জনগণকে কী আশার বাণী শোনাবে? বিএনপি তাদের শাসনামলে পাঁচ বছর মেয়াদী পরিকল্পনাও গ্রহণ করেনি। তারা দুতিন বছরের পরিকল্পনা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিল।’

তবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টির বক্তব্যের বরাবরই সমালোচনা করে আসছে দেশের বামদলগুলো। বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে সিপিবি-বাসদ নেতারা আহ্বান জানাচ্ছেন। অপরদিকে ক্ষমতাসীন সরকারের আপসকামিতারও তীব্র নিন্দা জানাতে দেখা যাচ্ছে বামদের। সম্প্রতি ঘোষিত বাজটকেও বামদলগুলো বলছে, ‘গরিব মারার বাজেট’।

এখন আসা যাক নির্বাচনের কথায়। সরকার দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন দিতে অনঢ়। সরকারের ভাষ্য, তারা নির্বাচন কমিশনের ওপর কোনও ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। বরং নির্বাচনকালীন ইসিকে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে। তবে সরকারের এমন মন ভোলানো কথায় কান দিতে মোটেই রাজী নয় বিএনপি। তাদের দাবি, যেকোনও মূল্যে নিরপেক্ষ অন্তবর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। বিএনপি মনে করছে, সরকার যদি দলের অধীনে নির্বাচন করে তবে তারা নিজেদের সুবিধা মতো সবকিছুকে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে এ নিয়েও ততই জলঘোলা শুরু হবে নিশ্চিতভাবেই। এর শেষ কোথায় কিংবা সুরাহা কী তা এ মুহূর্তে স্পষ্ট করে কিছুই বলা যাচ্ছে না।  

সব মিলিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক চর্চা চলতে তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে সাংস্কৃতিক বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তোলার কোনও বিকল্প নেই। একই সঙ্গে রাজনীতি যেহেতু সংস্কৃতিরই অংশ তাই নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার ওপরও গুরুত্বারোপ করতে হবে। আর সে পদক্ষেপ ক্ষমতাসীন সরকারকেই নিতে হবে। তবেই যদি দেশের মানুষ এই আত্মপ্রতারণামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে কিছুটা স্বস্তি পায়। 

লেখক: সাংবাদিক