মঙ্গলবার ১০ই জানুয়ারী ২০১৭ সকাল ১১:৫০:২২

রঙ্গে ভরা পড়ালেখা

ইয়াসির আরাফাত বর্ণ

রঙ্গে ভরা পড়ালেখা

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর উদ্যোগে বা শিক্ষকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে (বিশেষত প্রাথমিক) “সততা স্টোর” নামক ধারণায় দোকানদারহীন দোকান খোলা হয়েছে। কেনাকাটা করছে শিক্ষার্থীরা, টাকাও দিচ্ছে তারা নিজেরাই। তদারকির জন্য আলাদা কেউ নেই, ফলে দায়িত্ববোধের ও নিজের কাছে ন্যায্য থাকার খুব চমৎকার চর্চা তৈরি হচ্ছে তাদের মাঝে। 

এ রকম আয়োজন খারাপ থাকার মতো শত কারণের মাঝেও বাঙালির মনকে ভালো করে দেয়, ভণ্ডামিহীন দেশের স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু ভালো থাকার স্বপ্ন দেখা আরম্ভ করলেই দেখা যায় এ রকম দু-একটা আলাদা উদাহরণ বাদ দিয়ে বাকি সব জায়গাতেই হাহাকার বিরাজ করছে। অন্তত শিক্ষাক্ষেত্রে। সে হোক প্রাথমিক কিংবা উচ্চশিক্ষা, শিক্ষা জীবনে প্রবেশের প্রথম ধাপেই অনেক শিক্ষার্থীদেরকে দেখতে হচ্ছে যে তাদের বাবা মায়ের পছন্দ করা স্কুলে ভর্তি হবার জন্য তাদেরকে সব উদ্ভট ও উৎকট পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ কোনো এক বিশেষ ক্ষমতাবলে সে পদ্ধতিতে বাছাই না হলেও ভর্তি হতে পারছে। শিক্ষা জীবনের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের অন্তর্জগত আর বহির্জগত মিলে প্রচণ্ড রকমের গোলকধাঁধা তৈরি হওয়ার পর তারা প্রবেশ করছে শিক্ষাজীবনে।

তারপর থেকে শুরু হয় বেশ প্রচলিত কিছু তত্ত্ব খাটানো। ’অমুক’ স্যার ক্লাস নেন, সুতরাং তার কাছে কোচিং না করলে ফেল করিয়ে দেবেন, ’তমুক’ স্যার তো পরীক্ষার আগে যা যা সাজেশন দেন তার পুরোটাই পরীক্ষায় আসে, আরে ’ঐ’ স্যারের কাছে পড়লে পরীক্ষার খাতায় কিছু লেখো আর না লেখো- নম্বর পাবা নিশ্চিত। এই ’অমুক’ ’তমুক’ এর চক্করে কখন যে বিদ্যালয় জীবন শেষ করে ফেলে শিক্ষার্থীরা তা তারা নিজেরাও ঠাওর করতে পারে না। বিদ্যালয় জীবনের মধ্যপথে আর শেষ প্রান্তে হওয়া পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় তারা অংশগ্রহণ করে (বা করতে বাধ্য হয়) ‘অত পার্সেন্ট সিওর কমন’ ধাঁচের কিছু সহায়িকার ওপর নির্ভর করে এবং এর ওপরও ’অমুক’ ’তমুক’ এর প্রচণ্ড প্রভাব কাজ করে।

উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা জীবনেও এর বিশেষ পরিবর্তন হয় না। তবে এ পর্যায়ে এসে ’অমুক’ ‘তমুকেরা’ প্রচণ্ড রকমের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেন, আর তা হলো অসংখ্য শিক্ষার্থীর মধ্যকার স্বপ্নকে তারা নষ্ট করে দেন (অবশ্যই সবাই এ রকম নয়,তবে বেশিরভাগ)। তারা বার বার শিক্ষার্থীদের জীবনে ভবিষ্যত ব্যর্থতার ফরমান জারি করেন এবং শিক্ষার্থীরা কোথায় কোথায় স্নাতক পড়তে পারবে না বলে তারা ব্যর্থ হয়ে উঠবে এ রকম একটি লম্বা তালিকা ধরিয়ে দেন।

রঙ্গে ভরা এ দেশে এত রকমের প্রতিকূলতার পরও যেসব শিক্ষার্থী স্নাতক পর্যন্ত আসতে পারেন তারা নিঃসন্দেহে মহাসৌভাগ্যবান। কিন্তু আসলেই কী তাই? স্নাতকে আসার পর তারা দেখেন নতুন জাতের যাত্রাপালা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের একটি বড় অংশ তাদের শিক্ষকদের খুঁজে পেতে পেতেই কাহিল হয়ে যান, শিক্ষকরা (এবং এ ক্ষেত্রেও সব শিক্ষক নয়) এমন সব বাহারি কাজের সাথে যুক্ত থাকেন যেসব কিছুই হয় শুধু পড়ানোটা ছাড়া। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে দেখা হয় শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, অভিভাবকরাও কাহিল হয়ে ওঠেন এবং তা টাকার পরিমাণ গুনতে গুণতে আর আমজনতার টিপ্পনী শুনতে শুনতে। বাকি থাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সেখানে দেখা যায় বেশিরভাগ কলেজগুলোতে শিক্ষকরা ক্লাসতো ভালোভাবে নেনই না উল্টো তাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে অনেকটা কোচিং এর মতো করেই পড়তে হয়।

পুরো যে প্রক্রিয়া সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করলাম তাতে বোঝাই যায় যে, লম্বা শিক্ষা জীবনে শিক্ষার্থীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকতে ঠেকতে নিজের ভেতরে গোপনে জিইয়ে রাখা চিন্তা-চেতনার যতটুকু অবশিষ্ট থাকে তা টিকিয়ে রাখার বাসনায় আরো বেশি দুঃশ্চিন্তা তাদের গ্রাস করে ফেলে। অসৎ হবার যে অঘোষিত অথচ প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ শিক্ষার্থীরা শিশু বয়স থেকে পেতে শুরু করে তা শেষ হয় মধ্য যৌবনে এসে। এতো কিছুর ভীড়ে ‘সততা স্টোর’ এর ধারণা বারুদের মতো হঠাৎ জ্বলে উঠে আশার আলো দেখায়। কিন্তু স্থায়ীভাবে আলো বিকিরণ করতে পারার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় কিন্তু থেকেই যায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট: মঙ্গলবার ১০ই জানুয়ারী ২০১৭ সকাল ১১:৫১:০০