বুধবার ১১ই জানুয়ারী ২০১৭ বিকাল ০৫:৫৬:২৯

অনন্ত জলিল যে ‘নায়ক’ হতে পারত

রহমান মতি, অতিথি লেখক

অনন্ত জলিল যে ‘নায়ক’ হতে পারত

ঢাকা: আমাদের দেশে মজা করার বিভিন্ন উপাদান বিভিন্নভাবে চলে আসে আপনা আপনি। আমরা মজা করার এক একটা সময় পার করি। এসময় একটা উৎসবমুখর পরিবেশ সর্বত্র থাকে। বিশেষ করে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া আলোচনা-সমালোচনার বিষয় পেয়ে যায়। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ছবি, ইমো যেগুলো মজার উপাদানে ঘিয়ের প্রদীপ হিসেবে কাজ করে।

এমন একটি মজার উপাদান ছিল ‘অনন্ত জলিল’। ‘ছিল’ শব্দটি বলছি কারণ এখন সেটা সেভাবে উৎসবমুখর নেই। শুরুটা এমন ছিল না। একদিন পত্রিকার পাতায় অনন্ত জলিল নিয়ে লেখা চোখে পড়ল 'দ্য স্পিড' সিনেমা বিষয়ে। ক্যাম্পাসের বাসে ঢাকা আসার সময় বন্ধু-বান্ধবরাও বলাবলি করেছিল অনন্ত জলিলকে নিয়ে। এ সিনেমার বিষয়ে লেখালেখি যথেষ্ট চোখে পড়েছিল। অনন্ত জলিলকে সিনেমা বাদে আমি সেভাবে চিনতাম না। ব্যবসায়ী অনন্ত জলিল সিনেমার নায়ক হিসেবে বড়পর্দায় আসার পর 'দ্য স্পিড, হৃদয় ভাঙা ঢেউ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, মোস্ট ওয়েলকাম, মোস্ট ওয়েলকাম-২' সিনেমাগুলো একটা আলোড়ন তোলে।

একজন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া মানুষ হঠাৎ করে সিনেমার নায়ক হলো এটা নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। হাইপ তোলার জন্য ইস্যুর জন্ম হয় এ ধরনের ব্যাপার দেশে হরহামেশাই ঘটে। অনন্ত জলিলের যে দর্শক তৈরি হলো তারা তাকে 'নায়ক' রূপে কীভাবে গ্রহণ করেছিল সেটা দেখার পর খুব রাগ, ক্ষোভ, হতাশা জন্ম নিয়েছিল। মনে আছে 'মোস্ট ওয়েলকাম' দেখার সময় শ্যামলী সিনেমাহলে এক দম্পতির কান্ড দেখে সব দর্শক হা করে তাকিয়েছিল। লোকটি বারবার দাঁড়াচ্ছিল আর তার স্ত্রী তাকে জোর করে বসাচ্ছিল। লোকটি বলেছিল-'কেন তুমি অত্যাচার সহ্য করতেছ এই লোকটার? 'তার স্ত্রী যে টিকেটের টাকার কষ্টটা লাঘব করার জন্য তার স্বামীকে জোর করে বারবার বসাচ্ছিল সেটাই কি চূড়ান্ত সাবজেক্ট ছিল? না, মহিলার চোখেমুখে সেসবের ছিটেফোঁটাও ছিল না। ছিল মজা করার সুযোগ। অনন্ত যতবার ডায়লগ ডেলিভারি দেয় মহিলাটি ততবার এমনভাবে হাসছিল যে সবাই তার দিকে দৃষ্টি ফেরাচ্ছিল। এর সাথে যোগ করা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যবহৃত অনন্ত জলিলের ঐ ধরনের ছবিগুলো যেগুলো ছিল মজা করার সস্তা উপাদান। যেমন- তার ছবি ব্যবহার করে বলা হত 'কুব চুন্দর পটু। 'মানে 'খুব সুন্দর ফটো। 'মনে আছে কলামিস্ট আসিফ নজরুলের ঐ কলামটির কথাও যেখানে তিনি 'নিঃস্বার্থ ভালোবাসা' দেখার পরে বড় লেখা লিখেছিলেন প্রথম আলো-তে। অনন্তকে তিনি ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছেন। অনন্তর নির্ধারিত নায়িকা 'বর্ষা'- কে নিয়েও মজার অনেক উপাদান বের হয়েছিল। এ জুটি পর্দায় কাঁদলে লোকে হাসত আর এ থেকেই বোঝা যায় তারা পর্দায় আসলে অভিনয় বিষয়টা করত না। সেটা অন্যকিছু ছিল এবং সেটাই প্রাণখুলে হাসার একটা বিরল সুযোগ তৈরি করেছিল।

যে তরুণ প্রজন্ম অনন্ত জলিলের ভক্ত তারা তার বাসায় যেত বিভিন্নভাবে উপকার পেত তারা। অনন্ত মানুষ হিসেবে উদার। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনেক নজির আমরা দেখেছি। এই মানুষ অনন্ত জলিল আর পর্দার অনন্ত জলিল দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন কনটেন্ট। প্রথমটা সবার কাছে শ্রদ্ধার পরেরটা মেজোরিটি পার্সেন্টে মজার। অনন্ত জলিল তার সিনেমা ইমেজে স্টারডমকে কাজে লাগাতে মাল্টিডাইমেনশনাল জায়গাকে বেছে নেয়।একাই কাহিনীকার, সিনেমাটোগ্রাফার, পরিচালক এরকম অনেক দিক।এ অাইডেনটিটি তাকে নতুন করে দর্শক আকর্ষণের ক্ষেত্র তৈরি করায়। এগুলো মিশ্র অনন্ত জলিলের পরিচিতি।

একজন অনন্ত জলিলের সিনেমা দেখতে বসে যে হলিউডি স্বাদ দর্শক পেত সেটাকে অনন্ত জলিল যেভাবে ব্যবহার করেছে সেখানে চালাকি ছিল। সেটা হলো নায়ক হবার নেশা। খুব দরকার ছিল কী! একটা ইন্ডাস্ট্রি ডিজিটাইজড করার যে উপকার অনন্ত করেছে তার কোনো তুলনা নেই। সেজন্য তাকে টুপি খোলা সালাম। এই অনন্ত জলিল পর্দার পেছনে একজন দক্ষ পরিচালক যার সিনেমার নির্মাণ দর্শককে চোখের প্রশান্তি দিত। এ প্রশান্তিটিকে অনন্ত যদি ইন্ডাস্ট্রির নায়ক-নায়িকা বাছাই করে নিজের ডিরেকশনে সিনেমা নির্মাণে কাজে লাগাত তবে অনন্তকে নিয়ে 'ট্রল, সার্কাজম' হত না। কেউ তাকে কমেন্ট বক্সে সস্তা মজার উপাদান করত না। হয়তো কেউ বলবে নিজের টাকা খরচ করে আরেকজনকে নায়ক করবে নাকি? যখন নিজের টাকা খরচ করে মানুষের উপকার করেছে, চিকিৎসার জন্য সাহায্য করেছে লিজেন্ড আনোয়ার হোসেনকে, শীতার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সবচেয়ে বড় কথা ইন্ডাস্ট্রিকে যন্ত্রপাতিতে পাল্টে দিয়েছে সেসব কাজ তো মন থেকেই করেছে তাহলে নিজের টাকা খরচ করে তার সময়ের ব্যস্ত তারকাদের নিয়ে সিনেমা বানালে দর্শক তাকে আরো পজেটিভলি গ্রহণ করত।

আজকে যখন 'অগ্রযাত্রার মহানায়ক : দ্য স্পাই' সিনেমার নাম শুনি তখন মৃদু হাস্যরসের জন্ম হলেও হতে পারে। এ সিনেমা বানানোর জন্য অনন্ত জলিল তার মতো যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সে প্রস্তুতিটা যদি আজকের ঢালিউডে শাকিব খান, আরেফিন শুভ, রোশান, এবিএম সুমন, মীম তাদের মতো প্রমিজিং তারকাদের কাস্ট করে সিনেমা বানানোর কাজে লাগায় তবে সেটা নতুন আশা যোগাবে। অনন্ত জলিল তার নিজেকে 'নায়ক' প্রমাণে যে সময়গুলো ব্যয় করেছেন সেসব কেমন ছিল তা কারো অজানা নয়। কিন্তু এবার তার উচিত বর্তমান তারকাদের নিয়ে সিনেমা বানানো যেহেতু আধুনিক নির্মাণটা তার জানা বিষয়।

অনন্ত জলিল 'নির্মাতা' রূপে 'নায়ক' হতে পারত এবং সেটা প্রমাণের এখনই সময়।


ব্রেকিংনিউজ/এসএস

আপডেট: বুধবার ১১ই জানুয়ারী ২০১৭ বিকাল ০৫:৫৬:২৯